ঢাকা মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬, ২৫ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সড়ক-মহাসড়কে ভয়াবহ চাঁদাবাজি

মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
সড়ক-মহাসড়কে ভয়াবহ চাঁদাবাজি

বর্তমানে চাঁদাবাজি মানুষের মুখে মুখে বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ। এই শব্দের ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে সমাজের নগ্নতার প্রতিচ্ছবি। সারাদেশে চাঁদাবাজি নিয়ে এখন কেন এত ব্যাপকভাবে আলোচনা হচ্ছে, তাহলে হাল আমলে কী চাঁদাবাজি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে সারা দেশের সড়ক-মহাসড়কে দেদারছে চলছে চাঁদাবাজি। রাজধানীসহ দেশের প্রতিটি জেলার ৩ হাজার স্পটে ছোট-বড় সবরকম যানবাহন থেকে দৈনিক শত কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। কোনো সমঝোতা নয়, এক প্রকার মালিক- শ্রমিকদের জিম্মি করে চলছে এ চাঁদাবাজি। মালিক-শ্রমিকদের অভিযোগ সরকারদলীয় প্রভাবশালীদের শেল্টারে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অসাধু ব্যক্তিরা প্রতিদিন সড়ক-মহাসড়কে চাঁদাবাজি করছে।

সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি, শ্রমিক সংগঠন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা এ চাঁদা আদায়ের সঙ্গে যুক্ত।

৫ আগস্ট পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর মানুষ ভেবেছিল চাঁদাবাজি চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। ইউনূস সরকার ক্ষমতা গ্রহণের কয়েকদিন পর থেকে পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি অভ্যহত রয়েছে। চাঁদাবাজের হাত বদল হয়ে নতুন দখলবাজরা দিব্যি তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। বহুজায়গায় নতুন পুরাতন যৌথভাবে এ কার্যক্রম সম্পাদন করছে। এতে করে চাঁদার হারও বিগত সময়ের তুলনায় আরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু নাম পরিবর্তন আর রশিদের রঙ বদলিয়ে চলছে কোটি কোটি টাকার চাঁদা বাণিজ্য। দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময় ধরে পরিবহনখাতে বিভিন্ন সমিতির নামে অবাধে ব্যাপকহারে চাঁদাবাজি চলছে। বিশেষ করে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা হতে পণ্যদ্রব্য পরিবহনের সময় চাঁদাবাজি হয় বেশি। অভিনব কৌশলে বিভিন্ন সমিতির নামে টুকেন ব্যবহার করে তুলা হয় বিশাল অঙ্কের চাঁদা। ট্রাক-শ্রমিক কল্যাণ সমিতি, মালিক-শ্রমিক ফেডারেশন, বাস টার্মিনাল, সড়ক-পরিববহন টোল, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের নামে তুলা হয় অতিরিক্ত চাঁদা। কোথাও চাঁদা নেওয়া হচ্ছে টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার নামে, কোথাও পার্কিংয়ের নামে। কোথাও আবার পৌর টোলের সঙ্গে জোরপূর্বক অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে। এর বাইরে সড়কে দায়িত্ব পালন করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য এবং থানা পুলিশের এক শ্রেণির অসাধু সদস্য এসব চক্রের সঙ্গে যুক্ত। বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের নামে শক্তিশালী সিন্ডিকেট বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাস-ট্রাক-টেম্পু-মিনিবাস, ট্যাক্সিসহ বিভিন্ন যানবাহন থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

পরিবহন মালিক সমিতি এবং শ্রমিক ফেডারেশনের নামে যে চাঁদা তুলা হয় তা এতোদিন ধরে কোনো শ্রমিকের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়েছে কি না কারও জানা নেই। শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের কল্যাণের নামে যে চাঁদা আদায় করা হয় বাস্তবে তা হচ্ছে স্রেফ চাঁদাবাজি। এসব চাঁদার ৯০ ভাগ চালক কন্ট্রাকটরদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক নেওয়া হয়। চাহিদা মাফিক চাঁদার টাকা না দিলে গাড়ি ভাঙচুর ছাড়াও মারধর করা হয়। মাঠপর্যায় থেকে বিপুল পরিমাণ চাঁদার টাকা হাত ঘুরে কোথায় যায় এবং কারা এর ভাগ পায় এ বিষয়ে কেউ মুখ খুলতে চান না। পণ্য পরিবহনের চাঁদাবাজিতে জড়িত প্রভাবশালী ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তাদের ছত্রছায়ায় কর্মী বাহিনীর মাধ্যমে প্রতিদিন সড়ক মহাসড়কে এই জঘন্য কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। নিরুপায় হয়ে পরিবহন চালক ও মালিকরা বছরের পর বছর ধরে এসব চাঁদা পরিশোধ করে যাচ্ছেন। এসব চাঁদার টাকা বিভিন্ন প্রভাবশালী ও প্রশাসনের লোকজন ভাগ পেয়ে থাকে। এই চাঁদার উপর ভর করে এক শ্রেণির মালিক-শ্রমিক নেতারা জিরো থেকে হিরো বনে গেছেন। কেউ কেউ এমপি মন্ত্রীও হয়েছেন।

সারাদেশে এ সেক্টরে লাখ লাখ সাধারণ শ্রমিকদের পুঁজি করে রাজনীতির হাত শক্তিশালী করাসহ রাজনীতিকে জিম্মি করেছেন। প্রতিটি রাজনৈতিক সরকার নানা কারণে এ চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। এ সমস্ত কারণে চাঁদাবাজির বিষয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। দেশের পণ্যদ্রব্য ও কাঁচামালের বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলছে সমঝোতার ভিত্তিতে নেওয়া চাঁদা। এর উপর আছে হাট বাজারের খাজনা এবং মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য। সবমিলিয়ে চাঁদাবাজির কারণে দ্রবমূল্যের দাম মারাত্মক হারে বেড়ে যাচ্ছে। চাঁদাবাজির প্রভাবে

ঢাকা-শহরের বাজারে কীভাবে কাঁচামালের দাম বেড়ে যায় তার নমুনা সম্প্রতি দৈনিক যুগান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়। বগুড়ার বাজার থেকে ক্রয়কৃত ৩৫ টাকা দামের বেগুন ঢাকার বাজারে এসে প্রতি কেজি বেগুন ১০০ টাকা হয়ে যায়। বগুড়া থেকে সবজি বোঝাই ট্রাক মাল নিয়ে ঢাকা আসতে জায়গায় জায়গায় চাঁদা, টোল খরচ ও খাজনা প্রদান করতে হয়। পরিবহণে চাঁদাবাজির ফলে পরিবহন ভাড়া বাড়ে। সবজিসহ বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর দাম হয়ে যায় আকাশ ছোঁয়া। পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজির কারণেই মূলত জিনিস পত্রের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে। দিনশেষে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সাধারণ জনগনের কাঁধে এসে পড়ছে। সমঝোতা সিস্টেমের নামে চাঁদাবাজির খেসারত দিতে হয় আমজনতাকে।

এর ফলে সমাজের মধ্যবিত্তের যাপিত জীবন আরও দুঃসহ হয়ে পড়ছে। সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের এই চাঁদাবাজি বন্ধ হয় না। গত ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল দেশ চাঁদাবাজি মুক্ত হবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত