প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
একটি রাষ্ট্রকে যদি একটি জীবন্ত দেহ ধরা হয়, তবে সাংবাদিকতা হলো তার চোখ ও কণ্ঠস্বর। চোখ বন্ধ হয়ে গেলে যেমন মানুষ চারপাশের বাস্তবতা দেখতে পায় না, তেমনি সাংবাদিকতার কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে গেলে রাষ্ট্রও অন্ধকারে ঢেকে যায়। সত্যের আলো পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব যারা নেন, তারাই সাংবাদিক। তারা প্রশ্ন করেন, অনুসন্ধান করেন, প্রকাশ করেন যাতে সমাজ নিজেকে দেখতে পারে স্পষ্টভাবে। কিন্তু যখন সেই কণ্ঠই বারবার আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তখন প্রশ্ন জাগে যারা রাষ্ট্রকে সচেতন রাখে, তাদের নিরাপত্তার প্রশ্নে রাষ্ট্র নিজেই কেন নিশ্চুপ? সাংবাদিকদের নিরাপত্তার এই মূল্যহীনতা যেন রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো এবং উন্নত রাষ্ট্র গড়ার পথের সবচেয়ে বড় অন্তরায়।
রাষ্ট্র ও জনগণের মাঝখানে একটি অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী সেতু রয়েছে। সেই সেতুর নাম সাংবাদিকতা। জনগণের ভাষা রাষ্ট্রের কানে পৌঁছে দেন সাংবাদিক, আবার রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত জনগণের কাছে তুলে ধরেন তিনিই। একটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো কতটা সুসংহত, তা অনেকাংশে নির্ভর করে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার ওপর। আজকের বিশ্বে আমরা ঘরে বসেই জানতে পারি দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের খবর, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, যুদ্ধ, দুর্নীতি, সাফল্য কিংবা বিপর্যয়ের সংবাদ। এই পুরো বিশ্বকে হাতের মুঠোয় এনে দেন সাংবাদিকেরা। ঝড়-ঝঞ্ঝা, সংঘর্ষ, রাজনৈতিক উত্তেজনা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ সবকিছুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে তারা খবর সংগ্রহ করেন। কখনও কখনও নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে সত্যকে সামনে আনেন। তাদের কাজ শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়, বরং সমাজকে সচেতন রাখা, অন্যায়ের প্রতিবাদ তুলে ধরা, ক্ষমতার অপব্যবহারকে প্রকাশ করা এবং গণতন্ত্রকে সুসংহত রাখা। নিরপেক্ষতা, সততা, সাহস ও দায়িত্ববোধ এসব গুণ একজন প্রকৃত সাংবাদিকের পরিচয় বহন করে।
সাংবাদিকের ওপর হামলা, মামলা, হুমকি এমনকি প্রাণনাশের ঘটনা ঘটে চলছে প্রতিনিয়ত। কোনো দুর্নীতির খবর প্রকাশ করায়, কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অপকর্ম তুলে ধরায় বা ক্ষমতার সমালোচনা করায় তারা আক্রমণের মুখে পড়েছেন। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিক আহত হন। আবার কোনো রাজনৈতিক উত্তেজনার মুহূর্তে সাংবাদিকদের ওপর হামলা হয়, ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়। এসব ঘটনার বিচার অনেক সময় দীর্ঘসূত্রতায় হারিয়ে যায়। ফলে নিরাপত্তাহীনতা আরও বেড়ে যায়। যে মানুষটি জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করছেন, তার নিজের নিরাপত্তা কেন অনিশ্চিত থাকবে? সাংবাদিকের উপর যখন নিরাপত্তা বাহিনীর ইচ্ছাকৃত হামলার ঘটনা জনসম্মুখে আসে তখন রাষ্ট্র বেছে নেয় নীরবতা। একজন সাংবাদিকের নিরলস পরিশ্রমের প্রতিদান রাষ্ট্র দেয় নীরবতার মাধ্যমে। বলাবাহুল্য, এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে গণতন্ত্রের চাবিকাঠি গণমাধ্যমের প্রতি অন্যায়, অবিচার হয়, সেখানপ সুশাসন প্রতিষ্ঠা, উন্নত রাষ্ট্র গড়ে তোলা স্বপ্ন মাত্র। সাংবাদিকদের নিরাপত্তাহীনতার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। ক্ষমতাবানদের অস্বস্তির কারণে এমনটি হয়। সত্য সবসময় আরামদায়ক নয়। যখন কোনো সাংবাদিক দুর্নীতি, অনিয়ম বা অন্যায় তুলে ধরেন, তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তা ঢাকতে চান। ফলে সাংবাদিক হয়ে ওঠেন তাদের চোখের কাঁটা। আইনের দুর্বল প্রয়োগের কারণে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত হয় না। সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার যথাযথ তদন্ত ও বিচার না হলে অপরাধীরা সাহস পায়। শাস্তির নিশ্চয়তা না থাকলে নিরাপত্তাহীনতা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে সাংবাদিকরা নিরাপত্তাহীনতার স্বীকার হন। অনেক সময় সাংবাদিকদের পক্ষপাতদুষ্ট আখ্যা দিয়ে তাদের ওপর আক্রমণকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অথচ প্রকৃত সাংবাদিকতার মূলভিত্তি হলো নিরপেক্ষতা ও তথ্যনির্ভরতা। প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার অভাব। অনেক সংবাদকর্মী ফিল্ডে কাজ করলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ বা সুরক্ষাব্যবস্থা থাকে না। ফলে তারা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে একা পড়ে যান।
রাষ্ট্রের নীরবতার পেছনেও কারণ রয়েছে। অনেক সময় সরকার সমালোচনাকে অস্বস্তিকর মনে করে। ফলে সরাসরি না হলেও নীরব সমর্থন বা নিষ্ক্রিয়তা দেখা যায়। আবার কখনও রাজনৈতিক চাপ বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। কিন্তু এই নীরবতা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রেরই ক্ষতি করে। কারণ গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হলে জনগণের আস্থা কমে যায়।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ। সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার দ্রুত তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিশেষ সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ কভারেজের সময় সাংবাদিকদের জন্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিতে হবে। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে সাংবাদিকের ওপর আক্রমণ মানেই গণতন্ত্রের ওপর আক্রমণ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। চতুর্থত, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে। তাদের কর্মীদের জন্য আইনগত সহায়তা, মানসিক সহায়তা এবং নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ভীতি প্রদর্শনের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। সমালোচনা গণতন্ত্রের অংশ, সেটিকে শত্রুতা হিসেবে দেখা যাবে না।
একজন সাংবাদিক শুধু পেশাজীবী নন, তিনি সমাজের বিবেক। তিনি নিজের ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা ও অনেক সময় পারিবারিক শান্তি বিসর্জন দিয়ে জনগণের জানার অধিকার রক্ষা করেন। রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য নিজেকে সঁপে দেন। তাই সাংবাদিকের নিরাপত্তার প্রশ্নে রাষ্ট্রের নীরবতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্র যদি সত্যিই গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, তবে তাকে সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে কেবল একটি পেশাকে রক্ষা করা নয়, বরং পুরো সমাজের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারকে রক্ষা করা। সাংবাদিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা পোষণ করতে হবে। কারণ আয়না ভেঙে দিলে সত্য অদৃশ্য হয় না, বরং সমাজ অন্ধকারে ডুবে যায়। আর সেই অন্ধকারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র নিজেই।
নুসরাত জাহান স্মরনীকা
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়