ঢাকা বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৮ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

এপস্টাইন ফাইল প্রকাশ ও বহির্বিশ্বে কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নতুন ঝুঁকি

মো. নূর হামজা পিয়াস
এপস্টাইন ফাইল প্রকাশ ও বহির্বিশ্বে কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নতুন ঝুঁকি

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে জেফ্রি এপস্টাইন সংশ্লিষ্ট নথিপত্র। ২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ লাখ লাখ পৃষ্ঠার নথি প্রকাশ করে, যা দীর্ঘদিন ধরে গোপন ছিল। এই নথিগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন সময়ে সংগৃহীত অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ ইমেল এবং তদন্তসংক্রান্ত নোট। এসব তথ্য প্রকাশের পর দেশজুড়ে রাজনৈতিক, সামাজিক ও গণমাধ্যম অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতাবান ও পরিচিত ব্যক্তিদের নাম থাকায় বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

প্রকাশিত নথির একটি অংশে ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনের তৈরি করা একটি তালিকার উল্লেখ রয়েছে, যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু যৌন নির্যাতনের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, এসব অভিযোগের বড় অংশই অযাচাইকৃত তথ্যসূত্র বা তথাকথিত টিপসের ওপর ভিত্তি করে সংগৃহীত। অর্থাৎ এগুলোকে প্রমাণিত অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি, বরং তদন্ত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল।

এই তালিকাটি তৈরি করা হয়েছিল গত বছরের আগস্ট মাসে, এমন সময় যখন এপস্টাইন সংক্রান্ত পুরোনো ফাইলগুলো পুনরায় খতিয়ে দেখছিল এফবিআই। শিশু শোষণ ও মানব পাচার সংক্রান্ত একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্সের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে এই নথির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে ঠিক কী কারণে এবং কোন প্রেক্ষাপটে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছিল, তা নথিতে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন ও জল্পনা তৈরি হয়েছে। বিচার বিভাগ এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, নথিগুলো প্রকাশের আগে দীর্ঘ সময় ধরে পর্যালোচনা করা হয়েছে। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ স্পষ্টভাবে বলেন, এই প্রক্রিয়ায় হোয়াইট হাউসের কোনো ধরনের তত্ত্বাবধান বা হস্তক্ষেপ ছিল না। তার ভাষায়, এটি ছিল একটি প্রশাসনিক ও আইনি দায়িত্ব পালন মাত্র, যার লক্ষ্য জনস্বার্থে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

নথিতে শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্প নন, আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উল্লেখ রয়েছে। এরমধ্যে রয়েছেন প্রযুক্তি ও ব্যবসা জগতের পরিচিত মুখ এলন মাস্ক, সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং সাবেক এক মার্কিন প্রশাসনের একজন হোয়াইট হাউস আইনজীবী। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই নথিতে সতর্ক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে এবং কোথাও সরাসরি অপরাধ প্রমাণের দাবি করা হয়নি। এই নথিপত্রের বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এতে বহু তথ্য একেবারেই যাচাইবিহীন বলে চিহ্নিত।

তদন্ত সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ নোটে উল্লেখ আছে যে, এসব তথ্যের অনেকটাই প্রাথমিক পর্যায়ের এবং সেগুলো যাচাই না হওয়া পর্যন্ত আইনি পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নয়। তবুও প্রকাশের পর সাধারণ মানুষের কাছে এগুলো চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ভুলভাবে ব্যাখ্যা হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই জেফ্রি এপস্টাইনের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো ধরনের অনৈতিক বা অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তার ঘনিষ্ঠ মহল থেকেও বারবার বলা হয়েছে, এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তথ্যভিত্তিক নয়। নতুন নথি প্রকাশের পরও ট্রাম্পপন্থী শিবির একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।

এপস্টাইন কাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা, অর্থ এবং বিচারব্যবস্থার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে। অনেকেই মনে করেন, এ ধরনের নথি প্রকাশ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়াতে সহায়ক। আবার অন্য একটি অংশের মতে, যাচাইবিহীন তথ্য প্রকাশ ব্যক্তিগত সম্মান ও আইনি ন্যায়ের জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। এই দ্বন্দ্বই বর্তমান বিতর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।

প্রকাশিত নথিপত্রে যে বিপুল পরিমাণ অযাচাইকৃত তথ্য পাওয়া গেছে, তা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। নথিতে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে শুধু মৌখিক অভিযোগ বা উড়ো খবরের ওপর ভিত্তি করে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম নথিবদ্ধ করা হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই তথ্যগুলো দীর্ঘ সময় ধরে তদন্তাধীন থাকে এবং কোনো প্রমাণ না পাওয়া যায়, তবে তা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সংগৃহীত তথ্যের গুণমান নিয়ে সংশয় তৈরি করে। এটি প্রমাণ করে যে, অনেক সময় উচ্চপর্যায়ের তদন্তেও তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের চেয়ে শুধু তথ্য জমানোর প্রবণতা বেশি থাকে, যা বিচারিক প্রক্রিয়ায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।

গণমাধ্যমে নথিগুলোর বিভিন্ন অংশ আলাদাভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। কোনো কোনো প্রতিবেদনে শিরোনামনির্ভর উপস্থাপনার কারণে বিষয়বস্তুর গভীরতা হারিয়ে যাচ্ছে বলে সমালোচনা উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সংবেদনশীল নথি প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট ও ব্যাখ্যা ছাড়া তথ্য তুলে ধরলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ যদিও দাবি করেছেন যে এই প্রকাশনায় হোয়াইট হাউসের কোনো হস্তক্ষেপ ছিল না, তবুও মার্কিন রাজনীতিতে শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের সম্পর্কের ভারসাম্য নিয়ে বিতর্ক থামছে না। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা গেছে, সংবেদনশীল নথি প্রকাশের সময় সরকারগুলো প্রায়ই নিজেদের ইমেজ রক্ষায় সচেষ্ট থাকে। এই ক্ষেত্রে ট্রাম্প বা মাস্কের মতো ব্যক্তিদের নাম থাকা সত্ত্বেও নথির মুক্তি ইঙ্গিত দেয় যে, বিচার বিভাগ হয়তো নিজেদের নিরপেক্ষতা প্রমাণে মরিয়া। তবে প্রশাসনিক স্বাধীনতার এই দাবিটি কতটা টেকসই, তা নিয়ে আইনি বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, যা ভবিষ্যতের শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের পথ দেখাতে পারে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিযোগ আর প্রমাণের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট না করলে বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা ক্ষুণ্ণ হতে পারে। নথিতে যেহেতু বহু তথ্য তদন্তাধীন বা অযাচাইকৃত, সেহেতু এগুলোকে আইনি সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে ধরা যাবে না। বরং এগুলোকে ইতিহাসের একটি অংশ হিসেবে দেখা উচিত, যা ভবিষ্যৎ তদন্তে সহায়ক হতে পারে।

এপস্টাইন সংশ্লিষ্ট মামলার আলোচনায় প্রায়ই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম গুরুত্ব পায়, কিন্তু ভুক্তভোগী নারী ও শিশুদের মানসিক যন্ত্রণার বিষয়টি আড়ালে থেকে যায়। এই লক্ষ লক্ষ পৃষ্ঠার নথি প্রকাশের ফলে অনেক ভুক্তভোগীর পরিচয় বা তাদের দেওয়া জবানবন্দি নতুন করে জনসম্মুখে আসার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, জনস্বার্থে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি হলেও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং তাদের ট্রমাকে সম্মান জানানো সমান গুরুত্বপূর্ণ। নথিতে উল্লেখ করা অনেক বর্ণনা অত্যন্ত স্পর্শকাতর, যা পুনরায় প্রকাশিত হওয়ায় দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইয়ের পর শান্তিতে থাকা ভুক্তভোগীদের সামাজিক জীবনে নতুন করে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

এই ঘটনাপ্রবাহ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। নির্বাচনের প্রাক্কালে এ ধরনের নথি প্রকাশ রাজনৈতিক বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। ফলে নথির আইনি গুরুত্বের পাশাপাশি এর রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও আলোচনা জোরদার হয়েছে। এলন মাস্কের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের নাম এই নথিতে অন্তর্ভুক্ত থাকা ইঙ্গিত দেয় যে, জেফ্রি এপস্টাইন কীভাবে সুকৌশলে বিত্তশালী ও প্রভাবশালী মহলে নিজের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করেছিলেন। সিলিকন ভ্যালি থেকে শুরু করে ওয়াল স্ট্রিট পর্যন্ত বিস্তৃত এই যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রমাণ করে যে, অর্থ ও প্রতিপত্তি অনেক সময় নৈতিকতাকে হার মানায়। যদিও মাস্ক বা অন্য ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত নয়, তবুও তাদের এপস্টাইনের মতো ব্যক্তির সঙ্গে সামাজিক মেলামেশা কর্পোরেট নৈতিকতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ঘৃণা ও সংশয় তৈরি করেছে। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষা দেয় যে, ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা ও নৈতিক আচরণ বজায় রাখা অপরিহার্য।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো আবার ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখছে। তাদের মতে, এপস্টাইন কাণ্ডের মূল আলোচনায় থাকা উচিত ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার এবং ভবিষ্যতে এমন অপরাধ প্রতিরোধের কাঠামো গড়ে তোলা। নামকেন্দ্রিক বিতর্কে সেই মূল বিষয়টি আড়ালে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এপস্টাইন সংশ্লিষ্ট এই আইনি মহাযজ্ঞ থেকে শিক্ষা নিয়ে মার্কিন বিচারব্যবস্থায় বড় ধরণের সংস্কারের দাবি উঠেছে। বিশেষ করে মানব পাচার ও যৌন নিপীড়ন সংক্রান্ত মামলায় কীভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নজরদারিতে রাখা যায় এবং গোপন নথি প্রকাশের সঠিক সময় কোনটি হওয়া উচিত, তা নিয়ে নতুন আইন প্রণয়নের কথা ভাবছেন বিশেষজ্ঞরা। তথ্য অধিকার আইন (FOIA) এবং ব্যক্তির গোপনীয়তার মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। দীর্ঘ সময় ধরে নথিপত্র গোপন রাখার সংস্কৃতি অপরাধীদের আড়াল করার সুযোগ দেয় কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই বিতর্ক ভবিষ্যতে আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে।

এই নথি প্রকাশ একদিকে যেমন তথ্য জানার অধিকারকে সামনে এনেছে, অন্যদিকে দায়িত্বশীল প্রকাশনার প্রশ্নও তুলেছে। রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমের উচিত হবে তথ্যের সঙ্গে ব্যাখ্যা ও সতর্কতা যুক্ত করা, যাতে জনমত গঠনে ভুল বার্তা না যায়। নথির প্রতিটি অংশ আলাদা করে বিচার করার প্রয়োজনীয়তাও এখানেই। জেফ্রি এপস্টাইন সংশ্লিষ্ট এই নতুন নথিপত্র শুধু কিছু নামের তালিকা নয়, বরং এটি ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিচারিক দীর্ঘসূত্রতার এক জীবন্ত দলিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প বা এলন মাস্কের মতো ব্যক্তিদের নাম থাকা এই বিতর্ককে জনপ্রিয় করলেও, মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সত্যের উদ্ঘাটন এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। অভিযোগের পাহাড় থেকে সত্যকে আলাদা করা কঠিন কাজ, তবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি বজায় রাখতে এই কঠিন পথটিই পাড়ি দিতে হবে। আগামী দিনগুলোতে এই তথ্যের ভিত্তিতে আরও গভীর তদন্ত এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই শুধু একটি নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন করা সম্ভব হবে।

মো. নূর হামজা পিয়াস

শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত