ঢাকা বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬, ৪ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

আমরা কবে মানুষ হব

নায়িমা আখতার
আমরা কবে মানুষ হব

প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললে কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রাখলে নানারূপ পৈচাষিকতার চিত্র ভেসে ওঠে। আমরা এমন এক অন্ধকার গহ্বরে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে ঘর থেকে বিদ্যাপীঠ কোথাও নিরাপদ নয় আমাদের নারী ও শিশুরা। আজকের বাংলাদেশে অনেক নারী ঘর থেকে বের হওয়ার আগে মনে মনে এক অদৃশ্য প্রার্থনা করে ‘আমি যেন নিরাপদে ফিরে আসতে পারি।’ এই প্রার্থনা কি একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকের জন্য স্বাভাবিক?

সম্প্রতি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিতে যে বীভৎসতা আমরা দেখলাম, তা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং আমাদের শিক্ষা ও শিষ্টাচারের গালে এক চরম চপেটাঘাত। নিহত ওই শিক্ষিকার চার ছেলেমেয়ে রয়েছে। ছোট মেয়েটার বয়স মাত্র ১ বছর। এই ছোট বাচ্চাগুলো কি কখনও দুঃস্বপ্নেও ভেবেছিল তাদের মা আর তাদের আদর করবে না। এ ছোট বাচ্চাগুলোর বাবা কি দুঃস্বপ্নেও কখনও ভেবেছিল যে তার সহধর্মিনীকে এত নিশংস মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে। তাদের সাজানো সংসার এভাবে শেষ হয়ে যাবে।

মায়ের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে দুই মেয়ে তাইবা ও তাবাসসুম কান্না করছিল। তাবাসসুম তাদের স্বজনদের জড়িয়ে ধরে বারবার বলছিল, ‘আম্মু কই, আম্মু কই। আমি আমার আম্মুর কাছে যাব। আম্মুর মুখ দেখব। আমার আম্মুর কাছে নিয়ে যাও।’ তাবাসসুমের মতো হাজারো নিষ্পাপ শিশুর আর্তনাদে দেশের আকাশ ভারী হয়ে উঠেছে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকা থেকে অষ্টম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর কিশোরীকে হত্যা করে লাশ ফেলে দেওয়া হয়। ঝিনাইদহে চার বছরের শিশুকন্যা তাবাসসুমকে ধর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়ে ৩০ বছরের এক যুবক তাকে হত্যা করে ট্যাংকির মধ্যে ফেলে দেয়। চার বছরের শিশু তাবাসসুমের কী অপরাধ ছিল? কেন একটি ফুলের কড়ি প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই পায়ের নিচে পিষে ফেলা হলো। ছয় বছর বয়সি তাহেদী আক্তার নামে এক শিশুর লাশ ঢাকার হাতিরঝিলের পশ্চিম উলান এলাকার একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে উদ্ধার করা হয়। এছাড়াও পাবনার ঈশ্বরদীতে মধ্যরাতে বাড়িতে ঢুকে দাদিকে হত্যা এবং নাতনিকে অপহরণের পর ধর্ষণ করে হত্যার অভিযোগে চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। নিহত দাদীর লাশ বাড়ির উঠানে পড়েছিল এবং ভিকটিমের লাশ পাওয়া যায় বাড়ির পাশে সরিষা খেতে বিবস্ত্র অবস্থায়। একবার চিন্তা করেছেন কি জঘন্য নৃশংসতা! এটা কি কোন সভ্য সমাজের চিত্র? কোন অন্ধকার যুগে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা। যেখানে বাড়িতেও নারী নিরাপদ নয়।

একেকটি ঘটনার পেছনে আছে একটি ভেঙে পড়া পরিবার, স্তব্ধ হয়ে যাওয়া একটি স্বপ্ন, আর অসংখ্য অশ্রুর অনন্ত স্রোত। নারীদের প্রতি নৃশংসতা, খুন, ধর্ষণ এই শব্দগুলো এখন আর শুধু আইনের পরিভাষা নয়; এগুলো হয়ে উঠেছে আমাদের সময়ের রক্তাক্ত অভিধান। যেন নারী যেখানে যায়, সেখানেই তাকে তাড়া করে এক অদৃশ্য হিংস্রতা। আমরা দাঁড়িয়ে দেখছি নীরব দর্শক হয়ে। এই নীরবতার সংস্কৃতি আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। আমরা প্রতিবাদ করি কিন্তু ক্ষণিকের জন্য। আমরা শোক জানাই কিন্তু দ্রুত ভুলে যাই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকদিন প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, তারপর আবার বিনোদনের ঢেউ সব ঢেকে দেয়। যেন মানুষের জীবনও এখন ‘ট্রেন্ড’-এর মতো? কিছুদিন আলোচনায়, তারপর বিস্মৃত। প্রতিটি ঘটনার পর আমরা শুধু শোক প্রকাশ করি, ক’দিন পর আবার নতুন কোনো নৃশংসতার গল্পে মেতে উঠি। এভাবে আর কতদিন? আমরা কবে সত্যিকারের মানুষ হবো? কবে প্রতিটি নারী নির্ভয়ে নিঃশ্বাস নিতে পারবে? আজ আমাদের সমাজে এক অদ্ভুত অসাড়তা তৈরি হয়েছে।

নায়িমা আখতার

শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত