ঢাকা বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৮ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সংকট পণ্যে নয়, বরং প্রস্তুতিতে

সুমাইয়া সিরাজ সিমি
সংকট পণ্যে নয়, বরং প্রস্তুতিতে

রমজান এলেই বাংলাদেশের বাজার যেন একটি অঘোষিত পরীক্ষার হলে পরিণত হয়। কে টিকবে, কে হিমশিম খাবে, তার হিসাব শুরু হয়ে যায়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, সরবরাহ আর প্রাপ্যতা সবমিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন তখন এক কঠিন সমীকরণে আটকে পড়ে। অথচ এবার পরিস্থিতি আরও বিস্ময়কর। কারণ বাস্তব অর্থে পণ্যের ঘাটতি নেই। চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে আছে ২১ লাখ টনের বেশি ভোগ্যপণ্য। চাল, গম, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেল, সবই আছে। তবুও বাজারে অস্বস্তি, উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তা।

এই বৈপরীত্যই সবচেয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়। পণ্য আছে বন্দরে, অথচ বাজারে মানুষ স্বস্তিতে কিনতে পারছে না, এই সংকট আসলে কোথায়? এটি কি বৈশ্বিক কোনো অস্থিরতার ফল, নাকি অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা? এই চিত্রটি একেবারে নতুন নয়। নতুন হলো, সংকটের ব্যাখ্যার বহর। কখনও বলা হচ্ছে লাইটার জাহাজ নেই, কখনও বলা হচ্ছে আমদানিকারকের গুদাম সংকট, আবার কখনও অভ্যন্তরীণ পরিবহনের দুর্বলতার কথা উঠে আসছে। কিন্তু এসব ব্যাখ্যার ভিড়ে মূল প্রশ্নটি চাপা পড়ে যায়, এই সমস্যাগুলো কী হঠাৎ তৈরি হয়েছে, নাকি বছরের পর বছর ধরে অবহেলায় জমে উঠেছে?

রমজান তো অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনা নয়। এটি প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়েই আসে। তাহলে কেন আগেভাগে প্রস্তুতি থাকে না? কেন প্রতিবার রোজা এলেই বাজার ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ে? কেন বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়? কেন লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা এখনও মৌসুমি সংকটে পরীক্ষায় ফেল করে?

সরকারি হিসাব বলছে, বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের পর তা লাইটার জাহাজে করে দেশের বিভিন্ন ঘাটে পাঠানো হয়। কিন্তু সেই লাইটার জাহাজই এখন সবচেয়ে বড় সংকট। ফলে বন্দরে পণ্য আটকে থাকছে, খালাসে ধীরগতি দেখা দিচ্ছে, আর বাজারে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম চাপ। অর্থাৎ পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাটি একটি দুর্বল কড়ির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় এমন ঝুঁকিপূর্ণ নির্ভরতা কী আদৌ গ্রহণযোগ্য?

সরকার বলছে, প্রতিদিন গড়ে ৫০-৬০ হাজার টন পণ্য খালাস করার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু সক্ষমতা থাকা আর সক্ষমতা কাজে লাগানো এক বিষয় নয়। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সমন্বয়ের অভাব, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি এবং তদারকির দুর্বলতায় সেই সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাজারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে।

এখানে আমদানিকারকদের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। অনেক আমদানিকারকের নিজস্ব গুদাম নেই। ফলে তারা সময়মতো পণ্য খালাস করতে পারছেন না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যাদের পণ্য সংরক্ষণের সক্ষমতা নেই, তারা কীভাবে এতো বড় পরিসরে ভোগ্যপণ্য আমদানির অনুমতি পান? রাষ্ট্র কি আদৌ তাদের লজিস্টিক সক্ষমতা যাচাই করে? যদি না করে থাকে, তবে এই অব্যবস্থাপনার দায় কার?

তদারকির অভাব এখানে সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। পণ্য বন্দরে আটকে থাকলে ডেমারেজ বাড়ে, পরিবহন খরচ বাড়ে, সংরক্ষণ ব্যয় বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচ এসে পড়ে ভোক্তার ঘাড়ে। ফলে বাজারে দাম বাড়ে অথবা সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়ে। এই সুযোগে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী পরিস্থিতিকে কাজে লাগায়। সংকট বাস্তব হোক বা কৃত্রিম, মুনাফার পথ তারা ঠিকই খুঁজে নেয়। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এই পরিস্থিতি সবচেয়ে নির্মম। রমজান মানেই তাদের জন্য বাড়তি চাপ, আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা, পরিবারের প্রয়োজন মেটানো, ন্যূনতম পুষ্টির নিশ্চয়তা দেওয়া। অথচ বাজার ব্যবস্থাপনার এই ব্যর্থতা তাদের সেই সামান্য স্বস্তিটুকুও কেড়ে নিচ্ছে। মানুষ স্বেচ্ছায় সংযম করছে না, বাধ্য হয়ে কাটছাঁট করছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সংকটকে আমরা প্রায় স্বাভাবিক করে নিয়েছি। যেন রমজান মানেই বাজারে অস্থিরতা, মানেই মানুষের কষ্ট। এই মানসিকতা থেকেই সরকারের প্রস্তুতির শূন্যতা আরও গভীর হচ্ছে। সংকট এলে সাময়িক তৎপরতা দেখা যায়, কিছু আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু সংকট কেটে গেলে আর কোনো জবাবদিহি থাকে না।

এই কারণেই প্রতিবছর একই দৃশ্য ফিরে আসে। রমজানের আগে আলোচনা, সংবাদ, উদ্বেগ। রমজান শেষে নীরবতা। কোনো কমিশন হয় না, কোনো স্থায়ী সংস্কার হয় না, কোনো দায় নির্ধারণ হয় না। ফলে পরের বছর আবার একই প্রশ্ন, পণ্য আছে, তবুও মানুষ স্বস্তিতে বাজার করতে পারে না কেন?

অথচ এই সংকট এড়ানো অসম্ভব ছিল না। আগাম পরিকল্পনা থাকলে লাইটার জাহাজের সংখ্যা নিশ্চিত করা যেত। গুদাম সুবিধা সম্প্রসারণ করা যেত। আমদানিকারকদের জন্য ন্যূনতম লজিস্টিক সক্ষমতা বাধ্যতামূলক করা যেত।

সুমাইয়া সিরাজ সিমি

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত