প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
বাংলা ভাষা আমাদের প্রাণের ভাষা। আজ মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। শহিদদের স্মরণে আবারও ধ্বনিত হবে।- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি।’
২১ ফেব্রুয়ারি এলে আমরা বাংলা ভাষার জন্য আবেগ তাড়িত হই।
আমাদের সেই আবেগে কোনো খাদ নেই কারণ এই আবেগ সৎ না হলে কোনো জাতিই সভ্য হতে পারে না। ভাষার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান একটি জাতির সভ্যতার অন্যতম পরিচয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। সেই ত্যাগের ইতিহাস আমাদের জাতীয় চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই এই ভাষার প্রতি অবহেলা বা অনাদর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ে তরুণ সমাজের একটি অংশের মধ্যে মাতৃভাষার প্রতি সম্মানহীনতার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেউ কেউ বাংলায় কথা বলতে সংকোচ বোধ করে, আবার কেউ বাংলা ব্যবহারের জন্য অন্যকে উপহাসও করে। এই মানসিকতা ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও শহিদদের আত্মত্যাগের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য এ দেশের তরুণরাই বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল। রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ নাম না-জানা অসংখ্য শহিদের আত্মত্যাগে রচিত হয়েছে আমাদের ভাষা আন্দোলনের গৌরবগাঁথা। তাদের এই আত্মত্যাগের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। যা বিশ্বের ইতিহাসে এটি এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বাঙালি ছাড়া আর কোনো জাতি তার নিজের ভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করেনি, অকাতরে জীবন বিলিয়ে দেয়নি।
তবু দুঃখজনক হলেও সত্য, ভাষা আন্দোলনের সাত দশকেরও বেশি সময় পরও বাংলা ভাষার যথাযথ মর্যাদা সর্বক্ষেত্রে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। অনেক পরিবার সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভাষা আন্দোলনের চেতনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ভাষার সঙ্গে সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের যে গভীর সম্পর্ক, তা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। এখন বর্তমানে ইংলিশ মিডিয়ামের অনেক শিক্ষার্থীর বাংলা শুনলে মনে হয় না এটা তাদের মাতৃভাষা। আবার কোনো কোনো গণমাধ্যম বা বিজ্ঞাপনে এখন ইংরেজি-বাংলা-হিন্দি-আঞ্চলিক ভাষা মিশিয়ে যে কী বলা হচ্ছে, তার বুঝে ওঠা কঠিন। ভাষার অস্বাভাবিক মৃত্যুটাই ভাবার বিষয়। কোনো ভাষা যদি অন্য ভাষার আক্রমণে নিহত হয় বা সে নিজে আত্মহত্যা করে, কিংবা হঠাৎ করে তার ভাষাভাষীদের মৃত্যুর কারণে সে হারিয়ে যায়, তাহলে সেই ক্ষতি আর পূরণ হয় না। ইংরেজি, হিন্দি, বাংলা, আঞ্চলিক ভাষার সংমিশ্রণে মূলত প্রমিত বাংলা ভাষাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অতএব, আমাদের দায়িত্ব শুধু বাংলা ভাষায় কথা বলাই নয়, বরং ভাষাটিকে ভালোবাসা, চর্চা করা এবং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। নতুন প্রজন্মের কাছে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও চেতনাকে পৌঁছে দিতে হবে। পাশাপাশি আঞ্চলিক ভাষাগুলোর প্রতিও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। মাতৃভাষার প্রতি যত্ন ও শ্রদ্ধাই আমাদের জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সুদৃঢ়ভাবে টিকিয়ে রাখতে পারে। এছাড়া বাংলা ভাষাকে রক্ষার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং পারিবারিকভাবে বাংলাকে গুরুত্ব দিতে হবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘আগে মাতৃভাষা, পরে অন্য ভাষা।’ এই চরম সত্যকে আমাদের বুকে ধারণ করতে হবে। তবেই বাংলা ভাষার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে।
ফাহিমা আক্তার
শিক্ষার্থী, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ