ঢাকা শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

উৎসবের কেনাকাটা ও গণমাধ্যমের অতি উৎসাহ

তানজিদ শুভ্র
উৎসবের কেনাকাটা ও গণমাধ্যমের অতি উৎসাহ

ঈদ মানেই আনন্দ, খুশি আর পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সুন্দর মুহূর্ত কাটানো। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই উৎসব সবার মাঝে ভালোবাসা ও সহমর্মিতার বন্ধন দৃঢ় করে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ঈদের কেনাকাটা নিয়ে গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কিছু কাজ এই পবিত্র আনন্দের মাঝে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করছে।

শপিংমলের সামনে বা রাস্তায় দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের দিকে মাইক্রোফোন এগিয়ে দিয়ে অনেকেই প্রশ্ন করছেন, ‘আপনার এবারের ঈদের বাজেট কত?’ এই প্রশ্নের উত্তরে যাদের সামর্থ্য আছে, তারা হয়তো হাস্যরসে মেতে ওঠেন। নিজেদের বিলাসবহুল কেনাকাটা, ব্র্যান্ডের পোশাক বা দামি গ্যাজেটের গল্প তারা গর্বের সঙ্গেই বলেন। অনেকের কাছে এটি নিছক বিনোদন হলেও, পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা সীমিত আয়ের বা মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য তা রীতিমতো অস্বস্তির।

ক্যামেরার সামনে অনেকেই তখন হাসতে পারেন না, মাথা নিচু করে নীরব থাকেন। কারও চোখে হতাশার ছায়া পড়ে, কেউবা চোখের জল আটকে রাখার বৃথা চেষ্টা করেন। যারা জীবনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছেন, তাদের জন্য ঈদের কেনাকাটা মানেই বহু হিসাব-নিকাশ করে সন্তানদের মুখে একটু হাসি ফোটানোর চেষ্টা। তাদের সামনে অন্যের আকাশছোঁয়া বাজেট তুলে ধরে তুলনামূলক প্রশ্ন করা মানসিক আঘাতের শামিল।

প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, একজন মানুষ কত টাকা খরচ করবেন বা কী কিনবেন, তা জানার কি আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে? এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। আর্থিক সামর্থ্য দিয়ে কারো সামাজিক অবস্থান বা আনন্দ মাপা অনুচিত। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ও নানান অর্থনৈতিক চাপে মধ্যবিত্ত শ্রেণি এমনিতেই দিশেহারা।

সংসারের খরচ সামলে ঈদে নতুন জামা-কাপড় কেনা বা একটু ভালো খাবারের আয়োজন করাটাই অনেকের জন্য বড় সংগ্রাম। এই সংগ্রামের মাঝে বাজেট নিয়ে খোঁচানো তাদের কষ্টকেই যেন আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসে।

বিব্রতকর পরিস্থিতির এখানেই শেষ নয়। কিছু সংবাদকর্মী সরাসরি প্রশ্ন করে বসেন, ‘বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ডের জন্য কী শপিং করলেন?’ কিংবা ‘কী গিফট পেলেন?’। আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে রাস্তায় প্রকাশ্যে কথা বলা এখনও অনেকের জন্যই অস্বস্তিকর। তরুণ তরুণীদের জনসমক্ষে দাঁড় করিয়ে এমন প্রশ্ন করা শুধু অশোভনই নয়, সাংবাদিকতার সাধারণ নৈতিকতার সঙ্গেও বেমানান।

গণমাধ্যমের মূল দায়িত্ব সমাজের চিত্র তুলে ধরা এবং মানুষের আবেগ অনুভূতির প্রতি সম্মান জানানো। শুধু সস্তা জনপ্রিয়তা বা ভিউ পাওয়ার আশায় মানুষের ব্যক্তিগত জীবন বা আর্থিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে কাউকে জনসমক্ষে বিব্রত করা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বরং সমাজের অসংগতি তুলে ধরা এবং মানবিক গল্পগুলো সামনে আনাই প্রকৃত সাংবাদিকতার পরিচয়।

আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, ঈদের আনন্দ সবার জন্য সমান। বেশি টাকা খরচ করলেই আনন্দ বেড়ে যায় না, আর কম খরচে আনন্দ ম্লান হয় না। সামর্থ্য অনুযায়ী প্রিয়জনদের সঙ্গে ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়ার মাঝেই ঈদের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। একজন বাবার কিনে দেওয়া সাধারণ একটি পোশাকেও সন্তানের যে উচ্ছ্বাস থাকে, তা কোনো দামি ব্র্যান্ডের চেয়ে কম নয়।

তাই উৎসবের আনন্দকে সবার জন্য সহজ ও সুন্দর করে তুলতে সংবাদকর্মীদের আরও সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন। এই ঈদে যারা নতুন কাপড় কিনতে পারেননি, তাদের আনন্দও যেন সমানভাবে মূল্যায়িত হয়। বাজেট বা ব্যক্তিগত জীবন নয়, বরং ভালোবাসা আর মানবিকতাই হোক আমাদের উৎসবের প্রধান বার্তা।

তানজিদ শুভ্র

গণমাধ্যমকর্মী, মিরপুর, ঢাকা

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত