প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৪ মার্চ, ২০২৬
ইতিহাসের পাতায় কারবালা শুধু একটি যুদ্ধের নাম নয়, বরং এটি অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে এক নিঃসঙ্গ সংগ্রামের চিরন্তন প্রতীক। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যখন ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব ও তাদের সঙ্গীদের ওপর আঘাত আসে, তখন সচেতন হৃদয়ে ফোরাতের তীরের সেই বিষাদময় স্মৃতি নতুন করে জেগে ওঠে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নীলনকশা আর মুসলিম বিশ্বের ভেতরের অনৈক্য আজ সত্যের পথযাত্রীদের সেই একইভাবে একাকী করে দিচ্ছে, যেমনটি হয়েছিল মহররমের সেই তপ্ত মরুপ্রান্তরে।
পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের তথ্যানুযায়ী, মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর পরোক্ষ ইন্ধন ও গোয়েন্দা সহায়তায় আজকের এই বিয়োগান্তক ঘটনা ত্বরান্বিত হয়েছে। শত্রু যখন ঘরের দরজায় কড়া নাড়ে, তখন স্বগোত্রীয়দের নীরবতা বা সহযোগিতা বিষের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে দাঁড়ায়। আয়াতুল্লাহ খামেনি ও তার অনুসারীদের এই শাহাদাত শুধু একজন নেতার প্রস্থান নয়, বরং এটি উম্মাহর হৃদয়ে এক গভীর ক্ষত যা আবারও প্রমাণ করল যে, বিভক্তিই আমাদের পতনের মূল কারণ।
মুসলিম বিশ্বের এক বিশাল অংশ আজ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর শিখণ্ডী হিসেবে কাজ করছে। যখন নিজেদের ভাই আক্রান্ত হয়, তখন ভ্রাতৃত্বের হাত বাড়ানোর বদলে অনেকে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে আততায়ীর হাতকেই শক্তিশালী করছে। এই সরাসরি অংশগ্রহণ বা নির্লিপ্ততা কারবালার সেই কুফাবাসীদের কথা মনে করিয়ে দেয়, যারা ইমামের চিঠি পেয়েও শেষ মুহূর্তে তলোয়ার ঘুরিয়ে নিয়েছিল তারই বিরুদ্ধে।
শত্রুপক্ষ আজ নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে সীমানা ও আদর্শের দেওয়াল টপকে একীভূত হতে পেরেছে, যাকে অনেকেই ‘ইহুদি-খ্রিস্টান ঐক্য’ হিসেবে অভিহিত করেন। তাদের এই সুসংহত অবস্থান আর মুসলিম উম্মাহর শতধা বিভক্ত রূপটিই শক্তির ভারসাম্যকে নষ্ট করে দিচ্ছে। তারা যখন এক টেবিলে বসে রণকৌশল সাজায়, আমরা তখন একে অপরের দোষারোপ আর ক্ষুদ্র স্বার্থের দ্বন্দ্বে লিপ্ত থেকে নিজেদের ধ্বংসের পথ প্রশস্ত করি।
পার্শ্ববর্তী দেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং অস্থিতিশীলতা এই অঞ্চলের নিরাপত্তা বলয়কে ভঙ্গুর করে তুলেছে। একটি দেশের অশান্তি আগুনের স্ফুলিঙ্গের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে, যার সুযোগ নিচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনকারীরা। এই দীর্ঘ লড়াই মুসলিম উম্মাহর মেরুদণ্ডকে এতটাই দুর্বল করে দিয়েছে যে, আজ তারা সম্মিলিতভাবে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হিমশিম খাচ্ছে।
উম্মাহর এক বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে আজ আলস্য ও কর্মবিমুখতা দানা বেঁধেছে, যা আমাদের উদ্ভাবনী শক্তিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। পরিশ্রম ও ত্যাগের চেয়ে যখন আরামপ্রিয়তা বড় হয়ে দেখা দেয়, তখন জাতির ভাগ্য ললাটে পরাজয়ের তিলক এঁকে দেয়। আমরা ভুলে গেছি যে, নড়বড়ে পা নিয়ে কখনও দীর্ঘ লড়াইয়ে টিকে থাকা যায় না, বরং এর জন্য প্রয়োজন কঠিন সংকল্প ও নিরলস প্রচেষ্টা।
আমাদের মেধা আজ নিজ ভূমিতে অবহেলিত, যার ফলে ‘ব্রেইন ড্রেইন’ বা মেধা পাচার এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও চিন্তাবিদরা আজ পশ্চিমা বিশ্বের সমৃদ্ধি বৃদ্ধিতে ব্যস্ত, কারণ স্বদেশে তাদের মূল্যায়ন নেই। এই মেধা যদি উম্মাহর সুরক্ষায় ব্যবহৃত হতো, তবে আমাদের আজ অন্যের তৈরি প্রযুক্তির দিকে চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকতে হতো না।
নাগরিকের মৌলিক অধিকার হরণ ও একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা জনগণের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব আকাশচুম্বী করে তুলেছে। যখন একটি দেশের মানুষ অনুভব করে যে রাষ্ট্র তাদের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার দিচ্ছে না, তখন তারা বহিঃশত্রুর আক্রমণের সময় আর জানপ্রাণ দিয়ে রুখে দাঁড়ায় না। জনবিচ্ছিন্ন শাসকরা তাই সবসময়ই বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
সামরিক প্রযুক্তির অভাব আজ মুসলিম বিশ্বকে এক চরম অসহায়ত্বের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আমরা ড্রোন থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা- সবকিছুর জন্যই সেই শক্তির মুখাপেক্ষী যারা আসলে আমাদের পতন দেখতে চায়। এই প্রযুক্তিগত শূন্যতা আমাদের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে এতটাই দুর্বল করেছে যে, অত্যাধুনিক সাইবার বা আকাশপথের আক্রমণ ঠেকানো আজ আমাদের সাধ্যের বাইরে চলে গেছে।
শিয়া-সুন্নি বিভাজন আজ ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র?্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে, যা সাম্রাজ্যবাদীরা সুকৌশলে উসকে দিচ্ছে। আমরা ভুলে গেছি যে আমাদের মাবুদ এক, রসুল এক এবং কিতাব এক; অথচ ছোটখাটো মাসআলাগত পার্থক্যের জেরে একে অপরের রক্ত ঝরাতে দ্বিধা করছি না। এই বিভাজনই আজ কারবালার মতো ট্র?্যাজেডিকে আধুনিক যুগে পুনরায় মঞ্চস্থ করার সুযোগ করে দিচ্ছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অনগ্রসরতা আমাদের অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে পৃথিবী আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মহাকাশ গবেষণায় মত্ত। জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে মশাল একসময় মুসলিমদের হাতে ছিল, তা হাতছাড়া হওয়ার পর আমরা শুধু ইতিহাসের স্মৃতিচারণ করেই সময় পার করছি। প্রকৃত গবেষণা ও শিক্ষার অভাবে আজ আমাদের প্রযুক্তিগত অনগ্রসরতা বিশ্বমঞ্চে কেবল দর্শক বানিয়ে রেখেছে, নীতিনির্ধারক হতে পারছি না।
গোয়েন্দা দুর্বলতা ও তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষায় ব্যর্থতা আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কাঁচের মতো ভঙ্গুর করে দিয়েছে। আমাদের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তগুলো যখন শত্রু শিবিরে খুব সহজেই পৌঁছে যায়, তখন কোনো রণকৌশলই আর কার্যকর থাকে না। এই তথ্য ফাঁস ও বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই আজ নির্ভুল নিশানায় আমাদের নেতাদের হত্যা করা সম্ভব হচ্ছে, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক। আর্থিক নির্ভরশীলতা আমাদের মেরুদণ্ডকে সোজা হতে দিচ্ছে না, কারণ আমাদের অধিকাংশ দেশের অর্থনীতি আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো পশ্চিমা সংস্থাগুলোর মালের ওপর নির্ভরশীল। যখন পেটে ক্ষুধা থাকে, তখন শিরদাঁড়া উঁচু করে প্রতিবাদ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই অর্থনৈতিক পরাধীনতা আমাদের বাধ্য করছে শোষকদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে এবং নিজেদের ভাইদের বিপদে মুখ ফিরিয়ে নিতে। নেতৃত্বের চরম সংকট আজ উম্মাহকে এক দিশাহারা নৌকায় পরিণত করেছে, যার কোনো দক্ষ মাঝি নেই। যোগ্য ও দূরদর্শী নেতার পরিবর্তে আজ এমন সব লোক মসনদে আসীন, যারা জাতির স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক গদি রক্ষা করতেই বেশি আগ্রহী। এই নেতৃত্বহীনতার সুযোগেই সাম্রাজ্যবাদী শকুনরা আমাদের আকাশে নির্বিঘ্নে ডানা ঝাপটানোর সাহস পায়।
তাঁবেদারি মনোভাব বা দাসত্ব করার মানসিকতা আমাদের বীরত্বের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করছে। আমরা এখন নিজেদের সুরক্ষার জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা না করে হোয়াইট হাউসের আশ্বাসের ওপর নির্ভর করি। এই মানসিকতা আমাদের আত্মসম্মানকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে এবং আমাদের শত্রুদের সামনে শুধু এক ‘আজ্ঞাবহ ভৃত্য’ হিসেবে উপস্থাপন করছে।
পার্স্পরিক অবিশ্বাসের বিষবাষ্প আজ এক মুসলিম দেশ থেকে অন্য দেশের সম্পর্ককে বিষিয়ে তুলেছে। প্রতিবেশী দেশগুলো আজ একে অপরকে সাহায্যের পরিবর্তে সন্দেহের চোখে দেখে, যা কোনো বহিঃশক্তিকে বিভাজন তৈরির মোক্ষম সুযোগ করে দেয়। এই অবিশ্বাসের কারণেই আজ সম্মিলিত কোনো সামরিক বা অর্থনৈতিক জোট গঠন করা সম্ভব হচ্ছে না।
অস্ত্রের জন্য পরনির্ভরশীলতা আমাদের প্রতিরক্ষাকে অন্যের দয়ার ওপর ছেড়ে দিয়েছে। যাদের কাছ থেকে আমরা অস্ত্র কিনি, তারাই নির্ধারণ করে দেয় সেই অস্ত্র কার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে আর কার বিরুদ্ধে নয়। এই পরনির্ভরশীলতার কারণেই যুদ্ধের ময়দানে আমাদের শক্তি শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে, বাস্তবে তা অকেজো হয়ে পড়ে।
বিলাসবহুল জীবনধারা ও ভোগবিলাসে মগ্নতা আমাদের শাসকদের জিহাদি চেতনাকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দিয়েছে। যখন প্রাসাদের আরাম আর তেলের টাকার জৌলুস মূখ্য হয়ে ওঠে, তখন ত্যাগের মহিমা আর শাহাদাতের তামান্না হারিয়ে যায়। এই বিলাসিতাই আমাদের শাসকদের ভীতু করে তুলেছে, যারা এখন যুদ্ধের ময়দানের চেয়ে ড্রয়িং রুমের আপস করতেই বেশি পছন্দ করেন।
মিডিয়া যুদ্ধে পরাজয় আজ আমাদের সত্যকে মিথ্যার আবরণে ঢেকে দিচ্ছে। বৈশ্বিক গণমাধ্যমগুলো যেভাবে আমাদের নেতাদের সন্ত্রাসী হিসেবে তুলে ধরছে, আমরা তার বিপরীতে কোনো শক্তিশালী প্রচারমাধ্যম গড়ে তুলতে পারিনি। ফলে আমাদের কান্নাগুলো আজ শুধু নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছায় না কিংবা ভুলভাবে পৌঁছায়।
পরিশেষে, ইরানের এই বেদনাদায়ক পরিস্থিতি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য এক শেষ সতর্কবার্তা। আজ যদি আমরা আমাদের বিভেদ ভুলে, প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী হয়ে এবং আধ্যাত্মিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ঐক্যবদ্ধ না হই, তবে আগামীকালের সূর্য অন্য কোনো মুসলিম দেশের ওপর একই ধ্বংসযজ্ঞের বার্তা নিয়ে আসবে। কারবালার শিক্ষা ছিল অন্যায়ের কাছে মাথানত না করা; আয়াতুল্লাহ খামেনি এটি পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। তাই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে এক নতুন ভোরের প্রত্যাশায় আমাদের পথ চলতে হবে।
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক ও প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল