ঢাকা শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬, ২১ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ছেঁড়াফাটা নোটে জনভোগান্তি ও প্রতিকারের পথ

ছেঁড়াফাটা নোটে জনভোগান্তি ও প্রতিকারের পথ

একটি দেশের অর্থনীতির রক্তপ্রবাহ হলো তার মুদ্রাবাজার। এই বাজারে লেনদেনের প্রধান মাধ্যম ব্যাংক নোট বা কাগজের টাকা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে প্রচলিত নোটে জরাজীর্ণতা, ছেঁড়াফাটা এবং অত্যধিক নোংরা অবস্থার আধিক্য সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের নোটগুলোর (১০, ২০, ৫০ ও ১০০ টাকা) অবস্থা এতটাই করুণ যে, তা অনেক সময় লেনদেনের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে। এই সমস্যাটি শুধু ব্যক্তিগত বিরক্তির কারণ নয়, বরং এটি সামগ্রিক অর্থনীতির গতিশীলতা ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বাজারে ছেঁড়াফাটা নোটের এই আধিক্যের পেছনে বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও যান্ত্রিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, এ দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে টাকা সংরক্ষণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অভাব প্রকট। নোট ভাঁজ করা, নোটে লেখালেখি করা, পিন মারা বা পকেটে দুমড়ে-মুচড়ে রাখা আমাদের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ফলে একটি নতুন নোট খুব দ্রুত তার স্থায়িত্ব হারায়। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অনীহা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংক গ্রাহকদের কাছ থেকে জরাজীর্ণ বা ছেঁড়া নোট গ্রহণ করতে চায় না। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের কাউন্টার থেকে টাকা তুললে সেখানেও ছেঁড়া নোট মিশিয়ে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। এতে সাধারণ মানুষ নোট বদলানোর ক্ষেত্রে বিড়ম্বনার শিকার হন।

ছেঁড়াফাটা নোট নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। গণপরিবহনে ভাড়া দেওয়া, কাঁচাবাজারে সদাই কেনা বা দৈনন্দিন ছোটখাটো কেনাকাটায় এই নোটগুলো নিয়ে প্রায়শই বচসা ও হাতাহাতির উপক্রম হয়। রিকশাচালক বা ছোট দোকানিরা যখন একটি ছেঁড়া নোট নিতে অস্বীকার করেন, তখন গ্রাহক তা নিয়ে চরম বিপাকে পড়েন। আবার অনেকে জালিয়াতির শিকার হওয়ার ভয়ে কোনো সামান্য খুঁত থাকলেও সেই নোট নিতে চান না, যা লেনদেনের গতি কমিয়ে দেয়। এই পরিস্থিতি মানুষকে ডিজিটাল লেনদেনে উদ্বুদ্ধ করার কথা থাকলেও, প্রান্তিক মানুষের বড় একটি অংশ এখনও নগদ টাকার ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই নোট বিড়ম্বনা তাদের আর্থিক লেনদেনকে শুধু শ্লথই করছে না, বরং সামাজিক অস্থিরতাও তৈরি করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ক্লিন নোট পলিসি’ অনুযায়ী, বাজারে অচল বা জরাজীর্ণ নোটগুলো নিয়মিত তুলে নিয়ে নতুন নোট সরবরাহ করার কথা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মাঝেমধ্যেই নোট বিনিময়ের বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করে, কিন্তু তার সুফল তৃণমূল পর্যায়ে কতটা পৌঁছাচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ছেঁড়া নোট বা মিউটিলেটেড কারেন্সি বিনিময়ের জটিল প্রক্রিয়া অনেক সময় সাধারণ মানুষকে নিরুৎসাহিত করে। অনেক ক্ষেত্রে দালাল চক্রের হাতে পড়ে মানুষ নোটের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক কম টাকা ফেরত পায়।

এই অসহনীয় ভোগান্তি দূর করতে হলে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে তাদের কাউন্টারে জরাজীর্ণ নোট গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। কোনো ব্যাংক যদি গ্রাহকের বৈধ কিন্তু ছেঁড়া নোট নিতে অস্বীকার করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। সাধারণ মানুষ যেন কোনো ঝামেলা ছাড়াই নিকটস্থ যেকোনো ব্যাংক শাখা থেকে নোট বিনিময় করতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট দিনে ‘নোট বিনিময় মেলা’ বা বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা যেতে পারে।

টাকা যে রাষ্ট্রের সম্পদ এবং এটি যত্ন সহকারে ব্যবহার করা নাগরিক দায়িত্ব- এই বার্তাটি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নোটের স্থায়িত্ব বাড়ানোর বিষয়ে প্রচারণা চালাতে হবে।

নগদ টাকার ওপর চাপ কমাতে ‘ক্যাশলেস’ বা ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও জনপ্রিয় করতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে কিউআর কোড (QR Code) ভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থা ছড়িয়ে দিলে ছেঁড়া নোটের সমস্যা অনেকাংশে কমে আসবে। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে দীর্ঘস্থায়ী পলিমার নোট ব্যবহার করা হয় যা সহজে ছিঁড়ে না বা নোংরা হয় না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্র মানের নোটগুলোতে এই প্রযুক্তির ব্যবহার করা যায় কি না, তা নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।

টাকা কেবল একটি বিনিময়মাধ্যম নয়, এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের পরিচায়কও বটে। পকেটে থাকা একটি ছেঁড়া বা জরাজীর্ণ নোট যখন সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কারণ হয়, তখন তা রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই ফুটিয়ে তোলে। জনভোগান্তি নিরসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও সক্রিয় হতে হবে এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সেবার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। একটি সুশৃঙ্খল মুদ্রাবাজার নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের ছোটখাটো বিড়ম্বনা দূর হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিও লাভবান হবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত