ঢাকা সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬, ২৪ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

আন্তর্জাতিক নারী দিবস : অর্জন, বৈষম্য ও সমতার নতুন বাস্তবতা

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ইসলাম
আন্তর্জাতিক নারী দিবস : অর্জন, বৈষম্য ও সমতার নতুন বাস্তবতা

অর্জনের গল্প যতই উজ্জ্বল হোক, বাস্তবতা হলো নারী-পুরুষ সমতার পথে বিশ্ব এখনও অসমতার বহু দেয়াল অতিক্রম করার চ্যালেঞ্জে রয়েছে। প্রতিবছর ৮ মার্চ বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এই দিনটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক উদযাপনই নয়। দিনটি নারীর অধিকার, মর্যাদা, চ্যালেঞ্জ এবং সমতার সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতীক। নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি থেকে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, আজও সেই সংগ্রাম বিভিন্ন মাত্রায় চলমান। ফলে আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমাদের সামনে একই সঙ্গে দুটি বাস্তবতা তুলে ধরে। একদিকে নারীর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি, অন্যদিকে বিদ্যমান বৈষম্য ও চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মূল লক্ষ্য কী? সমাজে নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা করা এবং নারীদের প্রতি বিদ্যমান বৈষম্য মূলক দৃষ্টিভঙ্গি দূর করার জন্য সচেতনতা সৃষ্টি করা।

বর্তমান বিশ্বে নারীরা শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নেতৃত্ব ও প্রযুক্তিসহ প্রায় সবক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবুও অনেক ক্ষেত্রে নারীরা এখনও বৈষম্য, সহিংসতা ও সুযোগের অভাবের মুখোমুখি হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সূচনা ঘটে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে শ্রমজীবী নারীদের অধিকার আন্দোলনের মাধ্যমে। বিশ শতকের শুরুতে শিল্পায়নের ফলে বিপুল সংখ্যক নারী শ্রমিক কারখানায় কাজ করতে শুরু করেন। কিন্তু তাদের কর্মঘণ্টা ছিল দীর্ঘ, মজুরি ছিল কম এবং কর্মপরিবেশ ছিল অনিরাপদ। এই পরিস্থিতির প্রতিবাদে শ্রমজীবী নারীরা আন্দোলন শুরু করেন। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় নারী অধিকার প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নারী দিবস শুধুমাত্র শুভেচ্ছা বিনিময়ের দিন নয়। এটি সংগ্রাম, সচেতনতা এবং সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীক। এই দিনে আমরা নারীদের অর্জনকে সম্মান জানাই এবং একই সঙ্গে অসমতা দূর করার জন্য নতুন করে অঙ্গীকার করি। গত কয়েক দশকে বিশ্বব্যাপী নারীদের অবস্থানের উন্নতি ঘটেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে নারীরা আগের তুলনায় অনেক এগিয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশ্বে মেয়েদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের বৈষম্য বিদ্যমান।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী নারী শ্রমিকরা গড়ে পুরুষদের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম মজুরি পান। একই সঙ্গে অনেক দেশে নারীরা এখনও শ্রমবাজারে সমান সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এখনও নারীর অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে গত তিন দশকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি তার অন্যতম উদাহরণ। প্রাথমিক শিক্ষায় বর্তমানে ছেলে ও মেয়ের অংশগ্রহণ প্রায় সমান। মাধ্যমিক শিক্ষায়ও মেয়েদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ, উপবৃত্তি কর্মসূচি এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও নারীদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের মধ্যে অধিকাংশই নারী। এই শিল্প শুধু নারীদের কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করেনি। বরং অনেক নারীর আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্রঋণ, কৃষি কর্মসূচি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, সেবাখাত এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

রাজনীতিতেও বাংলাদেশে নারীর নেতৃত্ব সুস্পষ্ট। জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির ফলে নীতিনির্ধারণে নারীর দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত হচ্ছে, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে সহায়ক। অগ্রগতির পরেও বাংলাদেশের নারীরা এখনও বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি। এর মধ্যে অন্যতম হলো বাল্যবিবাহ, কুসংস্কার, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য। বাংলাদেশ এখনও বিশ্বের উচ্চ বাল্যবিবাহপ্রবণ দেশগুলোর একটি। অনেক পরিবার সামাজিক নিরাপত্তা বা দারিদ্র্যের কারণে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেয়। বিধায় মেয়েদের শিক্ষা বন্ধ হয়ে যায় এবং তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়ে। নারীর প্রতি সহিংসতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা।

পারিবারিক সহিংসতা, যৌন হয়রানি এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা অনেক ক্ষেত্রে নারীর স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও কাজ করার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে। যদিও এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা রয়েছে, তবে অনেক ক্ষেত্রে আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় অনেক মেয়ে এখনও শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর ভূমিকা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কিন্তু শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ এখনও পুরুষদের তুলনায় কম। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কর্মক্ষম নারীদের একটি বড় অংশ এখনও আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের বাইরে রয়েছে। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক দায়িত্ব, সামাজিক বাধা এবং কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুযোগের অভাব। অনেক নারী ঘরের কাজ ও পরিবারের দায়িত্বের কারণে কর্মজীবনে সক্রিয় হতে পারেন না। অথচ এই অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজও অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা প্রায়ই স্বীকৃতি পায় না।

ডিজিটাল প্রযুক্তির বিকাশ নারীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ই-কমার্স, ফ্রিল্যান্সিং, তথ্য প্রযুক্তির শিক্ষা এবং অনলাইন উদ্যোক্তা কার্যক্রমের মাধ্যমে অনেক নারী ঘরে বসেই আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনার প্রবণতা বেড়েছে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নারীদের মধ্যে এখনও বৈষম্য রয়েছে। অনেক নারী ডিজিটাল দক্ষতা বা প্রযুক্তিগত শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ফলে প্রযুক্তি ব্যবহারে লিঙ্গভিত্তিক ব্যবধান কমানোর জন্য বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন। ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের উদ্যোগ নারীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। অনেক নারী ঘরে বসেই অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও নারীদের মত প্রকাশ এবং নেটওয়ার্ক তৈরির সুযোগ দিচ্ছে। নারী-পুরুষ সমতা প্রতিষ্ঠা একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রক্রিয়া। এর জন্য রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নারীদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষা নারীর ক্ষমতায়নের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।

শিক্ষার গুণগত মান ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই কাজের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করা জরুরি। নারীদের জন্য নিরাপদ ও সহায়ক কর্মপরিবেশ তৈরি করতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সহিংসতা প্রতিরোধ করা সম্ভব। নারীদের নেতৃত্ব বিকাশে উৎসাহিত করতে হবে। রাজনীতি, প্রশাসন, ব্যবসা ও প্রযুক্তিসহ সব ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। প্রযুক্তি শিক্ষা ও ডিজিটাল দক্ষতায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে, যাতে তারা নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। নারীর ক্ষমতায়নের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। অনেক ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য সামাজিক ধারণা ও সংস্কার থেকে সৃষ্টি হয়। পরিবারে ছেলে ও মেয়ের মধ্যে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়তে পারবে।

সমাজে নারীর অবদানকে সম্মান করা এবং তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা একটি উন্নত সমাজ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সমতার মূল্যবোধ শেখানো জরুরি। বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নারী ক্ষমতায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নারীদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়লে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র- সবক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। নারীরা শুধু পরিবারের নয়, অর্থনীতি ও সমাজেরও চালিকাশক্তি। তাই নারীর ক্ষমতায়ন মানে পুরো সমাজের অগ্রগতি। আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এখনও চলমান।

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ইসলাম

শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত