ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬, ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

উত্তরবঙ্গের প্রাণধারা করতোয়া আজ সংকটে

মো. শাহিন আলম, কলাম লেখক ও গবেষক, সাবেক শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
উত্তরবঙ্গের প্রাণধারা করতোয়া আজ সংকটে

এক সময় উত্তরবঙ্গের প্রাণধারা ছিল করতোয়া নদী। যে নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল জনপদ, বাণিজ্য ও সভ্যতা, আজ সেই নদীই নাব্যতা সংকট, দখল ও দূষণের কারণে ধুঁকছে। ধারণা করা হয়, সংস্কৃত শব্দ ‘কর্ত্তন’ বা ‘কৃত্ত্বা’ থেকে ‘করতোয়া’ নামটির উৎপত্তি। নদীর প্রবল স্রোত অনেক সময় তীরবর্তী জনপদ ভেঙে দিত বলেই একে ‘কর্ত্তয়া’ বলা হতো, যা পরে উচ্চারণভেদে করতোয়া হয়ে যায়। আবার লোকবিশ্বাসে বলা হয়, মহাদেব শিবের হাত ধোয়া (কর ধোয়া) পানি থেকেই এই নদীর উৎপত্তি হয়েছে বলে নাম হয়েছে করতোয়া। প্রাচীনকালে এ নদী ‘সদানীরা’ নামেও পরিচিত ছিল। সদা অর্থ সর্বদা এবং নীর অর্থ পানি। অর্থাৎ সারা বছর প্রবহমান থাকত বলে করতোয়ার আরেক নাম সদানীরা।

ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও এ নদীর গুরুত্ব ছিল বিশেষ। মধ্যযুগীয় বহু ইতিহাসগ্রন্থ ও পর্যটকের বিবরণে করতোয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, এই নদীতে স্নান করলে পাপমোচন হয় এবং বাসনা পূর্ণ হয়। মহাভারতের একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, তিন দিন উপবাসের পর করতোয়া নদীতে স্নান করা অশ্বমেধ যজ্ঞের সমতুল্য পুণ্য লাভের সমান। কাশ্মীরের কবি কলহণ তার বিখ্যাত গ্রন্থ রাজতরঙ্গিণী-তেও করতোয়ার প্রশস্তি করেছেন এবং একে পাপহরণকারী পবিত্র নদী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দ্বাদশ শতকে পণ্ডিত পরশুরাম রচনা করেন ‘করতোয়া মাহাত্ম্য’, যা করতোয়াকে কেন্দ্র করে রচিত প্রাচীন পুঁথিকাব্যের অন্যতম নিদর্শন।

প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে করতোয়া নদী বিশেষ গুরুত্ব বহন করেছে। পাল ও সেন যুগে এই নদী ছিল উত্তর বাংলার প্রধান নৌপথ এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। এই নদীপথ ব্যবহার করেই কৃষিপণ্য, মৃৎশিল্প, তাঁতশিল্প এবং অন্যান্য পণ্য এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পরিবহন করা হতো। করতোয়ার তীরবর্তী জনপদগুলোতে কৃষি, বাণিজ্য ও বিভিন্ন কারুশিল্পের ব্যাপক প্রসারও ঘটেছিল। বিশেষ করে মহাস্থানগড়ের মতো ঐতিহাসিক নগরীর বিকাশে এই নদীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন পু-্রবর্ধন জনপদের রাজধানী মহাস্থানগড়ের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় রাজধানীর সঙ্গে অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম এই নদীর মাধ্যমেই সম্প্রসারিত হয়েছিল।

করতোয়া নদীকে কেন্দ্র করেই একসময় গড়ে উঠেছিল বহু গ্রাম ও জনপদ। এই নদীর তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে কোচ, পমচ, রাজবংশী, পলিয়া, বাগদি-বাউরি, মাহালি, বুনো, হাড়ি প্রভৃতি নানা সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করত। তাদের জীবিকা ছিল কৃষি, মাছ ধরা, পাখি শিকার, বাঁশের ডালি-টুকরি তৈরি, নৌকা নির্মাণসহ নানা ঐতিহ্যবাহী পেশার ওপর নির্ভরশীল। আজও উত্তরবঙ্গের অনেক গ্রামের নাম কোচপাড়া, যুগীটারী, পতলীপাড়া, শীলপাড়া, পাইকপাড়া, কৈবর্তপাড়া কিংবা বৈরাগীর ভিটা এই পেশাভিত্তিক সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক উপস্থিতির সাক্ষ্য বহন করে। সময়ের বিবর্তনে নদীকেন্দ্রিক এই বহু পেশা আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। হারিয়ে যাচ্ছে নৌকা নির্মাণের কারিগর, বাঁশের চাটাই তৈরির শিল্পী, গ্রাম্য বৈদ্য-কবিরাজ, কৈবর্ত জেলে কিংবা ঝিনুক থেকে চুন তৈরি করা যুগী বা নাথ সম্প্রদায়ের মতো বহু পেশাজীবী গোষ্ঠী। অর্থাৎ করতোয়ার সংকটের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কৃতিও বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

ঔপনিবেশিক যুগে এসে করতোয়া নদীর গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। একদিকে নদীর স্বাভাবিক গতিপথে পরিবর্তন ঘটে, অন্যদিকে ইংরেজদের অপরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনা, সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ এবং যত্রতত্র ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণের ফলে বহু নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়। এর প্রভাব পড়ে করতোয়ার ওপরও। তবুও উনবিংশ শতক পর্যন্ত করতোয়া উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবনযাত্রা, কৃষি ও বাণিজ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল।

কিন্তু বর্তমানে করতোয়া নদীর অবস্থা ক্রমেই সংকটজনক হয়ে উঠছে। গত কয়েক দশকে করতোয়ার বহু অংশ ভরাট হয়ে গেছে এবং অনেক স্থানে এটি সরু খালে পরিণত হয়েছে। নদীর নাব্যতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে এবং স্বাভাবিক প্রবাহ পরতে পরতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাছাড়া নদীর তীরবর্তী অনেক জায়গা দখল করে অবৈধভাবে বসতবাড়ি, দোকানপাট ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণেও নদীর গতিপথে পরিবর্তন এসেছে। নদী সংকুচিত হয়ে পড়ায় আশপাশের পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দূষণ। বিভিন্ন শিল্পকারখানা থেকে নির্গত রাসায়নিক বর্জ্য কোনো ধরনের পরিশোধন ছাড়াই নদীতে ফেলা হচ্ছে, যা নদীর বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী কমে যাওয়ায় নদীর ওপর নির্ভরশীল এই অঞ্চলের জেলে সম্প্রদায়ের জীবিকাও হুমকির মুখে পড়ছে।

যদিও বগুড়া শহরের বুক চিরে প্রবাহিত করতোয়া নদীর নাব্যতা ফেরাতে বিভিন্ন সময় খনন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব উদ্যোগ ছিল খণ্ডিত ও অপরিকল্পিত। কোথাও কোথাও খনন করা হলেও তা নদীর সামগ্রিক প্রবাহ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বিত ছিল না। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই আবার পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যায় এবং কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি নদীকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে শুধু খনন করলেই হয় না; বরং উৎসধারা, উপনদী, তীররক্ষা, পলি ব্যবস্থাপনা এবং অববাহিকার সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

বর্তমানে করতোয়া নদীর পানির প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করছে দেওনাই নদী। এই নদী নীলফামারীর ডোমার উপজেলা দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং পরবর্তীতে করতোয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে নদীটির প্রবাহ বজায় রাখতে সহায়তা করে। ফলে করতোয়াকে বাঁচাতে হলে মূলত দেওনাই নদীর প্রবাহ এবং এর উপনদী ও শাখা উপনদীগুলোকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। এই উৎসধারাগুলো শুকিয়ে গেলে বা বাধাগ্রস্ত হলে এই নদীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। করতোয়া নদীর বর্তমান সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো খুলসি এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্মিত রেগুলেটর, যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে ব্যাহত করছে বলে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত