প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
বাংলা আমাদের প্রাণের ভাষা, আমাদের মাতৃভাষা। এই ভাষার জন্যই একটি জাতি বুকের রক্ত দিয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়ার ঘটনা বিরল। ১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেছিলেন- ‘উর্দু এবং শুধু উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।’ সেই ঘোষণার প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ রাজপথে নেমে আসে। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে আত্মদান করেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেকে। তাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো- যে ভাষার জন্য আমরা আন্দোলন করেছি, প্রাণ দিয়েছি, সেই ভাষাকে দৈনন্দিন জীবনে আমরা কতটা ব্যবহার করছি? আমরা কি সত্যিই বাংলাকে প্রাপ্য সম্মান দিচ্ছি? বর্তমান সমাজে এক অদ্ভুত মানসিকতা তৈরি হয়েছে। অনেকে মনে করেন, ইংরেজিতে কথা না বললে মানুষ শিক্ষিত নয়। স্কুল থেকে শুরু করে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি চাকরির ক্ষেত্রেও ইংরেজিতে সাবলীলভাবে কথা বলতে না পারলে তাকে পিছিয়ে পড়া ভাবা হয়। শহুরে জীবনে তো অনেক ক্ষেত্রে বাংলা বলাকে ‘কম মর্যাদার’ হিসেবে দেখা হয়। অভিভাবকরা সন্তানের মুখে বাংলা নয়, ইংরেজি শুনতে বেশি গর্ববোধ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বাংলার বদলে ইংরেজি বা অর্ধেক ইংরেজি-অর্ধেক বাংলা ব্যবহার যেন আধুনিকতার চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অথচ বাংলাদেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ বাংলায় কথা বলে। আমাদের চিন্তা, স্বপ্ন, আবেগ—সবকিছুর ভাষা বাংলা। মায়ের ডাক, গ্রামের আড্ডা, লোকগান, কবিতা- সবকিছুতেই বাংলার গভীর উপস্থিতি। তবুও আমরা ধীরে ধীরে বাংলাকে প্রান্তিক করে দিচ্ছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রেও প্রায়ই দেখা যায় ইংরেজি নম্বরকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। আবার অনেক শিক্ষার্থী শুধু ইংরেজিতে ভালো করার কারণে উচ্চতর অবস্থানে চলে যায়, যদিও তার বাংলা বা অন্যান্য বিষয়ে দক্ষতা তুলনামূলক কম। প্রশ্ন উঠতে পারে- তাহলে এখানে বাংলার স্থান কোথায়?
অবশ্যই ইংরেজি শেখা দরকার। ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা ও বৈশ্বিক যোগাযোগের জন্য এর গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু ইংরেজি শেখার নামে যদি আমরা নিজের ভাষাকে অবহেলা করি, সেটি আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি করে।
নিজের ভাষাকে ছোট করে অন্য ভাষায় বড় হওয়া যায় না।
বাংলাভাষার ব্যবহার শুধু কথাবার্তায় সীমাবদ্ধ নয়; শুদ্ধ উচ্চারণ ও সঠিক বানান ব্যবহারের দিকেও আমাদের নজর দিতে হবে। বর্তমানে অনেকেই বাংলা লিখতে গিয়ে ইংরেজি শব্দের অযথা মিশ্রণ করেন। বিজ্ঞাপন, ব্যানার, টেলিভিশন অনুষ্ঠান- অনেক জায়গায় বিকৃত বা ভুল বানানের বাংলা দেখা যায়। এতে নতুন প্রজন্ম ভুল শিখছে।
ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আত্মমর্যাদার ধারক। ২১ ফেব্রুয়ারি আমরা শহিদ মিনারে ফুল দিই, কালো ব্যাজ পরি, ভাষা শহিদদের স্মরণ করি। আন্তর্জাতিকভাবে এই দিনটি স্বীকৃতি পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। কিন্তু বছরজুড়ে আমরা কতটা বাংলা চর্চা করি? শুধু আনুষ্ঠানিকতা পালন করলেই কি ভাষার প্রতি দায়িত্ব শেষ হয়?
বাংলাভাষাকে সম্মান জানাতে হলে প্রথমেই আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। সন্তানদের ছোটবেলা থেকে বাংলা পড়তে ও লিখতে উৎসাহ দিতে হবে। সাহিত্যচর্চা বাড়াতে হবে। বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। প্রশাসনিক কাজ, অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলার ব্যবহার আরও বাড়াতে হবে। গণমাধ্যমেও শুদ্ধ ও সুন্দর বাংলা ব্যবহারের চর্চা থাকতে হবে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো নিজেদের ভাষাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেয়। তারা আন্তর্জাতিক ভাষা শিখলেও নিজস্ব ভাষার চর্চা বন্ধ করে না। আমরা কেন পারব না? আমাদের ভাষার আছে সমৃদ্ধ সাহিত্যভাণ্ডার, রয়েছে বিশ্বমানের কবি-সাহিত্যিক। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র- তাঁদের সৃষ্টিতে বাংলা ভাষা বিশ্ব দরবারে মর্যাদা পেয়েছে। এই ঐতিহ্য আমাদের গর্ব।
বাংলাভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব শুধু সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি আমাদের সবার। প্রতিদিনের কথাবার্তায়, লেখালেখিতে, সামাজিক যোগাযোগে আমরা সচেতনভাবে বাংলা ব্যবহার করলে ভাষা আরও শক্তিশালী হবে। ইংরেজি শিখব, প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করব; কিন্তু বাংলাকে ভুলে গিয়ে নয়।
ভাষা শুধু শব্দের সমষ্টি নয়; এটি একটি জাতির আত্মা। যে জাতি নিজের ভাষাকে সম্মান করে না, সে জাতি কখনোই প্রকৃত অর্থে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। তাই আসুন, শুদ্ধ উচ্চারণ ও সুন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাভাষাকে দৈনন্দিন জীবনের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনি। ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করি আমাদের ব্যবহার ও চর্চার মাধ্যমে।
বাংলা আমাদের গর্ব, আমাদের পরিচয়। এই পরিচয় যেন কখনও ম্লান না হয়- সেই দায়িত্ব আমাদেরই।
ওরাইনা খাঁন চৌধুরী
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়