প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে। যাতে সংসদ সদস্যরা ওই সনদের বিষয়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারেন। সংসদ সদস্যরা জনপ্রতিনিধি। নির্বাচনি আসনের ভোটারদের পক্ষ থেকে তারা কথা বলেন। ফলে সনদ বাস্তবায়নের দায় সংসদের হাতে ছেড়ে দেবে নেতৃত্বে আসা নতুন সরকার।
জুলাই সনদের সব বিষয় বাস্তবায়নের বাস্তবতা নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সনদের বেশ কিছু বিষয় বেআইনি, সংবিধান পরিপন্থি। সংস্কার নিয়ে যে দীর্ঘ আলোচনা চলেছে, সেখানে অনেক দলই ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে যে, তারা কিছু কিছু বিষয়ে একমত নয়। কেন তারা সেই ভিন্নমতকে মেনে নেয়নি, তার ব্যাখ্যা দিতে পারবে। সেখানে বিএনপি যেমন তাদের মত জানতে পারবে, তেমনি প্রধান বিরোধীদল জামায়াতও তাদের বিরোধিতা তুলে ধরতে পারবে। এটাও গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, অন্তর্বর্তী সরকার সব ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাদ দিয়ে সনদ স্বাক্ষরের আয়োজন করেছিল। বিএনপি-জামায়াতসহ বেশ কিছু দল সেই সনদে স্বাক্ষর করেছে। সে কারণে নোট অব ডিসেন্টগুলো নিয়ে সংসদরা আলোচনা করে গোটা বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারবেন। এটা একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত।
যখন সংসদ কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে, তখন তারাই হবেন আলোচনার প্রধান অংশীজন। সংসদীয় গণতন্ত্রের মৌলিকত্ব এখানেই যে, জনপ্রতিনিধিরাই আলোচনার মূলশক্তি। তারাই Constituency-এর প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংবিধান পরিপন্থি ও বেআইনি ইস্যুগুলো বাস্তবায়নের দায় কাঁধে নিতে চায় না বিএনপি। সবচেয়ে জটিলতার মধ্যে পড়বেন সংসদ সদস্যরা যখন সংবিধান সংশোধন করে এক কক্ষবিশিষ্টকে দ্বিকক্ষ সংসদে রূপ দেওয়ার আলোচনা শুরু হবে। সংসদ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হলে, কারা উচ্চকক্ষের সদস্য হবেন? তারা কি জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হবেন নাকি বিদ্যমান সংসদের ভোটের আনুপাতিক হারে তা বিভক্ত হবে? এর পাশাপাশি আছে যদি সে রকম সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে দলীয়ভাবে অনুগতরাই মনোনীত হবেন। যারা অনির্বাচিত প্রতিনিধি হবেন, তারা কি রাজনৈতিক দল করার অধিকার রাখেন কি না? সেটা যে অবৈধ ও বেআইনি বা অসাংবিধানিক হবে, সেটাই বোঝা গেল বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের বক্তব্যে। অনেক অসংগতি ও বেআইনি, যা সংবিধানকেই কণ্টকিত করবে, তা সহজেই বোঝা যায়। আবার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করলে ‘বর্তমান সংবিধানের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে, যা আইন ও সংবিধানের পরিপন্থি। বিষয়টি জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংস্কার হলে, তবেই তা গ্রহণযোগ্যতা পাবে।’ বিএনপি সেটাই চাইছে। সবাই যে তা চাইছে না, তা তো জুলাই সনদেই রয়েছে, যা নোট অব ডিসেন্টের মধ্যে আছে। নোট অব ডিসেন্ট তো আলোচনায় আসতে হবে। আবার সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব রেশিও হারের যে প্রশ্নটি তুলেছে জামায়াত, তা সংবিধানে অনুমোদিত নয়।
এই বিবেচনায় জনগণের ইচ্ছার প্রকাশ শুধু জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে হলে যারা ‘না’ ভোট দিয়েছেন, যারা ভোটার নন, তাদের অধিকার কোথায় থাকবে? ফলে এটি জটিল অবস্থার সৃষ্টি করবে। যার সূচিমুখ আমরা জেনেছি সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর হ্যাঁ ও না ভোটের মাধ্যমে। ‘হ্যাঁ’ ভোট ৩৮.০৬ শতাংশ, বাকিদের অবস্থান ‘না’-এর পক্ষে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, নির্বাচনের আগের ও পরের রাজনৈতিক অবস্থান এক রকম নয়। সংসদই সব কিছু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, সেখানে আলোচনা করেই যেকোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে বিএনপি। বেআইনি ও সংবিধান পরিপন্থি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না, এটা আমি নিশ্চিত করতে পারি। সংবিধান হচ্ছে আইনের উৎস বা সর্বোচ্চ আইন। তাকে সংশোধন করতে হলে সংসদ সদস্যরাই তা করতে পারেন। আমরা কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে পারি না। আসন্ন সংসদের কাঁধে অনেক দায় ও দায়িত্ব বর্তেছে। সেই পাহাড়সম জটিলতার সঙ্গে আছে দেশ ও জনগণের উন্নয়নকে সামনে নিয়ে আসা। গণতন্ত্রকে জনসম্পৃক্ত করতে হলে সময় দিতে হবে সংসদকে, সরকারকে দিতে হবে সেই সুযোগ ও সুবিধা। তা না হলে গণতান্ত্রিক ভিন্নমতে প্রগতির রোডম্যাপ লক্ষ্যচ্যুত হতে পারে। এটা নতুন বাংলাদেশে কাম্য।