ঢাকা রোববার, ০৮ মার্চ ২০২৬, ২৩ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

বইমেলা : অক্ষরের টানে মানুষের মিলন উৎসব

ওসমান গনি
বইমেলা : অক্ষরের টানে মানুষের মিলন উৎসব

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। পিঠা উৎসব, বৈশাখী মেলা কিংবা নবান্ন, সবই আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে এই সব উৎসবের ভিড়ে একটি উৎসব আমাদের কাছে শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং তা আমাদের অস্তিত্বের শিকড়কে স্পর্শ করে। সেই উৎসবটি হলো অমর একুশে বইমেলা। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাস এলেই বাংলা একাডেমি আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মুখরিত হয়ে ওঠে লেখক, পাঠক আর প্রকাশকদের পদচারণায়। এটি শুধু বই কেনা-বেচার কোনো সাধারণ বাজার নয়, বরং এটি আমাদের ভাষা আন্দোলনের অবিনাশী চেতনা আর হাজার বছরের সংস্কৃতির এক জীবন্ত দর্পণ।

এ বছর নানা প্রতিকূলতা আর অনিবার্য সমস্যার কারণে বইমেলা কিছুটা বিলম্বে শুরু হলেও, পাঠকদের অপেক্ষা আর প্রাণের টানে কোনো কমতি ছিল না। বরং দেরিতে শুরু হওয়া মেলাটি যেন আরও বেশি আগ্রহ আর উদ্দীপনা নিয়ে হাজির হয়েছে আমাদের মধ্যে। মেলা প্রাঙ্গণে পা রাখলেই বোঝা যায়, বইয়ের প্রতি মানুষের টান কখনও ফুরিয়ে যাওয়ার নয়। শহরের যান্ত্রিক কোলাহল আর ইট-পাথরের খাঁচায় যখন আমাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত, ঠিক তখনই ক্যালেন্ডারের পাতায় ফাল্গুনের আগাম বার্তা নিয়ে আসে অমর একুশে বইমেলা। এটি শুধু স্টল ভর্তি বইয়ের সমাহার নয়, বরং একুশের রক্তস্নাত ইতিহাস থেকে উঠে আসা বাঙালির এক বার্ষিক পুনর্জন্ম। যেখানে ধুলোবালিমাখা মেলাপ্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে আমাদের সংস্কৃতির পবিত্র তীর্থভূমি।

আমাদের এই প্রিয় বইমেলার ইতিহাস রক্তের অক্ষরে লেখা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় যে তরুণরা রাজপথে বুক পেতে দিয়েছিলেন, তাদের সেই আত্মত্যাগই আজ বইমেলার মূল ভিত্তি। ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়ার ইতিহাস পৃথিবীতে বিরল, আর সেই স্মৃতিকে কেন্দ্র করে মাসব্যাপী বইমেলা আয়োজন করাও এক অনন্য উদাহরণ। ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি চিত্তরঞ্জন সাহা যখন বাংলা একাডেমির সামনে চটের ওপর মাত্র ৩২টি বই সাজিয়ে বসেছিলেন, তখন হয়তো কেউ ভাবেনি এই ক্ষুদ্র প্রয়াসটিই একদিন বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ মেলায় পরিণত হবে। আজ সেই ৩২টি বইয়ের মিছিল হাজার হাজার নতুন বইয়ের জোয়ারে রূপ নিয়েছে।

বইমেলা এখন শুধু একটি মেলা নয়, এটি প্রতিটি বাঙালির মিলনমেলা। এখানে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এক হয় শুধু অক্ষরের টানে, শব্দের টানে। নতুন বইয়ের ঘ্রাণে মাতোয়ারা হয়ে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই খুঁজে নেয় নিজের পছন্দের জগতকে। এই মেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা একটি লড়াকু জাতি, যাদের সংস্কৃতির ভিত্তি অনেক মজুত। বইমেলা আমাদের জাতীয় জীবনে মননশীলতার বাতিঘর হিসেবে কাজ করে। আজকের এই দ্রুতগতির ডিজিটাল যুগে, যখন আমাদের চারপাশটা স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া আর যান্ত্রিকতায় বন্দি, তখন একটি ছাপানো বইয়ের পাতা উল্টানোর আনন্দ যে কতখানি, তা মেলায় না এলে বোঝা যায় না। প্রযুক্তির দাপটে অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে বই হয়তো তার জৌলুস হারাবে এবং মানুষ পড়া ভুলে যাবে। কিন্তু বইমেলার উপচেপড়া ভিড় প্রতিবছর প্রমাণ করে দেয়, কাগজের গন্ধ আর অক্ষরের মায়া কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ই-বুক দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। বইমেলা আমাদের শেখায় কীভাবে ভাবতে হয়, কীভাবে অন্যের মতকে শ্রদ্ধা করতে হয় এবং কীভাবে নিজের সৃজনশীলতাকে বিকশিত করতে হয়।

একটি জাতির উন্নতির মাপকাঠি শুধু তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা বড় বড় দালানকোঠা নয়, বরং তার পাঠাভ্যাস এবং চিন্তার গভীরতাও বটে। বইমেলা সেই গভীরতা তৈরির সবচেয়ে বড় কারিগর। মেলায় আসা প্রতিটি বই একেকটি নতুন চিন্তার দুয়ার খুলে দেয়। বইমেলার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব। মেলা শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, এটি আমাদের প্রকাশনা শিল্পের টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন। লেখক থেকে শুরু করে মুদ্রণ শ্রমিক, প্রচ্ছদ শিল্পী, বাঁধাইকারী এবং বিক্রেতা- হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকা জড়িয়ে থাকে এই একটি মাসকে কেন্দ্র করে। প্রকাশকরা সারা বছর অপেক্ষা করেন এই মেলার জন্য, যেখানে তারা তাদের সৃজনশীল কাজের প্রতিফলন দেখতে পান। আবার পাঠকদের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ, যেখানে তারা একই ছাতার নিচে দেশের সব প্রকাশনীকে খুঁজে পান। বইমেলার এই অর্থনৈতিক চাকা আমাদের সাংস্কৃতিক অর্থনীতিকে সচল রাখে।

মেলা উপলক্ষে যে বিপুল পরিমাণ বই বিক্রি হয়, তা আমাদের সৃজনশীল শিল্পের বিকাশে অপরিহার্য। এবারের মেলা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে উৎসাহ দেখা যাচ্ছে, তা সত্যিই আশাব্যঞ্জক। নানা সমস্যার পাহাড় পেরিয়ে যখন মেলার ফটক খুলেছে, তখন দেখা গেছে সেই চিরচেনা দৃশ্য- হাতে হাত রেখে মেলাপ্রাঙ্গণে হাঁটছে মানুষ। ছোটদের জন্য আলাদা ‘শিশু প্রহর’ মেলাটিকে আরও রঙিন করে তোলে। শিশুদের হাতে যখন তাদের প্রিয় রূপকথা, বিজ্ঞানের গল্প বা ভূতের বইটি ওঠে, তখন তাদের চোখের যে ঝিলিক দেখা যায়, তার চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছুই হতে পারে না। এই মেলাই আমাদের আগামীর প্রজন্মকে তাদের শেকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। তাদের মনে বপন করে দিচ্ছে বই পড়ার বীজ, যা ভবিষ্যতে একটি সমৃদ্ধ, সহনশীল ও শিক্ষিত জাতি গঠনে ভূমিকা রাখবে। আমাদের সন্তানদের যদি আমরা ছোটবেলা থেকেই বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি, তবে তারা বিপথগামী হবে না। বই তাদের সত্য ও সুন্দরের পথ দেখাবে।

বইমেলায় শুধু প্রতিষ্ঠিত লেখকরাই নন, প্রতিবছর শত শত তরুণ লেখকের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই তরুণদের সৃজনশীল চিন্তা আমাদের সাহিত্যের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করছে। মেলা প্রাঙ্গণে বসে যখন কোনো প্রবীণ লেখক তার নবীন পাঠকের সঙ্গে কথা বলেন, কিংবা যখন কোনো দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে আসা পাঠক তার প্রিয় লেখকের অটোগ্রাফ নেন, তখন সেখানে যে প্রাণের মেলা বসে, তা অন্য কোনো উৎসবে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এটিই বইমেলার সার্থকতা- যেখানে লেখক এবং পাঠকের মধ্যে কোনো দূরত্ব থাকে না। তবে উৎসবের আমেজের মধ্যে আমাদের সচেতন থাকতে হবে মানসম্মত সাহিত্যের দিকেও। সংখ্যায় কয়েক হাজার বই প্রকাশিত হওয়ার চেয়ে গুটি কয়েক গুণে সমৃদ্ধ বই হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। ­

ওসমান গনি

সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত