প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৩ এপ্রিল, ২০২৬
প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়মে আমাদের এই বদ্বীপ অঞ্চলে আবারও ফিরে আসছে ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম। চৈত্র মাস শেষ হয়ে আসছে এবং কালবৈশাখির সময় শুরু হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে এখন বাতাসের গতিপথ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। এপ্রিল ও মে মাস বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষের জন্য সবসময় এক চরম আতঙ্কের সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের কারণে বঙ্গোপসাগরে এখন ঘন ঘন লঘুচাপ সৃষ্টি হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে এই লঘুচাপগুলো খুব দ্রুত শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার শক্তি সঞ্চয় করে। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। বিভিন্ন সময়ে প্রলয়ংকরী ঝড়গুলো বারবার আমাদের উপকূলকে তছনছ করে দিয়েছে। তাই আসন্ন মৌসুমের দিকে তাকালে একটি বড় প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে চলে আসে। আমাদের উপকূলীয় অঞ্চল কি এবারের দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য সত্যি প্রস্তুত?
সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় রেমালের স্মৃতি এখনও উপকূলের মানুষের মনে দগদগে ক্ষতের মতো রয়ে গেছে। রেমালের আঘাতে শুধু যে ভৌত অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছিল তা নয়। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জগতেও এর গভীর এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছিল। ডুমুরিয়া উপজেলার শরাফপুর ইউনিয়নের একটি সাধারণ পরিবারের কথা ধরা যাক। পরিবারের প্রধান রহিম শেখ এবং তার স্ত্রীর সারা জীবনের সঞ্চয় ছিল একটি মাটির ঘর এবং ছোট একটি মাছের ঘের। রেমালের রাতে যখন নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইতে শুরু করল তখন তাদের চোখে কোনো ঘুম ছিল না। দুর্বল বেড়িবাঁধ ভেঙে যখন প্রবল বেগে নোনা পানি লোকালয়ে প্রবেশ করল তখন মুহূর্তের মধ্যে তাদের মাটির ঘরটি ধসে পড়ে। অন্ধকার রাতে প্রাণ বাঁচাতে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ছুটে যান পাশের একটি উঁচু রাস্তায়। পরের দিন সকালে তারা আবিষ্কার করেন তাদের বেঁচে থাকার আর কোনো সম্বল অবশিষ্ট নেই। খোলা আকাশের নিচে পলিথিন টানিয়ে তাদের শুরু হয় এক নতুন এবং অনিশ্চিত সংগ্রাম। কিন্তু, নিয়মিত জোয়ার-ভাটার খেলা সেটাও স্থায়ী হতে দেয়নি। একসময় তারা অন্যত্র বসবাসের জন্য মানুষের দ্বারস্থ হন। এটি শুধু রহিম শেখের পরিবারের গল্প নয়। এটি উপকূলের হাজারো পরিবারের করুণ বাস্তবতার চিত্র।
উপকূলীয় এলাকার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো আমাদের নড়বড়ে বেড়িবাঁধগুলো। যুগ যুগ ধরে এই বাঁধগুলোই সমুদ্র ও নদীর সঙ্গে মানুষের টিকে থাকার প্রধান ঢাল হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এই বাঁধগুলো এখন আর মোটেই নিরাপদ নয়। সামান্য জলোচ্ছ্বাস হলেই বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্টে ফাটল দেখা দেয় এবং পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। একবার লবণাক্ত পানি জমিতে প্রবেশ করলে সেই জমিতে চাষবাস খুব একটা হয় না। এর ফলে স্থানীয় কৃষিজীবী মানুষ বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করেন। অনেকেই আবার কাজের সন্ধানে শহরে পাড়ি জমাতে বাধ্য হন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট এই অভিবাসন এখন একটি বড় জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। আমাদের নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে যে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ছাড়া উপকূলের মানুষকে রক্ষা করার আর কোনো বিকল্প পথ নেই। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে অনেক সুনাম কুড়িয়েছে। সাইক্লোন শেল্টার বা ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি প্রশংসনীয়। কিন্তু এখনও মাঠ পর্যায়ে অনেক জায়গায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। অনেক আশ্রয়কেন্দ্রের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। সেখানে মানুষের ধারণক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। বিশেষ করে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। দুর্যোগের সময় নারীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থা চরম হুমকির মুখে পড়ে। এছাড়া মানুষ তাদের গৃহপালিত পশু ফেলে সহজে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চায় না।
আল শাহারিয়া
শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, পরিবেশবাদী লেখক, সংগঠক ও কলামিস্ট