ঢাকা শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ২২ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ধ্বংসাত্মক কৃষি তামাক চাষ

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
ধ্বংসাত্মক কৃষি তামাক চাষ

তামাক চাষ বর্তমান বিশ্বের কৃষিব্যবস্থার জন্য একটি নীরব ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা মাটির উর্বরতা থেকে শুরু করে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করছে। আপাতদৃষ্টিতে তামাককে একটি লাভজনক অর্থকরী ফসল মনে হলেও এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ এবং ধ্বংসাত্মক। তামাক একটি অত্যন্ত পুষ্টিগ্রাসকারী উদ্ভিদ যা মাটি থেকে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়ামের মতো অত্যাবশ্যকীয় উপাদানগুলো অতিমাত্রায় শোষণ করে নেয়, ফলে তামাক চাষের পর সেই জমি অন্য কোনো খাদ্যশস্য উৎপাদনের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। কৃষকরা তামাক কোম্পানিগুলোর সাময়িক নগদ অর্থের প্রলোভনে পড়ে ধান বা গমের মতো জীবনদায়ী ফসলের পরিবর্তে বিষাক্ত এই তামাক চাষে ঝুঁকে পড়ছে, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই চাষাবাদ প্রক্রিয়ায় যে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক সার ও উচ্চমাত্রার কীটনাশক ব্যবহার করা হয়, তা শুধু মাটির অণুজীবকেই ধ্বংস করছে না, বরং বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে নিকটস্থ জলাশয় ও নদ-নদীতে মিশে জলজ প্রাণবৈচিত্র্যের অপমৃত্যু ঘটাচ্ছে। বিশ্বের প্রতিবছর প্রায় ৩৫ লাখ হেক্টর জমি তামাক চাষের জন্য ধ্বংস হয়, যা বৈশ্বিক ৫ শতাংশ বনভূমি ধ্বংসের সমান। তামাক চাষের আরেকটি অত্যন্ত অন্ধকার দিক হলো তামাক পাতা শুকানোর প্রক্রিয়া বা কিউরিং, যেখানে জ্বালানি হিসেবে বনের কাঠ পুড়িয়ে প্রতিবছর এক বিশাল অঞ্চলের বনভূমি উজাড় করা হচ্ছে। এই নির্বিচার বৃক্ষনিধনের ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং স্থানীয় জলবায়ুর ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। শুধু পরিবেশ নয়, তামাক চাষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কৃষক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হন। কাঁচা তামাক পাতার সংস্পর্শে আসার ফলে তাদের শরীরে ‘গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস’ নামক বিষক্রিয়া ঘটে, যার লক্ষণ হিসেবে বমি, মাথা ঘোরা এবং দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে অবুঝ শিশুরাও এই প্রক্রিয়ায় শ্রম দিতে গিয়ে অকালেই পঙ্গুত্ব বা মরণব্যাধি ক্যান্সারের শিকার হচ্ছে। বিশ্বের প্রতিবছর প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ তামাক জাতীয় দ্রব্য সেবনের কারণে মৃত্যুবরণ করে। তামাক কোম্পানিগুলো কৃষকদের অগ্রিম ঋণ ও উপকরণের টোপ দিয়ে মূলত এক ধরনের ঋণের জালে আটকে ফেলে, যেখানে হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে প্রকৃত মুনাফা কৃষকের ঘরে না গিয়ে কোম্পানির পকেটে চলে যায়। সুতরাং, তামাক চাষের এই আগ্রাসন রুখতে হলে শুধু আইনের প্রয়োগ নয়, বরং কৃষকদের বিকল্প উচ্চমূল্যের ফসল চাষে উৎসাহিত করা এবং তামাকের ভয়াবহতা সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি। মাটির জীবনীশক্তি রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বিষমুক্ত পৃথিবী নিশ্চিত করতে তামাক চাষের মতো ধ্বংসাত্মক কৃষিকে চিরতরে বিদায় জানানো এখন সময়ের দাবি।

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন

শিক্ষার্থী বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত