ঢাকা শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

পরিবার কাঠামো ও সমাজচিন্তায় পরিবর্তন

মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন, শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ
পরিবার কাঠামো ও সমাজচিন্তায় পরিবর্তন

বাংলাদেশে পরিবার সমাজের সবচেয়ে প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রতিষ্ঠান। পরিবার শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি জন্ম নেওয়ার স্থান নয়, এটি ব্যক্তির সামাজিকীকরণের প্রথম বিদ্যালয় হিসেবেও পরিচিত। সামাজিকীকরণ বলতে আমরা বুঝি সেই প্রক্রিয়াকে যার মাধ্যমে একজন মানুষ সমাজের নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আচরণগত মানগুলো শিখে বড় হয়। পরিবার এই প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশে পরিবার কাঠামো ও সামাজিকীকরণের বিষয়টি অত্যন্ত জটিল এবং পরিবর্তনশীল, কারণ এটি ঐতিহ্য, অর্থনীতি, ধর্ম, শিক্ষা এবং আধুনিকতার প্রভাবের সঙ্গে সংযুক্ত। বাংলাদেশে পরিবার সাধারণত বৃহৎ পরিবার ও ক্ষুদ্র পরিবারের দুই ধরনের কাঠামোতে দেখা যায়। বৃহৎ পরিবারে একাধিক প্রজন্ম একসঙ্গে বসবাস করে, যেখানে দাদা-দাদি, বাবা-মা, চাচা-চাচি এবং সন্তানরা একই ছাদের নিচে থাকে। এই ধরনের পরিবারে সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই ঘনিষ্ঠ এবং প্রায়শই প্রজন্মের মধ্যে অভিজ্ঞতা ও মূল্যবোধের সরাসরি স্থানান্তর ঘটে। অন্যদিকে, নগরায়ণ এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে ক্ষুদ্র পরিবারের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। ক্ষুদ্র পরিবার সাধারণত শুধু বাবা-মা ও সন্তানদের নিয়ে গঠিত, যেখানে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার অনেক দিক স্কুল, গণমাধ্যম এবং বন্ধুদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

পরিবার কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিকীকরণের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। পূর্বে, সমাজের নিয়মকানুন, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং পারিবারিক ঐতিহ্য শিশুদের মধ্যে গেঁথে যেত। শিশুদের প্রথম শিক্ষাগুরু ছিলেন বাবা-মা, দাদা-দাদি বা পরিবারের বড়রা। তারা শিশুদের নিয়মকানুন, নৈতিকতা, আচরণ, শিষ্টাচার, এবং সামাজিক ভূমিকার প্রতি সচেতন করে তুলত। বাংলাদেশে ধর্মীয় এবং সংস্কৃতিক উৎসব যেমন ঈদ, পূজা, বা জন্মদিন উদযাপনের মাধ্যমে শিশুরা শিখে সমাজের নিয়মকানুন এবং সহমর্মিতা। তবে আধুনিক বাংলাদেশে পরিবার কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়াও পরিবর্তিত হয়েছে। নগরায়ণ, প্রযুক্তির প্রসার, শিক্ষার বিস্তার এবং মহিলাদের চাকরিতে অংশগ্রহণের ফলে পরিবারগুলো ক্ষুদ্র হচ্ছে এবং অনেক সামাজিকীকরণ কার্যক্রম এখন বিদ্যালয়, কমিউনিটি সেন্টার, গণমাধ্যম এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঘটছে। শিশুদের সামাজিক দক্ষতা এবং নৈতিক মানগুলো শিখতে হলে এখন তারা শুধুমাত্র পরিবারের উপর নির্ভর করছে না। সামাজিকীকরণের এই বহুমাত্রিকতা নতুন সুবিধা এনেছে, যেমন শিশুরা বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা, তথ্য এবং সমসাময়িক সমস্যার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। কিন্তু এটি কিছু চ্যালেঞ্জও নিয়ে এসেছে। ক্ষুদ্র পরিবারে শিশুদের কাছে পরিবারের অভিজ্ঞতা এবং প্রজন্মের নির্দেশনার অভাব দেখা দেয়। ফলে অনেকে মূল্যবোধের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি অনুভব করতে পারে।

বাংলাদেশে পরিবার কাঠামো ও সামাজিকীকরণের মধ্যে লিঙ্গভিত্তিক ভিন্নতা রয়েছে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে ছেলে এবং মেয়ের সামাজিকীকরণের ধরন ভিন্ন। ছেলেদের স্বাধীনতা, নেতৃত্ব এবং আত্মনির্ভরতার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, যেখানে মেয়েদের ক্ষেত্রে শিষ্টাচার, গৃহস্থালির দায়িত্ব এবং পরিবারকে সমর্থন করার দিকটি জোর দেওয়া হয়। যদিও আধুনিকীকরণ এবং শিক্ষার প্রসারের ফলে এই পার্থক্য কিছুটা কমেছে; কিন্তু অনেক অঞ্চলে এখনো প্রথাগত সামাজিকীকরণের প্রভাব স্পষ্ট।

পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থাও সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবার সাধারণত শিশুদের শিক্ষার প্রতি বেশি মনোযোগ দেয় এবং তাদের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা অন্তর্ভুক্ত করে। অন্যদিকে, নিম্নবিত্ত পরিবার প্রায়শই শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক দক্ষতার উপর গুরুত্ব দেয়। এতে শিশুদের সামাজিকীকরণের অভিজ্ঞতা ভিন্ন হয়ে যায় এবং তাদের মানসিক ও আচরণগত বিকাশের ধরনে প্রভাব ফেলে।

পরিবারের পরিবর্তিত কাঠামোর ফলে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ভূমিকা বেড়েছে। শিশুরা এখন সামাজিকীকরণের একটি বড় অংশ অনলাইন মাধ্যম থেকে গ্রহণ করছে। সোশ্যাল মিডিয়া, ইন্টারনেট এবং মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনগুলো শিশুদের সামাজিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে এতে কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। অনেক শিশু প্রথাগত নৈতিক মূল্যবোধ এবং পরিবারিক শিক্ষার পরিবর্তে প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য ও সামাজিক প্রভাবের মধ্যে দ্বিধাগ্রস্ত হতে পারে। এটি পরিবারের ভূমিকার পরিবর্তনকে প্রমাণ করে। পরিবার কাঠামোর পরিবর্তনের প্রভাবে সামাজিকীকরণের প্রভাব শুধু ব্যক্তির মধ্যে নয়, সমগ্র সমাজেও পড়ে। বড় পরিবার যেখানে একাধিক প্রজন্ম একসঙ্গে বসবাস করে, সেখানে সামাজিক সংহতি এবং সহমর্মিতার শিক্ষা সহজেই স্থানান্তরিত হয়। ক্ষুদ্র পরিবার এবং আধুনিক নগরায়ণ সমাজে পারস্পরিক সম্পর্ক কমে যাচ্ছে, যার ফলে সামাজিক সংহতি ও সম্প্রদায়বোধ দুর্বল হচ্ছে। অন্যদিকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বন্ধুবান্ধব এবং অনলাইন সম্প্রদায় নতুন সামাজিকীকরণের ক্ষেত্র তৈরি করছে। এটি সমাজকে কিছু ক্ষেত্রে আরও উন্মুক্ত ও উদার করে তুললেও ঐতিহ্যবাহী সামাজিকীকরণের শক্তি কমিয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশে পরিবারের কাঠামো ও সামাজিকীকরণের এই পরিবর্তন শুধু সন্তানদের ব্যক্তিত্বে নয়, বরং সমাজের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিতেও প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, আগের সময়ে পারিবারিক সম্মান ও বয়স্কদের প্রতি শ্রদ্ধার ধারণা শিশুদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে গেঁথে যেত। বর্তমানে শিশুদের অনেকাংশ এই ধারণা বিদ্যালয় বা গণমাধ্যমের মাধ্যমে শিখছে। ফলে সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়া আরও বহুমাত্রিক হলেও কিছু ক্ষেত্রে মূল্যবোধের ধারা নরম হয়েছে। পরিবার কাঠামো ও সামাজিকীকরণের পরিবর্তন সমাজে নারী ও পুরুষের ভূমিকা পুনঃসংজ্ঞায়িত করছে। মহিলারা এখন পরিবারের বাইরে কাজ করছে, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হচ্ছে। এর ফলে সামাজিকীকরণে নারীর ভূমিকা শুধু ঘর বা পরিবার সীমাবদ্ধ নয়। তারা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। একইভাবে, পুরুষদের জন্যও পরিবারে এবং সমাজে দায়িত্ব এবং আচরণের ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে।

পরিবার কাঠামো ও সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে ইসলাম প্রধান ধর্ম হলেও হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের পরিবার কাঠামোও ভিন্ন। প্রতিটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রথা সামাজিকীকরণের নির্দিষ্ট নিয়ম ও আচরণ শিখায়। উদাহরণস্বরূপ, বৌদ্ধ পরিবারে শান্তি, সহমর্মিতা ও ধ্যানের শিক্ষা শিশুদের মধ্যে প্রাথমিকভাবে প্রবেশ করে, আর মুসলিম পরিবারে নৈতিকতা, শিষ্টাচার এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শিশুদের সামাজিকীকরণের অংশ হিসেবে থাকে। পরিবার কাঠামো ও সামাজিকীকরণের এই পরিবর্তন নতুন প্রজন্মের জন্য একাধিক সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। একদিকে, শিশু এবং তরুণরা বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা অর্জন করছে, প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করছে এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ পাচ্ছে। অন্যদিকে, পরিবারিক নির্দেশনা, নৈতিক শিক্ষা, এবং প্রজন্মগত মূল্যবোধের অভাবের কারণে কিছু সামাজিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জও দেখা দিচ্ছে। সমাজ এবং নীতি নির্ধারকরা পরিবার কাঠামো ও সামাজিকীকরণের এই পরিবর্তনকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। পরিবারকে সামাজিকীকরণের মূল প্রতিষ্ঠান হিসেবে শক্তিশালী করা, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করা, এবং শিশুদের নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারকেন্দ্রিক নীতি, সামাজিক সমর্থন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতার মাধ্যমে এই পরিবর্তনকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।

শেষমেষ, বাংলাদেশে পরিবার কাঠামো এবং সামাজিকীকরণ একটি প্রাণবন্ত, পরিবর্তনশীল এবং বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া। এটি শুধু ব্যক্তির মানসিক ও সামাজিক বিকাশে নয়, সমগ্র সমাজের উন্নয়ন ও সংহতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। যদিও নগরায়ণ, প্রযুক্তি এবং আধুনিকীকরণের প্রভাবে পরিবার কাঠামো পরিবর্তিত হয়েছে, পরিবার এখনও সামাজিকীকরণের মূল স্তম্ভ। পরিবারের শিক্ষা, নৈতিকতা এবং সামাজিক মূল্যবোধের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি শুধু নিজের জীবনে নয়, পুরো সমাজে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করতে পারে। সুতরাং পরিবার কাঠামো এবং সামাজিকীকরণের গুরুত্ব বুঝে সমাজকে আরও শক্তিশালী ও সংহত করে গড়ে তোলা আমাদের সবার দায়িত্ব।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত