ঢাকা শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ২০ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

অনলাইনে পাঠদান : শিখন ঘাটতি রোধে প্রয়োজন সমন্বিত ও কার্যকর কৌশল

অনলাইনে পাঠদান : শিখন ঘাটতি রোধে প্রয়োজন সমন্বিত ও কার্যকর কৌশল

একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ন আমাদের জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটি এসেছে শিক্ষা ব্যবস্থায়। কোভিড-১৯ পরবর্তী বিশ্বে ‘অনলাইন পাঠদান’ এখন আর কোনো সাময়িক বিকল্প নয়, বরং এটি মূলধারার শিক্ষার এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। যথাযথ পরিকল্পনা ও সঠিক প্রয়োগের অভাবে অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের ‘শিখন ঘাটতি’ (Learning Gap) তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। এই ঘাটতি পূরণ করা এবং শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর নমনীয়তা এবং ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে জ্ঞান আহরণের সুযোগ। ঘরে বসেই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের লেকচার শোনা বা ডিজিটাল রিসোর্স ব্যবহার করা এখন হাতের নাগালে। কিন্তু এই সুবিধার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সরাসরি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে যে প্রাণবন্ত মিথস্ক্রিয়া ঘটে, ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে তা অনেক সময়ই অনুপস্থিত থাকে। এছাড়া ইন্টারনেটের ধীরগতি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগের অভাব এবং প্রয়োজনীয় ডিভাইসের দুষ্প্রাপ্যতা শিক্ষার্থীদের পাঠে পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

অনলাইনে পাঠদানের ক্ষেত্রে অনেক শিক্ষার্থীই কেবল ‘শ্রোতা’ হিসেবে উপস্থিত থাকে। সরাসরি তদারকির অভাব থাকায় শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বিচ্যুত হওয়া খুব স্বাভাবিক। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরা প্রথাগত শ্রেণিকক্ষের লেকচার পদ্ধতিটিই হুবহু অনলাইনে প্রয়োগ করেন, যা দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের একঘেয়েমিতে ভোগায়। বিজ্ঞান বা কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যবহারিক ক্লাসের অভাব শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক জ্ঞানকে পরিপূর্ণতা পেতে বাধা দেয়। এই সবকিছুর সমন্বিত ফলাফল হলো- শিক্ষার্থীরা সিলেবাস শেষ করলেও বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতে পারছে না, যা দীর্ঘমেয়াদি শিখন ঘাটতি তৈরি করছে।

শিক্ষার্থীরা যাতে শিখন ঘাটতিতে না পড়ে, সেজন্য শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং শিক্ষাদান পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। নিচে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ আলোচনা করা হলো-

অনলাইন ক্লাস কেবল একতরফা বক্তৃতা হওয়া উচিত নয়। কুইজ, পোল, এবং ব্রেকআউট রুমের মতো ফিচার ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে। শিক্ষক যখন কোনো প্রশ্ন করেন এবং শিক্ষার্থী তাৎক্ষণিক উত্তর দেয়, তখন তাদের মধ্যে শেখার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তুকে শুধু পিডিএফ আকারে না রেখে সেগুলোকে এনিমেশন, ভিডিও এবং গ্রাফিক্সের মাধ্যমে উপস্থাপন করতে হবে। ভিজ্যুয়াল লার্নিং বা দৃশ্যমান শিক্ষা মানুষের মস্তিষ্কে বেশি সময় স্থায়ী হয়। জটিল বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগুলো সিমুলেশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে অনলাইনে প্রদর্শন করা যেতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা ক্লান্তিকর। তাই পাঠদানকে দীর্ঘ না করে ছোট ছোট মডিউলে ভাগ করা উচিত। ২০-৩০ মিনিটের নিবিড় সেশন এবং এরপর ছোট বিরতি বা আলোচনার সুযোগ থাকলে শিখনের মান উন্নত হয়। অনলাইন ক্লাসেও শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ করে মেন্টরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে তাদের জন্য আলাদা ‘রেমিডিয়াল ক্লাস’ বা বিশেষ সহায়তামূলক সেশনের আয়োজন করা জরুরি। নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি যাচাই করতে হবে এবং গঠনমূলক ফিডব্যাক দিতে হবে। সম্পূর্ণ অনলাইননির্ভর না হয়ে অনলাইন ও অফলাইন শিক্ষার একটি সুষম সমন্বয় বা ‘ব্লেন্ডেড লার্নিং’ মডেল অনুসরণ করা সবচেয়ে কার্যকর। তাত্ত্বিক বিষয়গুলো অনলাইনে এবং ব্যবহারিক বা দলগত কাজগুলো সরাসরি শ্রেণিকক্ষে সম্পন্ন করা যেতে পারে।

অনলাইন শিক্ষার সফলতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ডিজিটাল বৈষম্য। শহরের সচ্ছল শিক্ষার্থীরা সব সুবিধা পেলেও গ্রাম বা প্রান্তিক অঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ছে। শিখন ঘাটতি রোধে রাষ্ট্র ও বেসরকারি সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের ইন্টারনেট ডাটা প্যাকেজ নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে সহজ শর্তে ল্যাপটপ বা ট্যাবলেট ক্রয়ের ঋণ প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষা যদি শুধু এক বিশেষ শ্রেণির জন্য সহজলভ্য হয়, তবে সামগ্রিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। অনলাইন শিক্ষার ক্ষেত্রে অভিভাবকরা এখন এক প্রকার ‘সহ-শিক্ষক’ হিসেবে কাজ করছেন। বাড়িতে পড়ার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং সন্তান অনলাইনে পড়াশোনা করছে নাকি অন্য কিছুতে সময় ব্যয় করছে, তা খেয়াল রাখা অভিভাবকদের দায়িত্ব। তবে এটি যেন কোনোভাবেই সন্তানের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি না করে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। অনলাইন পাঠদান বর্তমান যুগের এক অপরিহার্য বাস্তবতা। প্রযুক্তিকে অস্বীকার করার উপায় নেই, বরং একে কীভাবে আমাদের প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যায়, সেটাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি রোধ করতে হলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং নীতিনির্ধারকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। যদি আমরা সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষাদান, আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং ডিজিটাল বৈষম্যদূর করতে পারি, তবেই অনলাইন শিক্ষা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক দক্ষ ও জ্ঞাননির্ভর জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তির লক্ষ্য যেন শুধু সিলেবাস শেষ করা না হয়, বরং তা যেন হয় প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের সোপান।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত