প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০১ এপ্রিল, ২০২৬
ঘরে বসে এক ক্লিকে পছন্দের পণ্য কেনার সুবিধা বাংলাদেশে অনলাইন কেনাকাটাকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। তবে এই সুবিধার আড়ালে লুকিয়ে আছে নানা ঝুঁকি। প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে অনেকে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হচ্ছে এবং মানসিক চাপে পড়ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়ন্ত্রণের অভাব ও সচেতনতার ঘাটতি এই সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে ই-কমার্স খাত দ্রুত বাড়লেও গ্রাহক অভিযোগও বেড়েছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (ডিএনসিআরপি) ২০২৩ সালে ই-কমার্সের বিরুদ্ধে ১২,০০০-এর বেশি অভিযোগ পেয়েছে। এর মধ্যে পণ্য না পাওয়া, নিম্নমানের বা ভুল পণ্য পাওয়া, রিফান্ড না পাওয়া এবং মিথ্যা বিজ্ঞাপনের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা শপিংয়ের মতো বড় প্ল্যাটফর্মের কেলেঙ্কারি হাজার হাজার গ্রাহককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অনেকে অগ্রিম টাকা দিয়েও পণ্য পাননি বা রিফান্ড পাননি।
প্রধান ঝুঁকিগুলো কী?
প্রথমত, প্রতারণামূলক লেনদেন ও ফেক স্টোর। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপে চটকদার অফার দেখে অর্ডার দিলে অনেক সময় পণ্য আসে না বা একেবারে ভিন্ন ও নিম্নমানের জিনিস আসে। দ্বিতীয়ত, ডেটা চুরি ও সাইবার আক্রমণ। অনিরাপদ ওয়েবসাইটে কার্ড বা বিকাশ/নগদের তথ্য দিলে হ্যাকাররা ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে। ফিশিং লিংক, ম্যালওয়্যার ও ডেটা ব্রিচের ঘটনা বাড়ছে। তৃতীয়ত, মিথ্যা বিজ্ঞাপন ও অস্বাভাবিক ডিসকাউন্ট। অসম্ভব কম দামের প্রলোভন দেখিয়ে অগ্রিম টাকা নেওয়া হয়, পরে পণ্য সরবরাহ করা হয় না। চতুর্থত, ডেলিভারি সমস্যা ও রিফান্ডের জটিলতা। পণ্য ঠিক সময়ে না আসা, ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় আসা বা একেবারেই না আসার অভিযোগ নিত্যদিনের। আইনি প্রতিকার পাওয়াও কঠিন।
এছাড়া ফেসবুক-ভিত্তিক ব্যবসা (এফ-কমার্স) প্রায় অনিয়ন্ত্রিত। হাজার হাজার ছোট ব্যবসা নিবন্ধন ছাড়াই চলছে, যা প্রতারণার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। গ্রাহকদের ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবও একটি বড় কারণ। অনেকে সেলারের রেটিং, রিভিউ যাচাই না করে অর্ডার দেন।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব :
অনলাইন প্রতারণা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, পুরো ই-কমার্স খাতের ওপর আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে ডিজিটাল অর্থনীতির বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে নারী ও নতুন অনলাইন শপাররা বেশি ঝুঁকিতে।
করণীয় : গ্রাহকদের উচিত শুধু নিবন্ধিত ও বিশ্বস্ত প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা, সেলারের রেটিং ও রিভিউ যাচাই করা, অগ্রিম পেমেন্টের পরিবর্তে ক্যাশ অন ডেলিভারি বেছে নেওয়া এবং পেমেন্টের সময় সিকিউর সাইট (HTTPS) নিশ্চিত করা। সরকারের দায়িত্ব আরও কঠোর আইন প্রণয়ন, ভোক্তা অধিকার আইন সংশোধন, এফ-কমার্স নিয়ন্ত্রণ এবং সচেতনতা বাড়ানো। নিয়মিত অভিযোগ নিষ্পত্তি ও শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
অনলাইন কেনাকাটা সুবিধাজনক, কিন্তু সতর্কতা ছাড়া এটি ঝুঁকিপূর্ণ। সময় এসেছে গ্রাহক, প্ল্যাটফর্ম ও সরকারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই ‘ডিজিটাল ফাঁদ’ থেকে মুক্তি পাওয়ার। সচেতনতাই সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা।
জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়