ঢাকা শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ডিজিটালের আড়ালে বাংলাদেশ

নুশরাত জাহান অনন্যা, শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ডিজিটালের আড়ালে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ ডিজিটাল হবে, অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলবে এমন স্বপ্নভরা কথা, বক্তব্য আমরা সবাই শুনেছি, জেনেছি এবং পড়েছি। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি অনেকটা হুমায়ুন গল্পের চরিত্রগুলোর মতো, যার বাস্তবতার সঙ্গে কোনো মিল নেই, কল্পনার জগতে স্থান বেশি পায়। এটি হাস্যকর নয়, বরং চিন্তার বিষয়। বাংলাদেশে ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণা প্রথম ২০০৯ সালে ঘোষিত হয়, যার লক্ষ্য ছিল ২০২১ সালের মধ্যে প্রযুক্তিনির্ভর উন্নত দেশ হিসেবে দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশন নিশ্চিত করা। এর অংশ হিসেবে নানা ধরনের অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং সেবা তৈরি করা হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নির্মাণ অবকাঠামো হলো পদ্মা সেতু (২০২২), যা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের পাশাপাশি ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একইভাবে, মেট্রোরেল (MRT Line-6, 2022) চালু হওয়া দেশের স্মার্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমের উন্নয়নের একটি বড় ধাপ। এছাড়াও, কর্ণফুলী টানেল (২০২৩) চট্টগ্রাম শহরে স্মার্ট সিটি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিকাশের জন্যও দেশের স্কুল, কলেজ ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম (২০১৪) চালু করা হয়েছে এবং ICT স্কিল ডেভেলপমেন্ট ও ফ্রিল্যান্সিং ট্রেনিং (২০১৫-বর্তমান) দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগ অবশ্য দেশের অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন। আমারা এর অস্বীকার করতে পারব না। কিন্তু প্রশ্নের বিষয় হচ্ছে, যে দেশের মানুষের তিন বেলা পেট ভরানোর মতো খাবার নেই সে দেশ ডিজিটাল হবে, তা ভাবা বিলাসিতা। আমার এই কথাতে অনেকে আমাকে বোকার ট্যাগ দিয়ে দিতে পারে কিন্তু বাংলাদেশে যে সমস্যাগুলো চলছে তার সমাধান না করে বাংলাদেশকে ডিজিটাল বলা যায় না। যদি গুটিকয়েক সমস্যার কথা উল্লেখ করতে যাই তাহলে প্রথমে দাঁড়াবে দারিদ্র্যতার হার। জনসংখ্যার বড় অংশ এখনও নিম্ন আয়ের সীমানার নিচে জীবনযাপন করছে। গ্রামীণ ও নগর উভয় অঞ্চলে দারিদ্র্য দেখা যায়, বিশেষ করে শিক্ষার অভাব, শ্রমিকদের অল্প পারিশ্রমিক এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধার কারণে অনেক পরিবার জীবনের মৌলিক চাহিদাও পূরণ করতে পারছে না। এ দায় অবশ্য রাষ্ট্রেরই। কারণ তাদের জীবন ব্যবস্থার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাদের স্বপ্ন দেখানো হয়েছে কিন্তু স্বপ্নের বাস্তবায়ন করা হয়নি। তাদের কাজে লাগানো হয়েছে কিন্তু কাজের যথাযথ মূল্যায়ন দেওয়া হয়নি। এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা যদি উল্লেখ করতে যাই তাহলে সামনে চলে আসবে দেশে বাজার মূল্যদ্রব্যের ঊর্ধ্বগতি বা মূল্যস্ফীতি, যা একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা। প্রধান খাদ্যদ্রব্য, জ্বালানি এবং দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য পণ্যের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষ- বিশেষ করে মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য প্রতিনিয়ত চাপ তৈরি করে যাচ্ছে। দাম বৃদ্ধির সঙ্গে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এক বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ অনেক আগেই হেরে গেছে। কারণ বাংলাদেশের প্রত্যেক সমস্যার মূল থেকে সমাধান করার কথা কেউ চিন্তা করে না। অন্যদিকে চাকরির ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকাও এক বড় সমস্যা । উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তির সংখ্যার তুলনায় চাকরির সুযোগ সীমিত। প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে প্রায় বলতে শোনা যায়- বিদেশে আমার সাবজেক্টের অনেক দাম। পড়াশোনা শেষ করে তারা বাইরে যেতে চায় কর্মসংস্থানের খোঁজে। একটি ভালো জীবনের খোঁজে। যারা বাইরের দেশে যেতে পারে না, তারা দেশের মধ্যেই ভুগে মরে রাষ্ট্র তাদেরও চাকরি দিতে ব্যর্থ হয়। এর পেছনের কারণ আমি আর না-ই বলি। এসবের উপরেও একটি গুরুতর সমস্যা হলো নারীর অনিরাপত্তা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নারীরা যৌন ও শারীরিক হেনস্তার শিকার হচ্ছে, যা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে। শুধু যে বাধা সৃষ্টি করছে তা নয়, তাদের ওপর যে অন্যায় হয়েছে বা হয় তার বিচার প্রশাসন করতে পারে না।

যেখানে একটি দেশের বাজারব্যবস্থা, মৌলিক শিক্ষা খাতে ঘাটতি, কর্মসংস্থানে ঘাটতি, গবেষণায় ঘাটতি, উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি, নারী নিরাপত্তায় ঘাটতি এমন দেশে ডিজিটাল হবে পরিকল্পনা করায় বোকামি। এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য প্রথমেই দরকার দারিদ্র্যতা হ্রাস। এর জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি, কৃষি উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি কার্যকর করা জরুরি। বাস্তবায়নের জন্য রাজস্ব বাড়ানো, দরিদ্রদের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। খাদ্য ও জ্বালানির উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং লজিস্টিক ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমানো সম্ভব। চাকরি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিও অত্যন্ত জরুরি। শিল্প, প্রযুক্তি, কৃষি ও সেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে শিক্ষিত যুবকদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, স্টার্টআপ ও ফ্রিল্যান্সিং প্রচার করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে যুবকরা দেশের মধ্যেই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারবে। একই সময়ে, নারীর নিরাপত্তা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা দরকার। আইনশৃঙ্খলা শক্তিশালী করা, নারী শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করাই মূল চাবিকাঠি হওয়া উচিত। পুলিশ ও প্রশাসনের কার্যকারিতা উন্নত করা এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা ও সহায়তা কেন্দ্র চালু করা এই লক্ষ্যে সহায়ক হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগও অপরিহার্য। মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সর্বত্র পৌঁছে দিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের জন্য শক্ত ভিত তৈরি করা যাবে। এই সব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করলে দেশের মানুষ মৌলিক চাহিদা, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারবে বাংলাদেশ। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে পরিচিত হতে পারবে এবং কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তবতার জগতে নামতে সক্ষম হবে। গত কয়েক বছরে আমরা দেখেছি যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর ক্ষতিকর কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত