প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
সন্ধ্যার ম্লান আলো যখন ওই জীর্ণ উঠোনের ধুলোয় এসে লুটোপুটি খায়, তখন এককালের মুখর ঘরগুলো যেন নিথর মৌনতায় ডুবে যায়। সেই দোচালা ছাদের নিচে একদা যে হাসি, অভিমান আর সজল স্নেহের অবিরাম বুনন চলত- আজ তা শুধু স্মৃতির ধুলোপড়া পাণ্ডুলিপিতেই বন্দি। সময় ও মানুষের জীবনধারার পাশাপাশি বদলেছে সম্পর্কের ভাষা। এই বদলানোর ভিতর সমাজের এক প্রান্তে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে একটি শব্দ- বৃদ্ধাশ্রম।
মনে প্রশ্ন জাগে, এটা কি শুধুই সময়ের দাবি নাকি পারিবারিক বন্ধনের অবক্ষয়?
মানবসভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই পরিবার ছিল মানুষের আদি ও অকৃত্রিম আশ্রয়স্থল। জন্মলগ্নের প্রথম ক্রন্দন থেকে বার্ধক্যের শেষ নিঃশ্বাস অবধি পরিবার মানুষকে জুগিয়েছে আত্মপরিচয়, স্নেহ, দ্বায়িত্ব ও মর্যাদা।
পরিবার শুধুমাত্র রক্তের সম্পের্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও উত্তরাধিকারের ধারক। বাবা-মা সন্তানের জন্য জীবন উৎসর্গ করে যেন সেই সন্তানই হয়ে ওঠে তাঁদের বার্ধক্যের অবিচল অবলম্বন। এমন একটি প্রাকৃতিক চক্রই যুগ যুগ ধরে পরিবারকে শক্ত ভিত দিয়েছে।
কিন্তু বর্তমানের শিল্পায়ন, নগরায়ন ও প্রযুক্তির অগ্রগতি পরিবার চক্রে ফাটল ধরিয়েছে। কর্মসংস্থানের কারণে গ্রাম থেকে শহরে গমনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, বিদেশে গমনের সংখ্যাও কম নয় যা যৌথ পরিবার ভেঙে গড়ে একক পরিবার। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জীবনের ব্যস্ততা রক্তের সম্পের্কগুলোকে দেওয়া সময় সংকুচিত করে দিয়েছে। মা-বাবার সেবা- যা একসময় ছিল স্বাভাবিক দায়িত্ব- তা আজ অনেকের কাছে ‘অতিরিক্ত বোঝা’ হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করেছে। এই প্রেক্ষাপটেই বৃদ্ধাশ্রমের ধারণা সামাজিক বাস্তবতায় জায়গা করে নেয়।
একদিকে, যেখানে সন্তানরা দূরে থাকে, কর্মব্যস্ত জীবনে বাবা-মায়ের দেখাশোনা করা সম্ভব হয় না সেখানে বৃদ্ধাশ্রম অনেকের কাছে আশ্রয় হয়ে ওঠে। বর্তমানে সন্তানদের এই দ্বায়িত্ব উদাসীনতা কিছুটা ঢাকতে সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বৃদ্ধাশ্রম চালু রয়েছে। বাংলাদেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত, দেশের ৬টি বিভাগে ‘শান্তি নিবাস’ নামের বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা ৬টি, যা সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে অবস্থিত।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এর স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস-২০২৩ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১ কোটি ৬৪ লাখের বেশি, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯.৭ শতাংশ। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, ৬০ ঊর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৫৩ লাখের বেশি। ২০৫০ সালে বাংলাদেশে প্রবীণের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ২০ লাখ অর্থাৎ ওই সময়কার মোট জনসংখ্যার ২২ থেকে ২৩ শতাংশ থাকবে প্রবীণ।
আর বাংলাদেশে মানুষের আয়ু যে হারে বাড়ছে তা অব্যাহত থাকলে আগামী ৩২ বছর পর দেশের প্রতি পাঁচজনে একজন থাকবেন প্রবীণ। তাই দিন দিন আমাদের ব্যস্ততা ও জনসংখ্যার পাশাপাশি বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্য বাড়বে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়- এই আশ্রয়ের পেছনে কি শুধু প্রয়োজন কাজ করছে, নাকি দায়িত্ববোধের অভাবও জড়িয়ে আছে? যখন জীবিত বাবা-মাকে পরিবারের বাইরে রেখে আসা হয়, তখন কি আমরা নিজের অজান্তেই পারিবারিক বন্ধনের এক টুকরো ছিঁড়ে ফেলি না? এই অবস্থার জন্য সন্তানদের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, ছোট পরিসরের বাসস্থান- সমানভাবে দ্বায়ী।
আবার কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রজন্মগত দূরত্ব ও মূল্যবোধের সংঘাত সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে। প্রবীণরা যেখানে ধীরস্থির জীবনে অভ্যস্ত। সেখানে তরুণ প্রজন্ম অভ্যস্ত দ্রুতগতির জীবনে। এই ব্যবধানও পারিবারিক টানাপোড়েন বাড়ায়।
তবু সত্য অস্বীকার করা যায় না- বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়া আমাদের সামাজিক ও নৈতিক সংকটের কথাই বলে। যে বাবা-মা সংসারের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকার কথা, তাদের দূরে সরিয়ে দিলে মানবতার খুটি নড়বড়ে হয়ে যায়। কারণ আজ যারা বৃদ্ধদের বৃদ্ধশ্রমে পাঠাচ্ছে সেই দৃশ্য পরবর্তী প্রজন্ম দেখে সেই শিক্ষা পাচ্ছে এবং তারাও সেইরূপ ব্যবহার করার মানসিকতা তৈরি করবে।
তাই আমাদের উচিত এই সামাজিক সমস্যার সমাধানে কথা ভাবা। সমাধান হয়তো বৃদ্ধাশ্রম পুরোপুরি বন্ধ করা নয়, বরং পরিবার ও সমাজের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা। পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে কিছু কিছু কাজ করতে পারে সন্তানেরা যেমন: প্রতিদিনের নির্দিষ্ট কিছু মুহূর্ত শুধু তাদের জন্য রাখা, খাবারের টেবিলে একসঙ্গে বসার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা, কিংবা সপ্তাহের ছুটির দিনটিকে পারিবারিক আড্ডায় রূপ দেওয়া।
বাবা-মায়ের সেবা এক ধরনের নৈতিক উত্তরাধিকার। আজ আমরা যেভাবে আমাদের প্রবীণদের দেখছি, আগামীকাল আমাদের সন্তানরাও আমাদের সেভাবেই দেখবে। তাই বৃদ্ধাশ্রমের উত্থানকে শুধু আধুনিকতার স্বাভাবিক ফল বলে মেনে নেওয়া নয়- একে আমাদের আত্মসমালোচনার আয়না হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
বৃদ্ধাশ্রমের ঊর্ধ্বমুখী দেয়ালগুলো যেন এক একটি প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের পারিবারিক ইতিহাসের পাতায়- প্রশ্ন করে, কোথায় হারাল সেই চিরকালের বন্ধন, কোথায় মিশে গেল মা-বাবার চোখের তারায় লুকিয়ে থাকা সন্তানের মুখ? নাগরিক জীবনের গতিময়তায় আমরা যখন ব্যস্ততার শিকলে নিজেদের বেঁধেছি, তখন অনিচ্ছাকৃতই হয়তো হারিয়ে ফেলছি সম্পর্কের সেই মায়াজাল, যার টানেই তো ঘর ছিল ঘর।
পরিশেষে বলতে চাই, বৃদ্ধাশ্রমগুলো হয়তো সমাজসেবার নামে প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান, কিন্তু তা যেন কখনোই পারিবারিক ভালোবাসার বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়- এই প্রত্যাশাই বুকে লালন করে, আশার আলো দেখি সেই সব সন্তানের মুখে, যারা যান্ত্রিক সময়ের মধ্যেও মায়ের হাতের রান্নার গন্ধ ভুলতে পারেনি, বাবার পিঠের ওপর নিজের শৈশবকে এখনও অনুভব করে।