ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ইরানে ইসরায়েল-আমেরিকার আগ্রাসন মুসলিম বিশ্বের ঘুম ভাঙবে কি

ড. মো. আনোয়ার হোসেন
ইরানে ইসরায়েল-আমেরিকার আগ্রাসন মুসলিম বিশ্বের ঘুম ভাঙবে কি

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে যে বারুদের গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে, তা শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাতের ইঙ্গিত নয় বরং এটি বিশ্ব ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের এক মহাপ্রলয়। ইসরায়েল ও আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদি আগ্রাসন এবং ইরানের ওপর তাদের ক্রমাগত চাপের মুখে আজ গোটা মুসলিম উম্মাহ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের হৃৎপিণ্ডে রোপিত ‘ক্যান্সার’ সদৃশ ইসরায়েলি অস্তিত্বকে উপড়ে ফেলার এখনই শ্রেষ্ঠ সময়। বছরের পর বছর ধরে ফিলিস্তিন ও লেবাননে যে রক্তের হোলিখেলা চলছে, তার সমাপ্তি টানতে হলে শুধু নিন্দা প্রস্তাব নয়, বরং যুদ্ধের মোকাবিলায় এক সর্বাত্মক যুদ্ধের দামামা বাজানো প্রয়োজন। এই নিবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করব কেন মুসলিম বিশ্বের জন্য এটি শুধু একটি যুদ্ধ নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার এক অন্তিম লড়াই বা ‘ডু অর ডাই’ পরিস্থিতি।

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, মধ্যপ্রাচ্যের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর পশ্চিমা শকুনিদের নজর সবসময়ই ছিল তীক্ষ্ণ। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আজ মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে আমেরিকার কোনো সামরিক ঘাঁটির অস্তিত্ব থাকা শুধু সার্বভৌমত্বের অবমাননা নয়, বরং এটি এই অঞ্চলের অশান্তির মূল উৎস। তেলের ঘ্রাণ বা খনিজ সম্পদের ফ্লেভার যেন কোনোভাবেই ইসরায়েল ও আমেরিকার নাকে পৌঁছাতে না পারে, সেই অর্থনৈতিক অবরোধের দেয়াল আজ তোলা জরুরি। যখন কোনো জাতির সম্পদ লুণ্ঠিত হয় এবং সেই সম্পদ দিয়েই তাদের ওপর বুলেট বর্ষণ করা হয়, তখন সেই জাতির পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়। নজরুলের ভাষায় বলতে হয়, ‘মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত/আমি সেই দিন হব শান্ত/যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না/অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না।’

আজকের এই ক্রান্তিকালে মুসলিম বিশ্বকে বৈজ্ঞানিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক- সব ক্ষেত্রে শক্তির চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে হবে। আধুনিক সমরাস্ত্রের পাশাপাশি সাইবার যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ইসরায়েল ও আমেরিকাকে এক দৃষ্টান্তমূলক জবাব দেওয়া সময়ের দাবি। মুসলিম বিশ্বের প্রযুক্তিবিদ ও বিজ্ঞানীদের আজ একজোট হয়ে এমন এক প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করতে হবে, যা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে পিছু হটতে বাধ্য করবে। যদি আজ আমরা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামরিক সক্ষমতাকে এককেন্দ্রিক করতে না পারি, তবে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে শত্রুবেষ্টনী গড়ে তোলার এখনই উপযুক্ত সময়।

মুসলিম বিশ্বের কবি ও সাহিত্যিকদের কলম আজ তরবারির চেয়েও ধারালো হওয়া প্রয়োজন। বিদ্রোহী কবিতার ছন্দে ছন্দে আজ প্রতিটি মুসলিম তরুণের রক্তে উন্মাদনা জাগিয়ে তুলতে হবে। ফররুখ আহমদের সেই আহ্বান আজ ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া দরকার- ‘পাঞ্জেরি! জাগো পাঞ্জেরি!/ এখনও কি রাত পোহায়নি তোমার?/ তন্দ্রাচ্ছন্ন নয়নে হেরি/ দিগন্তের শেষ সীমানায় রক্তিম আভা।’ সাহিত্য যখন বিপ্লবের ইন্ধন জোগায়, তখন কোনো পরাশক্তিই সেই জনস্রোতকে রুখতে পারে না। সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের মাধ্যমে পশ্চিমা অপসংস্কৃতি ও দাসত্বের মানসিকতাকে ঝেড়ে ফেলে আত্মমর্যাদার এক নতুন মিনার গড়তে হবে।

এই লড়াইয়ে মুসলিম বিশ্বের সামনে দুটি পথ খোলা- হয় আমেরিকাণ্ডইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি দাসত্ব মেনে নেওয়া, নয়তো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে যাওয়া। এটি শুধু ভূখণ্ডের লড়াই নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর আত্মসম্মান ও মর্যাদার লড়াই। যে জাতি মৃত্যুর ভয়কে জয় করতে পারে, তাকে কোনো পারমাণবিক বোমা দিয়ে স্তব্ধ করা সম্ভব নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, কাপুরুষের মতো বেঁচে থাকার চেয়ে বীরের মতো লড়াই করে মরে যাওয়া অনেক বেশি শ্রেয়। যদি আজ আমরা ঐক্যবদ্ধ না হই, তবে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর থাকবে না।

বিশেষ করে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার বর্তমান অস্থিরতা ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত অবিলম্বে বন্ধ করা এখন ফরজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুটি পরমাণু ও সামরিক শক্তিশালী মুসলিম দেশ যদি নিজেদের মধ্যে লড়াইয়ে লিপ্ত থাকে, তবে তা শুধু শত্রুর হাতকেই শক্তিশালী করবে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে তাদের সব মান-অভিমান ভুলে ইরানের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে হবে। এই ত্রিদেশীয় অক্ষশক্তি যদি গঠিত হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র থেকে সাম্রাজ্যবাদের কালো থাবা মুছে ফেলা অসম্ভব কিছু নয়। মুসলিম বিশ্বের সব অস্ত্র ও জনবলকে একীভূত করে এক মহাপ্রতিরোধ গড়ে তোলাই হোক আজকের মূল লক্ষ্য।

ইসরায়েলের আগ্রাসন আজ শুধু ফিলিস্তিনের গণ্ডি ছাড়িয়ে ইরানের দোরগোড়ায়। ইরানকে লক্ষ্যবন্তু বানানোর অর্থ হলো গোটা মুসলিম বিশ্বের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার অপচেষ্টা। এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যদি আজ প্রতিরোধ গড়ে তোলা না হয়, তবে মক্কা-মদিনার পবিত্রভূমিও একদিন হুমকির মুখে পড়তে পারে। উপমা হিসেবে বলা যায়, একটি শরীরের একটি অঙ্গে পচন ধরলে যেমন পুরো শরীর আক্রান্ত হয়, তেমনি ইরানের ওপর আঘাত মানে গোটা উম্মাহর ওপর আঘাত। তাই আজ আর ঘুমিয়ে থাকার সময় নেই, জেগে ওঠার লগ্ন সমাগত।

মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে জয়ী হওয়া আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পশ্চিমা মিডিয়া প্রতিনিয়ত মুসলিমদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিত্রায়িত করে যে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে, তার বিপরীতে আমাদের নিজস্ব বয়ান তৈরি করতে হবে। সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থেকে আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে, আমরা দখলদার নই বরং আমরা নিজ ভূমি ও সম্মান রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যখন একটি জাতি মানসিকভাবে নিজেকে বিজয়ী মনে করে, তখন অর্ধেক যুদ্ধ সেখানেই জয় হয়ে যায়। আরবের মরুভূমি থেকে আনাতোলিয়ার পাহাড় পর্যন্ত আজ সেই বিজয়ের মন্ত্র গুঞ্জরিত হতে হবে। অতীতের ক্রুসেড বা তাতারদের আক্রমণের সময় যেমন মুসলিমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল, আজ সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি প্রয়োজন। সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর সেই অদম্য সাহস আর খালিদ বিন ওয়ালিদের রণকৌশল আজ আমাদের সামরিক অধিনায়কদের হৃদয়ে প্রোথিত করতে হবে। বর্তমান সময়ের আধুনিক প্রযুক্তি আর প্রাচীন বীরত্বের সংমিশ্রণে এক অপরাজেয় শক্তি গড়ে তুলতে হবে। শত্রুর অত্যাধুনিক ড্রোন আর মিসাইল সিস্টেমের বিপরীতে আমাদের থাকতে হবে ঈমানি জজবা এবং কৌশলী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মুসলিম তরুণরা আজ সোশ্যাল মিডিয়া এবং অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে এক বিশাল জনমত গড়ে তুলতে পারে। এই ডিজিটাল বিপ্লবকে ইসরায়েলি ও আমেরিকান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। প্রতিটি টুইট, প্রতিটি পোস্ট যেন হয় এক একটি বুলেটের মতো যা শত্রুর মিথ্যে প্রচারণাকে ধ্বংস করে দেবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্রগুলো বারবার তুলে ধরতে হবে যাতে তারা বিশ্বজুড়ে একঘরে হয়ে পড়ে।

আঞ্চলিক রাজনীতির জটিল হিসাব-নিকাশ সরিয়ে রেখে আজ শুধু ইসলামি ভ্রাতৃত্বের ডোরে আবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। তুরস্ক, কাতার, মালয়েশিয়া এবং সৌদি আরবের মতো প্রভাবশালী দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াতে হবে। শিয়া-সুন্নি বা আঞ্চলিক আধিপত্যের দ্বন্দ্ব এই মুহূর্তে আত্মঘাতী ছাড়া আর কিছুই নয়। শত্রুর সাধারণ শত্রু হওয়ার কারণে আমাদের ঐক্য হতে হবে ইস্পাত কঠিন। ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ নীতি ত্যাগ করে সরাসরি ময়দানে ভূমিকা রাখতে হবে।

ইসরায়েল নামক এই কৃত্রিম রাষ্ট্রটি মূলত পশ্চিমা শক্তির একটি সামরিক চৌকি। একে উপড়ে ফেলার অর্থ হলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে পশ্চিমা প্রভাবের চিরস্থায়ী অবসান। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ইরান যদি তার পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করে এবং বাকি মুসলিম বিশ্ব যদি শুধু রসদ যোগান দেয়, তবেই এই ‘ক্যান্সার’ নিরাময় সম্ভব। ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে হরমুজ প্রণালী বা লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মাধ্যমে শত্রুর বাণিজ্যিক রুট স্তব্ধ করে দেওয়া যেতে পারে। এটি হবে এক বৈজ্ঞানিক ও কৌশলগত বিজয়।

ইকবাল বলেছিলেন, ‘খুদি কো কর বুলান্দ ইতনা কি হার তাকদির সে পেহলে/ খুদা বান্দে সে খুদ পুছে বাতা তেরি রাজা কেয়া হ্যায়।’ অর্থাৎ নিজের সত্তাকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যাও যে ভাগ্য রচনার আগে খোদ স্রষ্টা তোমাকে জিজ্ঞেস করবেন তোমার ইচ্ছা কী। মুসলিম দেশগুলোর উচিত তাদের অর্থনৈতিক শক্তি অর্থাৎ তেল ও গ্যাসকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা। যদি এক মাস পশ্চিমা বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে তাদের অহংকারের প্রাসাদ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। অর্থনৈতিক এই ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ হবে সাম্রাজ্যবাদের কফিনে শেষ পেরেক।

বিদ্রোহী কবি নজরুল গেয়েছিলেন, ‘জাগো অনশন-বন্দি ওঠ রে যত/ জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যাহত।’ আজ সেই ভাগ্যাহত মুসলিম উম্মাহর জেগে ওঠার দিন। এই জাগরণ যেন শুধু সাময়িক আবেগের না হয়, বরং এটি যেন হয় এক সুপরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রামের সূচনা। প্রতিটি মসজিদে, প্রতিটি মাদ্রাসায় এবং প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ প্রতিরোধের পাঠ পড়ানো উচিত। কাপুরুষোচিত আপোষ নয়, বরং বীরোচিত সংঘাতের মাধ্যমেই অর্জিত হবে কাঙ্ক্ষিত মুক্তি।

পরিশেষে বলা যায়, ইরান বনাম আমেরিকাণ্ডইসরায়েল যুদ্ধ শুধু একটি ভূ-রাজনৈতিক লড়াই নয়, এটি সত্য ও মিথ্যের চিরন্তন দ্বন্দ্ব। মুসলিম বিশ্বের ঘুম ভাঙার এটাই শেষ সুযোগ। যদি এইবারও আমরা নির্লিপ্ত থাকি, তবে ইতিহাস আমাদের কাপুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করবে। পাকিস্তান-আফগানিস্তানের ঐক্য আর ইরানের অদম্য জেদ মিলিয়ে তৈরি হোক এক নতুন ভোর। রক্ত যখন ঝরছেই, তখন সেই রক্তে যেন স্বাধীনতার লাল সূর্য উদিত হয়। মুসলিম বিশ্বকে আজ প্রমাণ করতে হবে যে, তারা শুধু সংখ্যার দিক দিয়ে নয়, বরং তারা হৃদয়ের শক্তিতেও বলীয়ান। দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এই মহেন্দ্রক্ষণে আমাদের একটাই স্লোগান হওয়া উচিত- ‘বিজয় অথবা শাহাদাত।’ এই পথই আমাদের নিয়ে যাবে সেই হারানো গৌরবের ঠিকানায়, যেখানে কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ছায়া থাকবে না।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক ও প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত