প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৬ মার্চ, ২০২৬
উচ্চশিক্ষার মূল লক্ষ্য শুধু সনদ অর্জন নয়; বরং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ এবং গবেষণার মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেওয়া। গবেষণা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বৃহৎ উচ্চশিক্ষা কাঠামোয় গবেষণা এখনও প্রান্তিক অবস্থানে পড়ে রয়েছে। প্রায় ৩৪ লক্ষের বেশি শিক্ষার্থী এবং দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ উচ্চশিক্ষার্থীকে ধারণ করা এই প্রতিষ্ঠানটিতে গবেষণার সীমাবদ্ধতা তাই শুধু একটি একাডেমিক দুর্বলতা নয়; বরং এটি জাতীয় জ্ঞানভিত্তিক অগ্রগতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
গবেষণার বাস্তবতা বুঝতে গেলে প্রথমেই সামনে আসে বিনিয়োগের প্রশ্ন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ৫০ তম বার্ষিক প্রতিবেদন মতে, ২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় মাত্র ৭৯৫ টাকা ৫৫ পয়সা- যা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। এত বিপুল শিক্ষার্থীসংখ্যার তুলনায় এই ব্যয় অত্যন্ত অপ্রতুল হওয়ায় গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, ল্যাবরেটরি ও রিসোর্স তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে। যেখানে মৌলিক শিক্ষা পরিচালনাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেওয়া বাস্তবতার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়।
এই সীমাবদ্ধতাকে আরও জটিল করে তুলেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি-নির্ভর কাঠামো। অধিভুক্ত কলেজগুলোর বড় অংশই শিক্ষার্থীদের ভর্তি ফি, পরীক্ষা ফি ও অন্যান্য ফি ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবেই টিকে থাকার প্রয়োজনীয় ব্যয়- যেমন বেতন, প্রশাসনিক খরচ ও রক্ষণাবেক্ষণ- মেটাতেই ব্যস্ত থাকে। এই বাস্তবতায় গবেষণা একটি অগ্রাধিকার নয়, বরং অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না।
গবেষণা খাতে বরাদ্দের চিত্র বিশ্লেষণ করলেও একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য সামনে আসে। ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রায় ৫.০২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও ব্যয় হয়েছে মাত্র ৫৮ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দের একটি বড় অংশই অব্যবহৃত থেকে গেছে। পরবর্তী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই বরাদ্দ বেড়ে প্রায় ৬ কোটি ২৭ লক্ষ টাকায় উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭তম সিনেট অধিবেশনের প্রেস ব্রিফিং হতে জানা যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বাজেটেও শিক্ষা সংক্রান্ত আনুষঙ্গিক ব্যয় (গবেষণাসহ) ৪১.৭০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫০.৯০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে এবং গবেষণাবৃত্তির বরাদ্দ দ্বিগুণ হয়ে ১০ কোটি থেকে ২০ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। মোট বাজেটও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বরাদ্দ বৃদ্ধির এই প্রবণতা সত্ত্বেও একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়- এই অর্থ কতটা কার্যকরভাবে গবেষণায় ব্যবহৃত হচ্ছে?
গবেষণার আউটপুট বিশ্লেষণ করলেও একই বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়। ২০২৫ সালে স্কোপাস ডাটাবেস অনুযায়ী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা প্রায় ৭০টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। এটি একটি ইতিবাচক দিক হলেও প্রায় ৩৪ লাখ শিক্ষার্থীর বিপরীতে এই সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। একদিকে বিশাল শিক্ষার্থীসমাজ, অন্যদিকে বছরে মাত্র কয়েক ডজন গবেষণাপত্র- এই বৈপরীত্যই গবেষণা কাঠামোর সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে তুলে।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো এর কেন্দ্রীভূত চরিত্র। প্রকাশিত গবেষণার একটি বড় অংশই মূল ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক, যেখানে অধিভুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের চিত্র তেমন দৃশ্যমান নয়। অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি তার বিস্তৃত কলেজ নেটওয়ার্ক নিয়ে। যদি এই বিপুল অংশ গবেষণার বাইরে থেকে যায়, তবে গবেষণা কার্যক্রম একটি সীমিত গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে। গবেষণা যদি শুধু কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা সংখ্যার বিচারে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলেও বাস্তবতায় একটি ক্ষুদ্র অংশের অর্জন মাত্র।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও গবেষণার বিস্তারে বড় বাধা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের, যাদের কাছে উচ্চশিক্ষার প্রধান লক্ষ্য দ্রুত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। কিন্তু যেখানে স্নাতক শেষ করেও অনেকেই বেকার বা আংশিক বেকার থাকেন, সেখানে গবেষণার মতো দীর্ঘমেয়াদি ও অনিশ্চিত পথে অগ্রসর হওয়া অনেকের কাছেই বিলাসিতা বলে মনে হয়। এর পাশাপাশি গবেষণায় সক্রিয় ও পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষকের ঘাটতি গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে ওঠার পথে বড় বাধা। শিক্ষক নিজে গবেষণায় সম্পৃক্ত না থাকলে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও গবেষণার অনুপ্রেরণা তৈরি হয় না, ফলে গবেষণা তত্ত্বাবধান ও অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ে। তবে গবেষণার গুরুত্ব শুধু একাডেমিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। গবেষণার মাধ্যমে অর্জিত সমালোচনামূলক চিন্তা, সমস্যা বিশ্লেষণ ও তথ্য ব্যাখ্যার দক্ষতা বর্তমান চাকরির বাজারে অত্যন্ত মূল্যবান। গবেষণায় সম্পৃক্ত শিক্ষার্থীরা শুধু কর্মক্ষেত্রে নয়, দেশ-বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও স্কলারশিপ অর্জনের ক্ষেত্রেও এগিয়ে থাকে। গবেষণা তাই বিলাসিতা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার উন্নয়নের একটি কার্যকর বিনিয়োগ।
বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল
শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ