প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১১ মার্চ, ২০২৬
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে খুন, রাজনৈতিক সহিংসতা ও আধিপত্য বিস্তারের যে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠছে, তা জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। কুষ্টিয়া থেকে খুলনা, কিংবা রাজশাহী থেকে গাজীপুর- প্রতিটি জনপদেই তুচ্ছ ঘটনা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক রেষারেষিতে ঝরছে রক্ত। সম্প্রতি ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত তিন সপ্তাহে অর্ধশত প্রাণহানির এই পরিসংখ্যান শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান অবনতিই নয়, বরং সমাজের গভীরে প্রোথিত অসহিষ্ণুতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। রাষ্ট্র ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দাবি করা হলেও, সাধারণ মানুষের মনে দানা বাঁধা আতঙ্ক দূর করতে প্রয়োজন আইনের শাসন ও অপরাধের কঠোর প্রতিকার।
গত কয়েক সপ্তাহের সংবাদপত্রের পাতা উল্টালে কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, রাজশাহী, গাজীপুর কিংবা খুলনার মতো জনপদগুলোতে যে ধরনের অপরাধের চিত্র ফুটে উঠছে, তা জনমনে এক অস্বস্তিকর ভীতির সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় গত রোববার দিনদুপুরে শেখ সাগর নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তোয়াক্কা করছে না। এর আগের দিন গত শনিবার ঝিনাইদহ শহরের একটি ফিলিং স্টেশনে তেল কিনতে গিয়ে পিটুনির শিকার হয়ে এক যুবকের প্রাণহানি ঘটে। তুচ্ছ কারণে মানুষের জীবন নেওয়ার এই যে চরম অসহিষ্ণুতা, তা একটি সুস্থ সমাজের পরিচয় হতে পারে না। রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলায় ইমাম নিয়োগের মতো একটি পবিত্র ও ধর্মীয় বিষয়কে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং একজনের মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক। যখন ধর্মীয় ও সামাজিক ইস্যুগুলো রাজনৈতিক রেষারেষির হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন সমাজে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়া স্বাভাবিক।
গাজীপুরে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুপক্ষের গোলাগুলি ও হাতবোমা বিস্ফোরণের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই জনজীবনকে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। মালামাল লুট আর মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়ার এই চিত্রগুলো আমাদের এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন সপ্তাহে সারা দেশে প্রায় অর্ধশত ব্যক্তি হত্যার শিকার হওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এর নেপথ্যে রয়েছে দলীয় কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং তুচ্ছ কারণে গণপিটুনির মতো ভয়াবহ চর্চা। হত্যার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, বিশেষ করে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও জামায়াত সমর্থকদের আধিক্য লক্ষণীয়। এটি রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দেয়। খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় যুবদল নেতা মুরাদ খাকে কুপিয়ে ও পায়ের রগ কেটে হত্যার ঘটনাটি আমাদের সমাজের চরম নিষ্ঠুরতাকে প্রকাশ করে। এই হত্যাকাণ্ডে দলীয় কোন্দলের অভিযোগ উঠেছে, যা রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য এক বড় চপেটাঘাত। একইভাবে খুলনায় শেখ সোহেল নামে এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। মাছের ঘের ও ইন্টারনেট ব্যবসার মতো লাভজনক খাতের নিয়ন্ত্রণ নিতে এই ধরনের টার্গেট কিলিং জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। চট্টগ্রামে তিন সপ্তাহে ১০ জনের মৃত্যু হওয়াও কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতে পারে না; এটি একটি কাঠামোগত আইনশৃঙ্খলা সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ইদ্রিস খান নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ডিজিটাল যুগের অসহিষ্ণুতাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আজ যেমন মানুষকে যুক্ত করছে, তেমনই তুচ্ছ কারণে মানুষ একে অন্যের রক্তপিপাসু হয়ে উঠছে।
এছাড়া ঝালকাঠির নলছিটিতে পূর্বশত্রুতার জেরে গণপিটুনিতে মৃত্যু কিংবা ঝিনাইদহের পিটুনির ঘটনা প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। মানুষ যখন বিচার প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে অথবা মনে করে যে আইন নিজের হাতে তুলে নিলে পার পাওয়া যাবে, তখনই এই ধরনের বিশৃঙ্খল বিচার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
প্রশাসন থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে পরিস্থিতি স্থিতিশীল এবং প্রতিটি ঘটনায় অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। নরসিংদী কিংবা চট্টগ্রামের ঘটনায় দ্রুত আসামি গ্রেপ্তার হওয়া নিঃসন্দেহে পুলিশের সক্রিয়তার প্রমাণ। পুলিশ সদর দপ্তরের ভাস্যমতে, জানানো হয়েছে যে পরিসংখ্যানগত দিক থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোনো অবনতি হয়নি। তবে পরিসংখ্যানের ঊর্ধ্বে সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা বেশি জরুরি। যখন কুমিল্লার মন্দিরে হাতবোমা নিক্ষেপের মতো ঘটনা ঘটে বা মসজিদের সামনে আতঙ্ক ছড়ানো হয়, তখন তা শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, বরং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও রাষ্ট্রের মজ্জাগত শক্তির ওপর আঘাত হানে।
অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায়, যখনই বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয় কিংবা অপরাধীরা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে পার পাওয়ার সুযোগ পায়, তখনই অপরাধ করার সাহস বেড়ে যায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অপরাধ নিরসনে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেও সংস্কার ও কঠোর শৃঙ্খলা প্রয়োজন। দল থেকে বহিষ্কার করাই একমাত্র সমাধান নয়, বরং অপরাধীকে শুধু অপরাধী হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
প্রতিরোধ বা প্রিভেনশন কেন সফল হচ্ছে না, সেটি এখন বড় প্রশ্ন। একটি অপরাধ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়া পুলিশের পেশাদারিত্বের অংশ, কিন্তু অপরাধ যেন না ঘটে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের বৃহত্তর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দূরদর্শিতার বিষয়। বিশেষ করে ঝুট ব্যবসা, হাটের ইজারা বা স্থানীয় আধিপত্য নিয়ে যেসব এলাকায় দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে, সেখানে পুলিশের আগাম গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই চিত্র পরিবর্তনের জন্য শুধু পুলিশি তৎপরতা যথেষ্ট নয়; আমাদের সামাজিক কাঠামোর সংস্কারও জরুরি। পাড়া-মহল্লায় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহনশীলতার চর্চা এবং বিচার বিভাগকে আরও গতিশীল করা এখন সময়ের দাবি। খুনের বদলে খুন নয়, বরং অপরাধীর জন্য উপযুক্ত শাস্তি ও ভুক্তভোগীর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক।
নাগরিক হিসেবে আমরা এমন এক দেশ চাই যেখানে রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে, কিন্তু তার সমাধান রাজপথে রক্ত ঝরিয়ে নয়, বরং আইনি ও গণতান্ত্রিক পন্থায় হবে। খুনাখুনির এই ধারা বন্ধ করতে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজকে সম্মিলিতভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে। আইনের শাসন শুধু কাগজে-কলমে নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রতিফলিত হতে হবে।