ঢাকা শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

দারিদ্র্য বিমোচন : টেকসই শান্তির একমাত্র শক্তিশালী অস্ত্র

দারিদ্র্য বিমোচন : টেকসই শান্তির একমাত্র শক্তিশালী অস্ত্র

সাম্প্রতিক বিশ্বরাজনীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘শান্তি’ শব্দটি যেন ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। যুদ্ধ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা আর আধিপত্যবাদের দামামার মাঝে আমরা ভুলে যাচ্ছি যে, শান্তির সবচেয়ে বড় শত্রু কোনো সীমান্ত বিরোধ নয়, বরং মানুষের মৌলিক চাহিদার অপূর্ণতা। বিখ্যাত প্রবাদ রয়েছে, ‘ক্ষুধার্ত পেটের কাছে কোনো নীতিবাক্যই খাটে না।’ আর এই চরম সত্যটিই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, দারিদ্র্য বিমোচন শুধু একটি অর্থনৈতিক লক্ষ্য নয়, বরং এটিই শান্তির সবচেয়ে শক্তিশালী ও টেকসই অস্ত্র।

আমাদের দেশে অশান্তি বা সংঘাত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। যখন কোনো জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ শিক্ষা, চিকিৎসা এবং উন্নত জীবনযাত্রার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তখন সেখানে চরমপন্থা এবং অপরাধ প্রবণতা ডালপালা মেলে। দারিদ্র্য মানুষকে আশাহীন করে তোলে, আর সেই আশাহীনতা থেকেই জন্ম নেয় ক্ষোভ। এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সাধারণ মানুষকে দাঙ্গা বা যুদ্ধে ঠেলে দেয়। ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে, বিশ্বের যেসব অঞ্চলে গৃহযুদ্ধ বা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত বিদ্যমান, সেখানে দারিদ্র্যের হার সর্বাধিক। তাই বন্দুকের নল দিয়ে সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘটানো গেলেও, মনের ক্ষুধা না মিটলে প্রকৃত শান্তি কোনোদিনও আসবে না।

দারিদ্র্য বিমোচন মানে কেবল হাতে কিছু টাকা তুলে দেওয়া নয়। এটি একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া যার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে শিক্ষা, ক্ষমতায়ন এবং ন্যায়বিচার। যখন একটি মানুষ স্বাবলম্বী হয়, তখন তার মাঝে স্থিতিশীলতার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। কর্মসংস্থান থাকলে তরুণ সমাজ বিপথগামী হয় না। তারা তখন ধ্বংসের পরিবর্তে সৃজনে মন দেয়। দারিদ্র্যের কারণে মানুষ সহজেই উগ্র মতাদর্শে দীক্ষিত হয়। অভাব দূর হলে এই ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। দারিদ্র্য বিমোচনের একটি বড় অংশ নারীর ক্ষমতায়ন। নারীরা যখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হয়, তখন সমাজে সংহতি ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায়।

আজকের পৃথিবী সম্পদের প্রাচুর্যে ভরপুর, অথচ এই সম্পদের বণ্টন ভয়াবহ রকমের অসম। বিশ্বের মাত্র এক শতাংশ মানুষের হাতে গচ্ছিত আছে সিংহভাগ সম্পদ। এই বিশাল বৈষম্য এক প্রকার ‘কাঠামোগত সহিংসতা’। যখন একদল বিলাসিতায় মত্ত থাকে আর অন্যদল একবেলা খাবারের জন্য হাহাকার করে, তখন শান্তির ধারণাটি একটি পরিহাসে পরিণত হয়। শান্তি বজায় রাখতে হলে এই বৈষম্যের দেয়াল ভাঙতে হবে। সমৃদ্ধি যদি কেবল গুটি কয়েক মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেই সমৃদ্ধি একসময় সংঘাতের আগুনে ভস্মীভূত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

বর্তমান বিশ্বে সামরিক খাতে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়, তার মাত্র ১০ শতাংশ যদি দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যয় করা হতো, তবে পৃথিবীর চেহারা বদলে যেত। আমরা শান্তি রক্ষার নামে মারণাস্ত্র তৈরি করছি, কিন্তু যে অভাব মানুষের মনের শান্তি কেড়ে নিচ্ছে, তা দূর করতে কার্পণ্য করছি। পারমাণবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী অস্ত্র হলো একটি শিক্ষিত এবং ক্ষুধামুক্ত জাতি। টেকসই উন্নয়নের ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার (SDG) মধ্যে এক নম্বরটিই হলো ‘দারিদ্র্য বিলোপ’। কারণ এটি অর্জিত না হলে বাকি লক্ষ্যগুলো অধরাই থেকে যাবে।

দারিদ্র্য বিমোচনকে শুধু দয়া বা দান হিসেবে দেখলে চলবে না; একে দেখতে হবে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে। রাষ্ট্রগুলোকে বিনিয়োগ করতে হবে মানুষের মেধা বিকাশে, অবকাঠামো উন্নয়নে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তায়। দুর্নীতিমুক্ত শাসনব্যবস্থা এবং সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে না পারলে কোনো ‘শান্তি চুক্তি’ই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। শান্তি মানে কেবল যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়, শান্তি মানে মানুষের মর্যাদাপূর্ণ বসবাস। দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মানুষকে মুক্ত করতে পারাটাই হবে বর্তমান সভ্যতার শ্রেষ্ঠ বিজয়।

পরিশেষে বলা যায়, বুলেটের ভয় দেখিয়ে মানুষকে দমিয়ে রাখা যায়, কিন্তু তার হৃদয়ে শান্তি স্থাপন করা যায় না। শান্তির চারা রোপণ করতে হয় সমৃদ্ধির মাটিতে। দারিদ্র্য বিমোচন হলো সেই জাদুকরী অস্ত্র, যা হিংসার বদলে ভালোবাসা, বিভেদের বদলে ঐক্য এবং যুদ্ধের বদলে প্রগতির পথ দেখায়। বিশ্ব নেতৃবৃন্দ যদি সত্যিই একটি শান্তিপূর্ণ পৃথিবী আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে চান, তবে যুদ্ধের দামামা বন্ধ করে দারিদ্র্য বিমোচনের সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার এটাই উপযুক্ত সময়। মনে রাখতে হবে, দরিদ্রমুক্ত পৃথিবীই হলো যুদ্ধমুক্ত পৃথিবীর প্রথম শর্ত।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত