প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৯ মার্চ, ২০২৬
পার্বত্য চট্টগ্রাম খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান স্বাধীন বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে নানা রাজনৈতিক দাবি, আঞ্চলিক বৈষম্যের প্রশ্ন এবং সশস্ত্র আন্দোলনের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে এই অঞ্চল অস্থিরতার মধ্যে ছিল। বিশেষ করে ১৯৭০-৮০ এর দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পেলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন সময়ে সেনাবাহিনী কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সামরিক অভিযান পরিচালনা করে, যার মধ্যে অপারেশন ট্রাইডেন্ট, অপারেশন দাবানল, অপারেশন পাঞ্চিং টাইগার এবং বর্তমানে চলমান অপারেশন উত্তরণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব অভিযান শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ধীরে ধীরে শান্তি, উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পথও সুগম করেছে।
স্বাধীনতা পরবর্তী পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা প্রেক্ষাপট : স্বাধীনতার পর পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি অংশে স্বায়ত্তশাসনের দাবি কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হয়, যা পরবর্তীতে সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়। এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে অপহরণ, চাঁদাবাজি, সংঘর্ষ ও সহিংসতা বাড়তে থাকে। অনেক এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল ও জীবনযাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমও ব্যাহত হতে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং পাহাড়ি জনপদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে বিশেষ অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অপারেশন ট্রাইডেন্ট ও নিরাপত্তা পুনর্গঠনের সূচনা : পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য পরিচালিত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক উদ্যোগগুলোর মধ্যে অপারেশন ট্রাইডেন্ট অন্যতম। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা সীমিত করা এবং তাদের ঘাঁটিগুলো শনাক্ত করা। এই অভিযানের সময় সেনাবাহিনী দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিয়মিত টহল জোরদার করে এবং নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলে। এর ফলে অনেক এলাকায় সশস্ত্র তৎপরতা কমে আসে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ বৃদ্ধি পায়। একইসঙ্গে প্রশাসনিক কার্যক্রম পুনরায় চালু করার জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
অপারেশন দাবানল ও সন্ত্রাস দমনে কঠোর পদক্ষেপ : পরবর্তী সময়ে পাহাড়ি অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পরিচালিত হয় অপারেশন দাবানল। এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল দুর্গম এলাকাগুলোতে সন্ত্রাসী কার্যক্রম দমন করা এবং তাদের সংগঠিত নেটওয়ার্ক দুর্বল করে দেওয়া। এই অভিযানের সময় সেনাবাহিনী বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে ক্যাম্প ও নিরাপত্তা চৌকি স্থাপন করে, যার ফলে পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও রাষ্ট্রের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। এতে করে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে এবং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা অনেকটাই নিশ্চিত হয়।
অপারেশন পাঞ্চিং টাইগার ও সমন্বিত নিরাপত্তা উদ্যোগ : পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক উদ্যোগ ছিল অপারেশন পাঞ্চিং টাইগার। এই অভিযানের সময় সেনাবাহিনী স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে।
এই সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলে অনেক এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে। পাশাপাশি পাহাড়ি অঞ্চলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়।
১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তি ও নতুন বাস্তবতা : দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটাতে ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে সশস্ত্র সংঘাত অনেকাংশে কমে আসে এবং রাজনৈতিক সমাধানের একটি পথ উন্মুক্ত হয়। তবে চুক্তির পরও কিছু বিচ্ছিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ফলে পাহাড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং শান্তি প্রক্রিয়াকে টিকিয়ে রাখতে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ থেকে যায়।
অপারেশন উত্তরণ ও নিরাপত্তা ও উন্নয়নের সমন্বিত মডেল : বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী অপারেশন উত্তরণ পরিচালনা করছে। এটি শুধু একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং নিরাপত্তা ও উন্নয়নকে সমন্বিত করার একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। এই অভিযানের আওতায় সেনাবাহিনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন মানবিক ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সেনাবাহিনী নিয়মিত চিকিৎসাসেবা প্রদান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে ত্রাণ ও সহায়তা বিতরণের মতো কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এসব কার্যক্রমের ফলে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সেনাবাহিনীর পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
সামরিক অভিযানের সামগ্রিক সাফল্য : পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিচালিত এসব সামরিক অভিযানের ফলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। প্রথমত, পাহাড়ি অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
অতীতের তুলনায় সহিংসতা ও সন্ত্রাসী তৎপরতা অনেকটাই কমেছে। দ্বিতীয়ত. দুর্গম এলাকাগুলোতে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হয়েছে, যা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
তৃতীয়ত, পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সহাবস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। চতুর্থত. মানবিক সহায়তা ও সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে সেনাবাহিনী স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
টেকসই শান্তির পথে : পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা বহুমাত্রিক, এখানে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক নানা বাস্তবতা জড়িত। ফলে এই অঞ্চলে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি রাজনৈতিক সংলাপ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক সম্প্রীতির সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে পরিচালিত অপারেশন ট্রাইডেন্ট, অপারেশন দাবানল, অপারেশন পাঞ্চিং টাইগার এবং অপারেশন উত্তরণ পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে, এ কথা অনস্বীকার্য।
প্রকৃতভাবে সব মিলিয়ে বিবেচনা করলে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি স্পর্শ কাতর ও কৌশলগত অঞ্চল, যেখানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। দীর্ঘ সময়ের অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, উন্নয়ন কার্যক্রমকে সহায়তা করা এবং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, উন্নয়ন উদ্যোগ এবং সামাজিক সম্প্রীতির পাশাপাশি সেনাবাহিনীর ইতিবাচক ভূমিকা অব্যাহত থাকলে পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই শান্তি ও উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে, এটাই প্রত্যাশা।
এম মহাসিন মিয়া
সাংবাদিক, লেখক ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক