প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৫ মার্চ, ২০২৬
সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার চিত্রটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং লজ্জাজনক। প্রায় প্রতিদিনই গণমাধ্যমে চোখ রাখলে নারী ধর্ষণ, পারিবারিক নির্যাতন কিংবা শিশুদের ওপর পাশবিক নির্যাতনের ভয়াবহ সব খবর আমাদের সামনে আসে। রাষ্ট্র ও সমাজ হিসেবে আমরা যখন উন্নতির শিখরে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখি, তখন এই ধরনের নৃশংসতা আমাদের সামগ্রিক অগ্রযাত্রাকে কলঙ্কিত করে। নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া-দাক্ষিণ্যের বিষয় নয়, বরং এটি একটি মৌলিক মানবাধিকার। এই ভয়াবহ ব্যাধি থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর আইনের প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি।
আমাদের সংবিধানে নারী ও শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করার স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এছাড়া, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’সহ বেশ কিছু বিশেষ আইনও বিদ্যমান। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, আইনের অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও কেন সহিংসতার গ্রাফ ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী? এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় আইনের দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তের দুর্বলতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি। অপরাধীরা যখন দেখে যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তাদের সুরক্ষা দিচ্ছে, তখন তারা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
কঠোর আইন বলতে শুধু কঠোর দণ্ডাদেশ বোঝায় না। কঠোর আইনের অর্থ হলো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর থেকে চূড়ান্ত রায় কার্যকর হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা নিশ্চিত করা। অনেক সময় দীর্ঘবিচার প্রক্রিয়ার কারণে ভুক্তভোগী পরিবার হতাশ হয়ে পড়ে, সাক্ষী প্রতিকূল হয়ে যায় এবং অপরাধীরা জামিনে বেরিয়ে এসে ভুক্তভোগীকে পুনরায় হুমকি দেয়। এই সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটাতে হলে দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালগুলোর কার্যকারিতা বাড়াতে হবে এবং মামলার তদন্তে আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
তবে নিছক আইন বা শাস্তির ভয় দিয়ে এই সামাজিক অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়। এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা, যার মূলে রয়েছে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। ছোটবেলা থেকেই পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লিঙ্গসমতা এবং অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষা না দিলে শুধু জেল-জরিমানা দিয়ে অপরাধ কমানো কঠিন। আমাদের মনে রাখতে হবে, সমাজ যখন কোনো অপরাধের নীরব দর্শক হয়ে থাকে, তখন অপরাধীদের মনোবল বেড়ে যায়। তাই সহিংসতা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা ও প্রতিরোধের মানসিকতা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
প্রশাসন ও বিচার বিভাগের ওপর জনগণের আস্থা ফেরানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভুক্তভোগীরা যেন থানায় গিয়ে হয়রানির শিকার না হন এবং ন্যায়বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে না ঘোরেন- এই নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকে দিতে হবে। অপরাধী রাজনৈতিক বা আর্থিকভাবে প্রভাবশালী হলেও আইনের চোখে সে যেন সমান- এই বার্তাটি প্রতিটি স্তরে পৌঁছাতে হবে। যখন অপরাধী নিশ্চিত হবে যে, অপরাধ করলে ছাড় পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, তখনই প্রকৃত অর্থে আইনের কঠোর প্রয়োগ সফল হবে।
নারীর কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, যাতায়াতে সুরক্ষা এবং ঘরে ও বাইরে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করতে হবে। কারণ, শৈশবে নির্যাতনের শিকার হওয়া একটি শিশু শুধু ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বরং সে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে বড় হয়, যা ভবিষ্যতে রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা শুধু একটি আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট। কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করাটা প্রথম ধাপ মাত্র। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, শিক্ষার প্রসার এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত প্রতিবাদ। অপরাধীর পরিচয় যাই হোক, তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে তবেই সমাজে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। আমরা এমন এক রাষ্ট্র চাই, যেখানে নারী ও শিশু নির্ভয়ে পথ চলবে এবং তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কাউকে শঙ্কাগ্রস্ত হতে হবে না। এটাই হোক আজকের অঙ্গীকার।