ঢাকা শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

গণভোটে তারুণ্যের পালস : ইতিহাস হাঁটে কোন পথে

মো. কামরুল হাসান, ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
গণভোটে তারুণ্যের পালস : ইতিহাস হাঁটে কোন পথে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৫ আগস্ট বিরাট ঘটনা- যার নেতৃত্বে ছিল জেনারেশন জি। সামগ্রিক চিন্তা ও দৃষ্টিসীমা পাল্টে দেওয়ার মতো দৃষ্টান্ত হতে পারে এই গণঅভ্যুত্থান, জেনারেশন জি-এর জন্য এটি পরম শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা। অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ আর মাত্র কয়েকটা দিন। এরইমধ্যে, দেশে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনের হাওয়া বৈইছে, ফেব্রুয়ারিতে যার পরিণতি হওয়ার কথা। কোন দিকের হাওয়া কোন পালে বাঁক নেয়- বলা মুশকিল। কিন্তু এই হাওয়াটা দরকার ছিল, জুলাই আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল এই হাওয়ার এক চিলতে স্বপ্ন নিয়ে, আবার অনেকের জন্য আলাদীনের প্রদীপ শিখার জাদুর দৈত্য হয়েও।

যা হোক, জেনারেশন জি’র রাজনীতি সচেতন ও উপলব্ধি-ক্ষমতায় হৃদয়বৃত্তির পাল্স এখন ব্যাপক কৌতূহলী এবং তারুণ্য দৃষ্টি সজাগ। এ প্রজন্মের জীবন ও যৌবনের স্বচক্ষে দেখা প্রথম গণঅভ্যুত্থান, প্রথম গণভোট হতে যাচ্ছে! জুলাইয়ে মানুষের কাঁধে মানুষের এত লাশের মিছিল, বিপ্লব শেষে আকাশচুম্বী প্রত্যাশার গালে তীব্র চপেটাঘাত, চিত্র-বিচিত্র শিরোনামে ক্লান্ত নিঃশ্বাসের ভার- তবু হৃদয় গভীর দেশপ্রেমে টুঁইটুম্বুর! এই নির্মোহ দেশপ্রেমিক প্রজন্মই বুকভরা সাহসের যোগ্য উপমা হতে পারে!

শুরুতে জুলাই বিপ্লব হিসেবে সমধিক পরিচিত ও বিবেচিত হলেও ধীরে ধীরে জুলাই হয়ে যায় কেবল গণঅভ্যুত্থান, অনেকে এখন ‘জুলাই আন্দোলন’ বলে আখ্যা দিতে চান! কেউ কেউ কেবল মেটিকুলাস ডিজাইনও বলতে চান। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে এ প্রজন্ম আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিয়ে- ভীন্ন প্রেক্ষাপট, অভীন্ন আবহ। দরজায় টোকা দিয়ে মিলিটারি, ‘ঘরে কি মুক্তি আছে?’, একই বাক্য যৎকিঞ্চিত পরিমার্জন করে, ‘ঘরে কি ছাত্র আছে?’

রাজনৈতিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বৃত্তের মাঝে মত পথের প্রার্থক্য থাকলেও নির্মম সত্য হলো ১৫০০ জীবন ঝরে গেল, চোখ হারাল ৩ শতাধিক, অঙ্গ হারাল অগণিত- এরা সবাই আস্ত রক্তে মাংসে গড়া বাংলাদেশের মানুষ, আমাদের স্বজাতি, কারও একমাত্র অবলম্বন, কারও পরম স্বজন, কারও ভরসার শেষ ঠিকানাটুকু কারও দু’চোখ জোড়া স্বপ্নের নির্মল সম্ভাবনার হাসি! রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে লাশের জন্য মায়া অনুভূতি আদর্শ ভেদে বদলে যায়, গুরুত্বেরও তারতম্য হয়। কিন্তু দিনশেষে ‘যার চলে যায়, সেই বুঝে যায় বিচ্ছেদে কী যন্ত্রণা!’

বিপ্লব আর গণঅভ্যুত্থানে বিরাট ফারাক থাকলেও জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে বিপ্লবের রেশ প্রবল! কেননা, এত স্বল্প দিনে এত বিয়োগের বেদনা, এত রক্তের ঋণ, এত জীবনের দেনা দুনিয়ায় বিরল। অতি স্বল্প সময়ের পরিক্রমেই সেই জুলাইয়ের স্বকীয়তা ম্লান- ঐক্য বিচ্ছিন্ন, সাহস ও দেশপ্রেমের আবেগে পুরদস্তুর ভাটা! জীবনের মূল্য, বানের-জলের মতো মানুষের রক্তস্রোত মামুলি, যৎকিঞ্চিত সময়ের পরিক্রমে সেসব আজ রীতিমতো অপাঙ্ক্তেয়!

দায় নেবে না কেউ, কিন্তু সময় ও ইতিহাসের অমোঘ দলিলে বিরচিত থাকবে সত্য। ইতিহাসের স্বকীয় বাঁক, গতি-প্রকৃতির সুর ও পরিণতি অভীন্ন। দিনশেষে এক নীড়ে এসে নৌঙর করে ইতিহাস ও সময়ের স্বতঃসিদ্ধ শালতি। ঘড়ির কাঁটার গতি নিয়মের অধীন হলেও দিনশেষে এক যায়গাতেই এসে দাঁড়ায় আর ১২টা বেজে যায়- ঘড়িতে ধ্বনিত হয় টিংটিং শব্দ! ইতিহাসও এমন।

ইতিহাসের স্বভাব এমন, তাকে চ্যালেঞ্জ করা যায় না, বিকৃত, অতিরঞ্জন, বিশ্বাসঘাতকতা, কুক্ষিগত, শঠতা আর চরম পরম অকৃতজ্ঞতায় বীতশ্রদ্ধ করা হয় বলেই ইতিহাস বারবার তৈরী হয়, বারবার ফিরে আসে আপন মহিমায়, দাঁড়ায় একই কাঁটায় আর তখন ১২টা বেজে যায়! যার যতটুকু ঋণ, যার যতটুকু অকৃতজ্ঞতা, শঠতা, বেইমানি- ঠিক ততটুকুর মূল্য কষতেই হয় সেই ১২টায়! এটা ধ্রুব সত্য। কিন্তু যুদ্ধ, বিপ্লবের বলি হয় সাধারণ জনগণ- এলিটরা শুধু সেই রক্তের পরে পা রেখে ভোগ করে! সার্বিয়ান একটি প্রবাদ আছে, ‘যুদ্ধ শুরু হলে রাজনীতিবিদেরা অস্ত্র দেয়, ধনীরা রুটি দেয় আর গরিবরা তাদের ছেলেদের দেয়। যুদ্ধ শেষ হলে রাজনীতিবিদরা হাত মেলায়, ধনীরা রুটির দাম বাড়ায় আর গরিবরা তাদের ছেলেদের কবর খুঁজে বেড়ায়।’

ইতিহাস ও সময়ের এই শাশ্বত রূপ জালিমের জন্য রূঢ় মজলুমের জন্য ইনসাফ। মজলুমের রুহের হায়, শহীদের আত্মায় ভারাক্রান্ত আকাশ, মাটি আঁকড়ে থাকা মানচিত্র জানান দেয়- যুগে যুগে এমনই হয়েছে। ইতিহাস বারবার ফিরে এসেছে, কিন্তু ইতিহাস থেকে কেউ শেখেনি, বিপদ কেটে যাওয়ার পর সীমালঙ্ঘন করেছে।

এই সরকারের সফলতা বা ব্যর্থতার দুই পাল্লাতেই ভার! সকল ভাল প্রচেষ্টার জন্য ‘ধন্যবাদ’ আর মন্দের জন্য ‘নিন্দাবাদ’। ভালো ও মন্দের মাঝামাঝি থাকে ‘ভুল করা’ এবং ‘সহযোগিতা না পাওয়া’। এই মাঝামাঝি ব্যাপারটি হয়তো এ সরকারের সঙ্গে বেশি প্রাসঙ্গিক। কিন্তু এ স্বল্পমেয়াদের সরকারের সৎ ইচ্ছে যে ছিল এতে তিলার্ধ সন্দেহ নেই, সামগ্রিক সহযোগিতা না পেলে এককভাবে কোন সৎ চাওয়ারই পূর্ণতা মেলে না।

আসছে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে পুরো দেশ। রাষ্ট্রের প্রতিটি অর্গানের মধ্যে ‘চেক এন্ড ব্যালেন্স’ তৈরির জন্য সার্বজনীন গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচিত সরকার অপরিহার্য- যারা জনগণের বৈধ ভোটে ম্যান্ডেট পাবে। গণভোটে দেশ ও জাতির স্বার্থে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে আমাদের দৃঢ় অবস্থান। এই জেনারেশন জি-এর পাল্স গণভোটে ‘হ্যাঁ’, কেউ সেই পাল্স না বুঝলে, সম্মান না করলে তাদের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ক্ষতি অনিবার্য।

অস্বীকার করার জো নেই- জুলাই গণঅভ্যুত্থান মানুষের সামগ্রিক মগজে গভীর চিন্তার ছাপ ফেলে গেছে, হৃদয়ের দাগ মুছে গেলেও, মগজের ছাপ থেকে যাবে। বাঙালি রক্ত স্বজাতির লাশ দেখার মর্মন্তুদ শোকের সহ্যসীমা অতিক্রম করলে মৃত্যুর আনন্দে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে- গলায় পরিচিত কার্ড ঝুলিয়ে মৃত্যুকে আলিঙন করার মতো চূড়ান্ত পর্যায় জুলাই এনেছিল। অতএব, স্বজাতির রক্তের, জীবনের সেই ত্যাগ গণভোটে জিতে যাবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে সবকিছু রাতারাতি পাল্টে যাবে না, কিন্তু প্রাপ্তির আছে অনেক কিছু। এ নির্বাচন হোক ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ নির্বাচন, মহান সংসদ হতে পুতুলবিরোধী দল, সোকল্ড তারকা, সেলিব্রিটি সাংসদ বিলুপ্ত হোক।

একটি শক্তিশালীবিরোধী দলের মেরুদণ্ডে সংসদ হোক গণমানুষের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিক। অপ্রিয় সত্য, নির্বাচিত সরকারে যেই যাবে- সে স্বৈরাচার হতে চাইবে। শাসক মাত্রই স্বৈরাচার হওয়ার সুপ্ত বাসনা লালনকারী, মুখে বলে না, ঠোঁটে নাড়েনা—; কিন্তু ঘুম আসে না ক্ষমতার পৈশাচিক মোহে। অতএব, এ নির্বাচনে শক্তিশালী একটি বিরোধী পক্ষ প্রয়োজন।

আসন্ন নির্বাচন ও গণভোটের সাফল্যের উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।

বর্তমান সরকার সে লক্ষ্যে সাহস ও প্রচেষ্টার জন্য একটি ধন্যবাদ পেতে পারেন। অনেক আক্ষেপ, অভিযোগ আছে আমাদের, এই সরকার যদি নির্বাচনটাও অবাদ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষভাবে উপহার না দিতে পারে তবে পুরো সরকারের মান-সম্ভ্রম ম্লান হবে, ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে! জেনারেশন জি হিসেবে দ্বিতীয় ধন্যবাদ তোলা রাখব আমরা। নির্বাচন কমিশনের শতভাগ নিরেপক্ষতা, নির্বাচন অবাদ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হলে সেই ছোট্ট ‘ধন্যবাদ’ টাও প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস পাবেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত