প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৬ মার্চ, ২০২৬
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু একটি রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস নয়; এটি দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, খাদ্যসংকট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বে হতাশার শেষ ছিল না। সীমিত সম্পদ, দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যা, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং খাদ্য ঘাটতির কারণে অনেকেই মনে করেছিলেন, বাংলাদেশ কখনও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবে না। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশ সেই ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়েছে। খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে আজ বাংলাদেশ খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশের কাতারে পৌঁছেছে।
এই অর্জন কোনো একদিনে আসেনি; এটি কৃষক, কৃষিবিজ্ঞানী, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী এবং সরকারের দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত ও সমন্বিত প্রচেষ্টার ফল। স্বাধীনতার পর দেশে দানাদার খাদ্য উৎপাদন ছিল প্রায় ১ কোটি টন; বর্তমানে তা প্রায় ৫ কোটি টনে পৌঁছেছে। একই সময়ে জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আবাদি জমির পরিমাণ কমেছে। অর্থাৎ কম জমিতে বেশি উৎপাদনের যে চ্যালেঞ্জ, বাংলাদেশ তা সফলভাবে মোকাবিলা করেছে।
বাংলাদেশের কৃষির এই সাফল্যের পেছনে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন, সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, সুষম সার ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রম। এই পাঁচটি উপাদানের সমন্বয়েই মূলত বাংলাদেশের কৃষি বিপ্লব সম্ভব হয়েছে। একসময় যেখানে বছরে একটি বা দুটি ফসল হতো, এখন সেখানে বছরে তিনটি পর্যন্ত ফসল উৎপাদন হচ্ছে। ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি বাংলাদেশের কৃষিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ধান বাংলাদেশের কৃষির মূলভিত্তি। স্বাধীনতার পর ধানের উৎপাদন তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে গম, ভুট্টা, আলু, সবজি, তেলবীজ ও ডাল উৎপাদন কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ এখন সবজি উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। মিঠাপানির মাছ উৎপাদন, আলু উৎপাদন, পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি। ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম। মাংস ও ডিম উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে এবং দুধ উৎপাদনেও স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ এখন শুধু খাদ্য উৎপাদনের দিকে নয়, পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কৃষি এখন আর শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি, শিল্প খাতের কাঁচামাল সরবরাহ এবং দারিদ্র্য বিমোচনে কৃষির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের কৃষির এই অগ্রগতির পেছনে ইতিহাসের কিছু কঠিন শিক্ষা কাজ করেছে। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ এবং ২০০৭-০৮ সালের বৈশ্বিক খাদ্যসংকট বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে বাধ্য করেছে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে। ফলে কৃষিতে ভর্তুকি, প্রণোদনা, সেচ সুবিধা, বিদ্যুৎ, সার ও বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর সরকার গুরুত্ব দেয়।
আশি ও নব্বইয়ের দশকে কৃষি উপকরণের বাজার উদারীকরণ বাংলাদেশের কৃষির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ঘটনা। সেচপাম্প, সার, কীটনাশক ও বীজের বাজার বেসরকারি খাতের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ায় কৃষকরা সহজে এসব উপকরণ সংগ্রহ করতে পারেন। একই সময়ে প্রবাসী আয় এবং তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রবাহিত হতে থাকে, যার বড় অংশ কৃষিতে বিনিয়োগ হয়। ফলে কৃষকরা নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের আর্থিক সক্ষমতা অর্জন করেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশে বোরো ধান, সবজি, মাছ চাষ এবং পোলট্রি শিল্পের ব্যাপক বিস্তার ঘটে।
বাংলাদেশ এখন খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও কৃষির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি হ্রাস, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতা কৃষিকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ছিল বাংলাদেশের কৃষির প্রথম লক্ষ্য। এখন কৃষির পরবর্তী লক্ষ্য হওয়া উচিত কৃষিকে বাণিজ্যিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও রপ্তানিমুখী খাতে পরিণত করা।
বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে পাট ও পাটজাত পণ্য, সুগন্ধি চাল, শাকসবজি, ফলমূল, মসলা, মাছ এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। গত এক দশকে কৃষিপণ্যের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১২ বছর আগে যেখানে কৃষিপণ্যের রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার, সেখানে বর্তমানে তা ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে- যার বড় অংশই প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য। তবে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের তুলনায় কৃষিপণ্যের অবদান এখনো তুলনামূলকভাবে কম। তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিনির্ভরতা কমাতে কৃষিপণ্য রপ্তানির বহুমুখীকরণ অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্ববাজারে বর্তমানে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে ‘রেডি টু ইট’ এবং ‘রেডি টু কুক’ খাদ্যপণ্যের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশের কাঁঠাল, আম, পেয়ারা, আনারস, আলু, সবজি এবং মসলাজাতীয় পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে বহুমুখী খাদ্যপণ্য উৎপাদনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত প্রক্রিয়াজাত শিল্প, গবেষণা ও প্রযুক্তির অভাবে এই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, অ্যাক্রিডিটেড পরীক্ষাগারের অভাব, ফাইটোস্যানিটারি সনদ, দুর্বল প্যাকেজিং এবং হিমায়িত সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। বিশেষ করে ‘ফিট ফর হিউম্যান কনসাম্পশন’ সনদ প্রদানের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একক কর্তৃপক্ষ না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়। তাই আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার এবং একটি একক ‘হেলথ সার্টিফিকেশন অথরিটি’ প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।
কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণ অবকাঠামো উন্নয়ন না করলে কৃষিপণ্য রপ্তানিতে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে না। দেশে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফল ও সবজি সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে নষ্ট হয়ে যায়।
আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, হিমায়িত পরিবহন, প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং রপ্তানি প্যাকেজিং শিল্প গড়ে তুলতে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
কৃষি গবেষণা বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। উচ্চফলনশীল, স্বল্পমেয়াদি, লবণাক্ততা, খরা ও বন্যা সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজিত কৃষিব্যবস্থার একটি সফল মডেল তৈরি করেছে। কিন্তু কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে জনবল সংকট, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা এখনও বড় সমস্যা। অনেক মেধাবী তরুণ কৃষি গবেষণায় আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতের কৃষি উন্নয়নের জন্য একটি বড় হুমকি। কৃষি গবেষণাকে ব্যয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশের কৃষিজমির পরিমাণ সীমিত এবং ভবিষ্যতে তা আরও কমবে। তাই কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য অনুভূমিক সম্প্রসারণের সুযোগ খুব বেশি নেই। এখন উৎপাদন বাড়াতে হবে উল্লম্ব বা ভার্টিক্যাল পদ্ধতিতে অর্থাৎ একই জমিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি, বায়োটেকনোলজি, প্রিসিশন এগ্রিকালচার, হাইড্রোপনিক্স, গ্রিনহাউস চাষ এবং ডিজিটাল কৃষিব্যবস্থার ব্যবহার বাড়াতে হবে।
কৃষিকে লাভজনক খাতে পরিণত করতে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কৃষিপণ্যের মূল্য অস্থিরতা কৃষকদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সরাসরি বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবে। কৃষক সমবায়, চুক্তিভিত্তিক চাষ এবং ডিজিটাল কৃষি বিপণন ব্যবস্থা চালু করা গেলে কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থা আরও উন্নত হবে।
কৃষিতে তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি করাও সময়ের দাবি। বর্তমানে শিক্ষিত তরুণদের অনেকেই কৃষিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপ, প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং কৃষি বিপণন খাতে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে কৃষি খাতে নতুন গতি সৃষ্টি হবে। সহজ শর্তে কৃষিঋণ, প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ এবং স্টার্টআপ সহায়তা প্রদান করতে হবে।
বাংলাদেশ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ করতে যাচ্ছে। এর ফলে রপ্তানি ক্ষেত্রে কিছু আন্তর্জাতিক সুবিধা কমে যেতে পারে। তাই এখন থেকেই কৃষিপণ্যের মান উন্নয়ন, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, প্রক্রিয়াজাতকরণ বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছরে বাংলাদেশের কৃষির অর্জন শুধু একটি খাতের উন্নয়ন নয়; এটি একটি জাতির ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস। খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ছিল প্রথম লক্ষ্য, এখন সময় এসেছে রপ্তানিমুখী, বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে রূপান্তরের। আধুনিক গবেষণা, আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং রপ্তানি অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারলে কৃষি খাতই হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রধান চালিকাশক্তি।
তৈরি পোশাক ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষিপণ্য রপ্তানিকে শক্তিশালী করতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে। তাই কৃষিতে বিনিয়োগ মানে শুধু খাদ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও জাতীয় স্থিতিশীলতায় বিনিয়োগ। বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী অধ্যায় লেখা হতে পারে কৃষিকে কেন্দ্র করেই যদি আমরা সময়োপযোগী পরিকল্পনা, গবেষণা, বিনিয়োগ এবং সঠিক নীতির সমন্বয় করতে পারি।
ড. মো. আল-মামুন
কৃষি গবেষক ও কলামিস্ট