ঢাকা বুধবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

মাদকের মরণফাঁদ ও বিপথগামী তরুণ সমাজ

মাদকের মরণফাঁদ ও বিপথগামী তরুণ সমাজ

তরুণরাই একটি জাতির মেরুদণ্ড। কিন্তু সমসাময়িককালে আমাদের সেই মেরুদণ্ডে পচন ধরতে শুরু করেছে মাদকের ভয়াবহ ছোবলে। একটি দেশ ও জাতির ভবিষ্যতের স্বপ্নদ্রষ্টা যখন নেশার অন্ধকারে নিজেদের বিলীন করে দেয়, তখন সেই জাতির অস্তিত্বই সংকটের মুখে পড়ে। বর্তমানে মাদক কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় ও সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। শহর থেকে গ্রাম, অলিগলি থেকে শুরু করে উচ্চবিত্তের ড্রয়িংরুমণ্ড সর্বত্রই মাদকের বিষাক্ত থাবা বিস্তৃত। এই মরণব্যাধি থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষা করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তরুণ সমাজের মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ার পেছনে কোনো একক কারণ নেই। বরং এটি বহুবিধ সামাজিক, মানসিক ও পারিবারিক সমস্যার সংমিশ্রণ। প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, পারিবারিক কলহ ও বিচ্ছেদ। পরিবারের অশান্তি এবং বাবা-মায়ের অবহেলা সন্তানকে মানসিকভাবে একা করে দেয়। এই নিঃসঙ্গতা কাটাতে তারা মাদকের দিকে পা বাড়ায়। উচ্চশিক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের অভাব তরুণদের মধ্যে তীব্র বিষণ্ণতা তৈরি করে, যা অনেক সময় তাদের নেশার পথে ধাবিত করে। কৌতূহল থেকে শুরু হওয়া আসক্তি মূলত বাজে বন্ধুদের পাল্লায় পড়েই বেশি ঘটে। বন্ধুত্বের খাতিরে একবার চেখে দেখার ইচ্ছাটাই একসময় জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বায়নের এই যুগে পশ্চিমা অপসংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা মাদকের প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

মাদক শুধু শরীরকে নষ্ট করে না, এটি মানুষের বিবেক ও মেধাকেও গ্রাস করে। আসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং পরিবারের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে তারা লিপ্ত হচ্ছে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও খুনের মতো জঘন্য অপরাধে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, মাদক মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারগুলোর ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়, যার ফলে সিজোফ্রেনিয়া বা তীব্র বিষণ্ণতার মতো মানসিক রোগ দেখা দেয়। একটি সুন্দর সম্ভাবনা এভাবেই একমুঠো পাউডার বা একটি ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জে নিঃশেষ হয়ে যায়। মাদকমুক্ত সমাজ গঠন করা রাতারাতি সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। তরুণ সমাজকে এই অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনতে পরিবারই হলো শিক্ষার প্রথম সূতিকাগার। বাবা-মাকে সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কাদের সঙ্গে মিশছে, সেদিকে তীক্ষè নজর রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, শাসন নয় বরং ভালোবাসা ও সময় দেওয়াই মাদক থেকে দূরে রাখার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

সীমান্ত দিয়ে মাদক চোরাচালান বন্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। মাদকের গডফাদারদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যখন মাদকের সহজলভ্যতা কমে যাবে, তখন আসক্তির হারও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। ‘অবসর’ যেন অপকর্মে ব্যয় না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রতিটি এলাকায় পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, পাঠাগার এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে তরুণরা ব্যস্ত থাকলে মাদকের চিন্তা মাথায় আসবে না। নৈতিক মূল্যবোধের অভাবই মানুষকে বিপথে ঠেলে দেয়। ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিকতা তরুণদের মধ্যে চারিত্রিক দৃঢ়তা তৈরি করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত মাদকবিরোধী সেমিনার ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা উচিত। যারা এরইমধ্যে আসক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের ঘৃণা না করে সহমর্মিতার সঙ্গে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে। উন্নতমানের সরকারি রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার বাড়াতে হবে। সুস্থ হওয়ার পর তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা আবার হতাশায় ডুবে না যায়।

তরুণরা একটি দেশের প্রাণশক্তি। সেই শক্তিকে মাদকের আগুনে পুড়তে দেওয়া যায় না। মাদক নির্মূল করা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের প্রত্যেকের নাগরিক দায়িত্ব। সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে- নিজের ঘর থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত। যদি আমরা আজ আমাদের তরুণদের রক্ষা করতে না পারি, তবে আগামী দিনের বাংলাদেশ এক মেধাহীন ও পঙ্গু প্রজন্মের মুখোমুখি হবে। এখনই সময় জেগে ওঠার। আসুন, মাদকের বিরুদ্ধে একটি সামাজিক যুদ্ধ ঘোষণা করি এবং আমাদের সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর পৃথিবী নিশ্চিত করি। মনে রাখবেন, ‘মাদককে না বলুন, জীবনকে ভালোবাসুন।’

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত