প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৮ মার্চ, ২০২৬
বিশ্ব আজ এক গভীর পরিবেশ সংকটের মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ুদূষণ, মাটিদূষণ, পানিদূষণ, বন উজাড়, জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি। এসব সমস্যা মানবসভ্যতার অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে। ইসলাম বহু শতাব্দী পূর্বেই পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং সম্পদের সুষম ব্যবহারের সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছে। কোরআন ও হাদিস শরিফে পরিবেশকে আল্লাহর সৃষ্টি ও মানবজাতির জন্য এক আমানত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিবেশ রক্ষা শুধু সামাজিক বা নাগরিক দায়িত্ব নয়। এটি এক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কর্তব্যও বটে। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন যে, তিনি মানুষকে পৃথিবীতে খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে প্রেরণ করেছেন (সূরা আল-বাকারা ২:৩০)। খলিফা শব্দের অর্থ শুধু ক্ষমতার অধিকারী নয়, বরং দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিভাবকে বোঝায়। অর্থাৎ আমরা প্রকৃতির মালিক নয়, শুধু মাত্র তত্ত্বাবধায়ক। আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও সংরক্ষণে বাধ্য। পরিবেশ ধ্বংস, বন উজাড়, নদীদূষণ বা বায়ুদূষণ শুধু সামাজিক অপরাধ নয়। সরাসরি আল্লাহর আমানতের খেয়ানত। কোরআনে আরও বলা হয়েছে, স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে মানুষের কৃতকর্মের কারণে (সূরা আর-রূম ৩০:৪১)। আধুনিক পরিবেশ বিপর্যয়ের সঙ্গে এই আয়াতের গভীর সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, তিনি আসমানকে সমুন্নত করেছেন এবং স্থাপন করেছেন মিজান, যাতে তোমরা ভারসাম্যে ব্যাঘাত সৃষ্টি না কর (সূরা আর-রহমান ৫৫:৭–৮)। মিজান মানে সুষমতা ও সামঞ্জস্য। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান- বায়ু, আগুন, পানি, মাটি, উদ্ভিদ, প্রাণী। সবকিছু একটি নির্দিষ্ট ভারসাম্যের মধ্যে পরিচালিত হয়।
মানুষ সীমাহীন ভোগবাদ, অতিরিক্ত শিল্পায়ন ও অপচয়ের মাধ্যমে এই ভারসাম্য নষ্ট করায় পরিবেশ বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে ওঠছে। ইসলাম মানুষকে সংযমী হতে এবং প্রাকৃতিক নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে ভারসাম্য রক্ষার শিক্ষা দেয়। কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তোমরা খাও ও পান কর, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না (সূরা আল-আরাফ ৭:৩১)। অন্যত্র বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই (সূরা আল-ইসরা ১৭:২৭)। এই নির্দেশনা শুধু খাদ্য নয়, পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি- সবকিছুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে অত্যন্ত সংযমী জীবনযাপন করতেন। হাদিসে বর্ণিত আছে, তিনি অল্প পানিতেই ওজু করতেন এবং প্রবাহমান নদীর তীরেও অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করতে নিষেধ করতেন। আধুনিক টেকসই উন্নয়নের ধারণার সঙ্গে এই শিক্ষা গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইসলামে বৃক্ষরোপণকে ইবাদতের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কোনো মুসলিম যদি একটি গাছ রোপণ করে, আর তা থেকে মানুষ, পাখি বা প্রাণী উপকৃত হয়, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে (সহিহ বুখারি)। আরও একটি হাদিসে তিনি বলেন, যদি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় তোমাদের হাতে একটি চারা থাকে, তবে তা রোপণ করে দাও।
এই শিক্ষা আমাদের জানায় যে পরিবেশ রক্ষা শুধু ভবিষ্যৎ লাভের জন্য নয়। এটি আমাদের তাৎক্ষণিক নৈতিক দায়িত্ব। ইসলাম প্রাণিকুলের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এক নারীর জাহান্নামের শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন, যে একটি বিড়ালকে না খাইয়ে বেঁধে রেখেছিল। আবার এক ব্যক্তির ক্ষমার কথা বলেছেন, যে তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করিয়েছিল। এই হাদিসগুলো প্রাণীর প্রতি দয়া ও সহমর্মিতার গুরুত্ব তুলে ধরে। অপ্রয়োজনীয় শিকার, বন ধ্বংস বা প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট করা ইসলামের নীতির পরিপন্থী। ইসলামে পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অংশ। রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা সদকা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। হাদিসে স্থির পানিতে অপবিত্রতা সৃষ্টি করতে নিষেধ করা হয়েছে। এসব নির্দেশনা আধুনিক জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশবিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রাকৃতিক সম্পদ সবার জন্য আল্লাহর দান। কোরআনে বলা হয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করেছেন (সূরা আল-বাকারা ২:২৯)। একচেটিয়া ভোগ বা শোষণ ইসলাম সমর্থন করে না। যাকাত, ফিতরা, দান-সদকা ও সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের শিক্ষা পরিবেশগত ন্যায়বিচারের ধারনাকে শক্তিশালী করে। অতিরিক্ত ভোগবাদ ও সম্পদ লুটতরাজ সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি করে এবং পরিবেশের উপর চাপ বাড়ায়। ইসলামের জীবনব্যবস্থা মধ্যপন্থা ও ভারসাম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। ওয়াসাতিয়্যাহ বা মধ্যমপন্থা মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। সংযমী জীবনযাপন, পুনর্ব্যবহার, সাদাসিধে জীবন- এসবই পরিবেশবান্ধব চর্চা। আজকের বিশ্বে যখন পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও চুক্তি হচ্ছে, তখন মুসলমানদের জন্য কোরআন ও হাদিসই সর্বোত্তম দিকনির্দেশনা। পরিবেশ সংরক্ষণ ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু একটি সামাজিক উদ্যোগ নয়। এটি ঈমান, নৈতিকতা ও ইবাদতের অংশ। মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা, সম্পদের সংযত ব্যবহার, বৃক্ষরোপণ, প্রাণীর প্রতি দয়া ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। আজকের পরিবেশ সংকট আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে কোরআনের শিক্ষা অবহেলা করলে তার ফল ভোগ করতে হয়। তাই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র- সব স্তরে ইসলামের পরিবেশবান্ধব শিক্ষা বাস্তবায়ন করা সময়ের দাবি। পৃথিবী আমাদের স্থায়ী আবাস নয়। এটি একটি আমানত, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সুরক্ষিতভাবে হস্তান্তর করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ইসলাম
শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়