প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৪ এপ্রিল, ২০২৬
মূল্যস্ফীতি হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোনো অর্থনীতিতে সাধারণ পণ্য ও সেবার দামের ক্রমাগত ও সামগ্রিক ঊর্ধ্বগতি। এর ফলে অর্থের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় অর্থাৎ একই পরিমাণ টাকা দিয়ে আগের চেয়ে কম পণ্য বা সেবা কেনা যায়। সহজ কথায়, এটি জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির একটি পরিমাপ। আমাদের সৌখিনতা বেড়েছে, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়েছে ঠিকই; কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সর্বস্তরে সমানভাবে প্রতিফলিত হয়নি। গরিব এবং নিম্নআয়ের মানুষের সংকট আরও গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। সাধারণ গরিব মানুষ আরও গরিব হয়েছে, অন্যদিকে বড় বড় পুঁজিপতি, আমলা ও রাজনীতিবিদরা লাখ লাখ কোটি টাকার মালিক হয়েছে। আমাদের জনগণের টাকা এখন মুষ্টিমেয় শিল্প মালিক, রাজনীতিবিদ ও এলিটদের পকেটে। যুগের পর যুগ তারা সুকৌশলে মানুষের পকেটের টাকা কুক্ষিগত করেছে। গত দুই দশকে দেশ অবকাঠামোতে এগিয়েছে ঠিকই; কিন্তু সাধারণ মানুষের পকেটে টান পড়ছে আরও বেশি। উচ্ছ মূল্যস্ফীতির চাপে নাকাল হয়েছে সাধারণ নিম্নআয়ের মানুষ। সিন্ডিকেট কারসাজিতে জড়িত ব্যবসায়ীরা সরকারের সঙ্গে যোগসাজসে কিছুদিন মুরগির দাম বাড়ায় আবার কিছুদিন আদা-রসুন, পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে জনগণকে সর্বশান্ত করেছে। সিন্ডিকেটের কারসাজিতে দাম দুইগুন বাড়লে চাঁদাবাজি ও অতিরিক্ত কর-শুল্ক আরোপের প্রভাবে জিনিসপত্রের দাম আরও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিসংস্থার (এফএও) হিসাবে সারা বিশ্বে যেখানে খাদ্যের দাম কমছে, যা দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন, আর বাংলাদেশে সেখানে সরকারি হিসাবেই উল্টো চিত্র। বিবিএসের হিসাবে একটি পরিবারে যত অর্থ খরচ হয়, তার ৪৮ শতাংশের মতো খরচ হয় খাবার কিনতে। এই কারণে ধারাবাহিকভাবে খাদ্যসহ সার্বিক মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং সেই মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আয় বৃদ্ধি না হওয়ার কারণে নির্দিষ্ট ও মধ্য আয়ের মানুষগুলো ভীষণ সংকটে আছে। মূল্যস্ফীতি বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দাম মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ঘাড়ে চেপে বসেছে। সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা যে টাকা আয় করে তা দিয়ে তাদের সংসার চলে না। আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ খাওয়া ও ওষুধের পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে। ঢাকা-শহরে বসবাসরত নিম্ন আয়ের মানুষ বাসা বাড়ার যোগান দিতে না পেরে গ্রামে ফিরে এসেছে। অনেক নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা সংসারের হাল ধরতে না পেরে নিজের জমিজমা ও সহায় সম্বল বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছে। গত ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনের পর থেকে জিনিসপত্রের দাম রেকর্ড সংখ্যক হারে বৃদ্ধি পায়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৯ থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধির কথা বলা হলেও বাস্তবে আরও কয়েকগুন বেশি। যার প্রকৃত উদাহারণ হচ্ছে যে সাবান ২০১৪ সালের পূর্বে ২৮ টাকা দিয়ে ক্রয় করা যেত সেই সাবান একলাফে ৫৫ টাকা হয়েছে। বিগত ২০১৪ সালের পূর্বে যে আপেল, কমলা আঙ্গুর ১০০ টাকায় পাওয়া যেত, সেই বিদেশি ফলে অতিরিক্ত কর-শুল্ক আরোপের ফলে দাম বৃদ্ধি পেয়ে ৩০০ টাকা থেকে ৪৫০ টাকা হয়েছে। বিগত সরকার মূল্যস্ফীতির সঠিক পরিসংখ্যান জনগণের সামনে প্রকাশ করেনি।
মূল্যস্ফীতির পেছনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বারবার মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যহ্রাস, অতিরিক্ত কর-শুল্ক বৃদ্ধি, পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেটের কারসাজি, আমদানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজারে পণ্য সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে বাজেট ঘাটতি মেটানো ইত্যাদির বিষয়গুলোর প্রভাবকে অনেকে দায়ী করছেন। ২০২৩ সালের মার্চের ২৮ তারিখ জাতীয় দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, সরকার ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারসাজির প্রকৃত চিত্র। সেদিন ‘কারসাজিতে দাম বৃদ্ধি দাম কমানোর নামে প্রবঞ্চনা; ভোক্তার সঙ্গে ভাঁওতাবাজি’ শিরোনামে উঠে আসে দাম বৃদ্ধি প্রকৃত রহস্য। সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়িরা যুগসাজসে দাম বৃদ্ধির কথা সর্বপ্রথম জনসম্মুখে প্রকাশ করেন বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমদ মজুমদার।
বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের ভেতর অদৃশ্য সিন্ডিকেট রয়েছে এই সিন্ডিকেটের হাত অনেক শক্তিশালী। এরা পণ্যের দাম কারসাজি করে অতিরিক্ত বৃদ্ধি করে এবং পরবর্তীতে সামান্য কমিয়ে ‘দাম কমানোর’ নামে ভোক্তা সাধারণের সঙ্গে প্রতারণা ও ভাঁওতাবাজির আশ্রয় নেয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঈদ ও কোরবানির মতো উৎসবের আগে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। অসাধু সিন্ডিকেট চক্রের সঙ্গে জড়িতরা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়, যা পরে চাপের মুখে সামান্য কমানো হলেও তা পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। বিশ্ববাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়লে দেশেও বাড়িয়ে দেওয়া হয়। অথচ বিশ্ব বাজারে দাম কমলে দেশে কমানো হয় না। সেসময় নানা অজুহাতে বাড়তি দামেই বিক্রি হয়। শুল্কছাড়, এলসি মার্জিন হ্রাসসহ সরকারের কাছ থেকে নানা ধরনের সুবিধা নেওয়ার পরও বাজারে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষ থেকে ভোক্তার জন্য দেওয়া ছাড় ক্রেতার কাছে পৌঁছে না বললেই চলে। সুবিধার বড় অংশই চলে যায় ব্যবসায়ী ও কথিত সিন্ডিকেটের পকেটে। এভাবে প্রায় প্রতিনিয়ত ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণা করে চলেছে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট।
একসময় আমাদের ব্যবসায়ীরা নানা ব্যবসায় পয়সা কামাতেন, বাজারে প্রভাব বিস্তার করতেন, কিন্তু তারা ভোগ্যপণ্য নিয়ে কারসাজি ও কৃত্রিম সংকট তৈরি করতেন না। বিগত দেড় যুগ ধরে বেশ কয়েকটি কর্পোরেট ব্যবসায়ী গ্রুপ এই খাতে প্রভাব বিস্তার করে সুবিধা নিতে পারায় অন্যরাও উৎসাহিত হচ্ছেন। এখন অধিকাংশ কর্পোরেট গ্রুপ নিত্যপণ্যের বাজারে শাখা প্রশাখা বিস্তার করেছেন। বাজারে জিনিষপত্রের দাম কমানোর জন্য অতি শিগ্রই ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারসাজি বন্ধ করতে হবে। বিগত সরকারের সময়ে যে সমস্ত ব্যবসায়িরা সরকারকে ফায়দা দিয়ে চিনি, তেল ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়েছে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। সরকারিভাবে আরোপিত অতিরিক্ত কর-শুল্কের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে এবং পরিবহন সেক্টরে টোল খরচ ও চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে।
মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন
প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট