ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

এই ভূমিতে বাংলা যেন মর্যাদাশীল থাকে

মনজুরুল আলম মুকুল, গণমাধ্যমকর্মী
এই ভূমিতে বাংলা যেন মর্যাদাশীল থাকে

বাংলা ভাষার পেছনে রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস ও বিবর্তনের ধারা। পৃথিবীর অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত ভাষার মতো বাংলার স্বতন্ত্র ও নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। বাংলা অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিবেশ, জলবায়ু, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, ধর্ম, রাজনৈতিক ও পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন অবস্থা এই ভাষার ওপর প্রভাব বিস্তার করে আছে। বাংলা ভাষার উৎপত্তির ইতিহাস নিয়ে এক সময় বিতর্ক ছিল, যেটা বর্তমানে শেষ হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে অনেক কিছু ঔপনিবেশিক ও পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ল্যাটিন ভাষা থেকে ইতালীয়, স্প্যানিশ ও ফরাসি ভাষার উদ্ভব। এই ব্যাখ্যার আলোকে সাধারণীকরণ করা হয় সংস্কৃত থেকে বাংলা, হিন্দি, উর্দু ও উপমহাদেশের অন্যান্য ভাষা এসেছে। তবে আধুনিক গবেষণায় এটা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সংস্কৃত ভাষা থেকে বাংলার উদ্ভব হয়নি। এটা বলা যেতে পারে সংস্কৃত শব্দ ও সাহিত্য দ্বারা বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, উর্দু আর হিন্দি ভাই ভাই ভাষা। উর্দু আর হিন্দি দুটি ভাষাই সংস্কৃতির অপভ্রংশ খাড়িবুলি থেকে উৎপন্ন। শব্দ, অর্থ, ভাষার উৎস ও ধরন একই। উর্দু লেখা হয়ে আরবি লিপিতে আর হিন্দি লেখা দেবনাগরী লিপিতে।

পৃথিবীর জীবিত-মৃত সব ভাষার আদি উৎস আফ্রিকা। প্রথম দিকে আফ্রিকার মানুষ যোগাযোগ ও ভাব আদান-প্রদানের জন্য একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করত। মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লে এক সময় মূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কালের বিবর্তনে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন ধরনের ভাষার উদ্ভব হয়। ভাষার পরিবার, বংশ, গোষ্ঠী আছে। পৃথিবীর সব জীবিত ও মৃত ভাষার প্রায় শতাধিক ভাষাগোষ্ঠী আছে। এদের প্রধান ১২টি। সবচেয়ে বেশি ভাষার জন্ম হয়েছে বা ছয়টি মহাদেশের অধিকাংশ ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী (প্রায় সাড়ে ৫ হাজার বছর আগে) থেকে এসেছে। এই ভাষাগোষ্ঠীর দুইটি ধারা ছিল। কেন্তমণ্ডযে ধারায় ইউরোপের লোকজন কথা বলত ও শতমণ্ডযে ধারায় ভারতীয়, মিশরীয়, ইরানি ও আরবিয়রা কথা বলত। শতমের ইরানী শাখা ইন্দো-ইরানীয় ভাষাগোষ্ঠীতে রূপ নেয় এবং এই শাখার লোকেরা পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে। এদের আর্য জাতি বলা হয় এবং ভাষা ছিল আর্য। ঐ সময় স্থানীয় ভারতীয় ও অনার্যদেরও ভাষা ছিল। আর্যরা (১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে) ভারতে আসা শুরু করলে ভারতীয় ভাষার সঙ্গে মিশে নতুন ভাষার, ভারতীয় আর্য ভাষা উদ্ভব হয়। এই ভারতীয় আর্য ভাষার দুটি রূপ ছিল; প্রাকৃত ভাষা (জনগণের কথ্য ও বোধ্য ভাষা) ও সংস্কৃত (লিখিত ভাষা)।

আঞ্চলিক ও উচ্চারণের ভিন্নতার কারণে ভারতে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃত ভাষা দেখা যায়। যেমন গৌড়ীয় প্রাকৃত, মাগধী প্রাকৃত, মহারাষ্ট্রী প্রাকৃত, শৌরসেনী প্রাকৃত, পৈশাচী প্রাকৃত ইত্যাদি। এমন অবস্থায় আর্যরা তাদের ভাষা রক্ষার জন্য সংস্কার করে এবং এই সংস্কারজাত ভাষাই সংস্কৃত। প্রাকৃত ভাষাগুলোর মধ্যে গৌড় এলাকার লোকেরা গৌড়ীয় প্রাকৃত ভাষায় কথা বলত। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, এই গৌড়ীয় প্রাকৃত (৭ম শতকে) থেকে বাংলা ভাষা এসেছে। অন্যদিকে, মগধ এলাকার লোকেরা মাগধী প্রাকৃত ভাষায় কথা বলত। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, দশম শতাব্দীতে এ মাগধী প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে। যাইহোক, এই দুটি ভাষারই বিকৃত ঘটে যথাক্রমে গৌড়ী অপভ্রংশ ও মাগধী অপভ্রংশ হয়ে যায়। আবার এই দুই বিকৃত রূপ বা অপভ্রংশ মিলে নতুন ভাষা তৈরি হয়, যাকে বলা হয় বঙ্গকামরূপী এবং এই বঙ্গকামরূপী থেকে এসেছে বাংলা, অসমিয়া ও উড়িয়া ভাষা।

ভাষা গবেষকদের মতে, বাংলা ভাষার উৎপত্তি বা সূচনাকালে এদেশে আর্য ও বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপক প্রভাব লক্ষণীয়। যে কারণে বাংলা ভাষায় অনেক সংস্কৃত শব্দ এসেছে। অন্যদিকে, বাংলা ভাষার সুগঠিত রূপ বা বিকাশ শুরু হয় দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকের দিকে এবং এই সময় শুরু হয় মুসলিম শাসন। মিশতে থাকে ফার্সি-আরবি শব্দ। রীতিমত পারস্যকরণ বলা যেতে পারে। ১৯৬৬ সালে শেখ গোলাম মাকসুদ হিলালি ফার্সি উৎসের ৯ হাজারের বেশি বাংলা শব্দ ও অভিব্যক্তির একটি অভিধান প্রকাশ করেন। এদেশে এসেছে পর্তুগীজ, ওলন্দাজ, ফরাসি, ইংরেজসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী এবং তাদের ভাষার অসংখ্য শব্দ মিশেছে বাংলা ভাষায়।

মূলকথা, বাংলার নিভৃত পল্লীতে আমাদের যে পূর্ব-পুরুষরা বাস করত, তাদের নিজেদের শব্দগুলোর সঙ্গে সঙ্গে অন্যদের থেকে কিছু কিছু নিয়ে বাংলা ভাষা তৈরির কাজ শুরু করেছিল। বলা যেতে পারে বাংলা একক কোনো ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর ভাষা নয়। বাংলায় স্থানীয় অনার্য জনগোষ্ঠী বা আমাদের পূর্বপুরুষরা প্রথমে কেউ হিন্দু বা মুসলিম ছিল না। এক সময় তাদের কেউ হিন্দু হয়, কেউ মুসলিম হয়।

এটা ইতিহাস স্বীকৃত যে, বাংলায় শাসন কার্য, ব্যবসা ও ধর্ম প্রচারের জন্য বহিরাগতরা এসেছে। আর বহিরাগতরা যারা বাংলায় থেকে গিয়েছিল তারা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছে কিন্তু পরিবর্তন করতে পারেনি। এক সময় নিজেরাই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যায়। উত্তর ভারত থেকে যেসব ব্রাহ্মণ বাংলায় এসেছিলেন তারা কেউ বউ বা স্ত্রী সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন এমন শোনা যায় না। তেমনই ইরান, মধ্য এশিয়া, আরব ও উত্তর ভারত থেকে যেসব মুসলিমরা বাংলায় এসেছিলেন তারাও সবাই বউ বা স্ত্রী সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন এমন তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় না। স্থানীয় মেয়েদের বিয়ে করে এখানেই ঘর সংসার শুরু করতেন। এ থেকে প্রমাণ হয় যে, বাংলায় যারা মা হয়েছে তারা সবাই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ছিল। আর ভাষা ও সংস্কৃতিতে মায়েদের প্রভাব থেকেই যায়। আমরা মাতৃভাষা বলি, পিতৃভাষা বলি না।

জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাভাষা চরম অবহেলা ও ষড়যন্ত্রের শিকার। বাংলা কোনো সময় রাজা-বাদশা বা উচ্চশ্রেণির লোকের ভাষা ছিল না। ছিল সাধারণ মানুষের ভাষা, পথের ভাষা, মাঠের ভাষা, কৃষকের ভাষা, শ্রমিকের ভাষা। ফার্সি ভাষা প্রায় ৬০০ বছর ও ইংরেজি প্রায় ২০০ বছর এ দেশের রাজ ভাষা ছিল। তারপরও বাংলা ভাষা বহাল তবিয়তে টিকে ছিল। কেননা উপরের দিকে পরিবর্তন হলেও নিচের দিকে তেমন প্রভাব পড়েনি।

প্রথমদিকে ব্রাহ্মণরা এ দেশের স্থানীয়দের অশালীন বা সভ্য নয় এমন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখত। বঙ্গ দেশে আসলে তাদের মাথা কামিয়ে বা মাথায় ঘোল ঢেলে পবিত্র হতে হতো। উপহাসের সঙ্গে বলত বঙ্গদেশের মানুষেরা পাখির মত কিচিরমিচির করে কথা বলে। যে কারণে ব্রাহ্মণরা বাংলা ভাষায় তাদের ধর্মাচার ও ধর্মীয় গ্রন্থ রচনা অনুপযুক্ত বলে মনে করত। তবে এই ব্যাখ্যা থেকে তারা এক সময় সরে আসে। বিশেষ করে শ্রী চৈতন্যদেবের (১৪৮৬-১৫৩৩ খ্রি.) বৈষ্ণব আন্দোলনের সময় বাংলার দাবি জোরালো হতে থাকে।

বাজারে প্রচলিত গৎবাঁধা ব্যাখ্যাগুলোর একটি বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান হয়েছে অভিবাসনের কারণে। যে কারণে অনেকের পূর্ব থেকে ভাবখানা এমন, ঐ যে গানে আছে ‘ইরান-তুরান (মধ্য এশিয়া) পার হয়ে এসেছি’। তবে, সম্প্রতিকালে হাড়গোড় ও অন্যান্য আধুনিক নৃতাত্ত্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি বাঙালি মুসলিমদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সিংহভাগ মিল। ইরান, তুরান (মধ্য এশিয়া) ও আরবের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের খুব কমই মিল রয়েছে। দেখা যায়, এক সময় কোনো কোনো ব্যক্তির ধারণা ছিল মুসলমানের ভাষা হল আরবি-ফার্সি-উর্দু। যে কারণে কেউ কেউ স্বপ্ন দেখেছিল, বাংলার পরিবর্তে ফার্সি অথবা উর্দু প্রচলনের; এমনকি উর্দুর মত আরবি হরফে বাংলা লেখার। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন কোনো দিন বাস্তবে রূপ নেয়নি। যে কারণে এক সময় কবি আবদুল হাকিমকে লিখতে হয়েছিল ‘যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত