প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৪ এপ্রিল, ২০২৬
মসনবি শরিফে মওলানা রুমি (রহ.) ‘নায়’-কে রূপক চরিত্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন তার প্রেমদর্শন ব্যাখ্যা করবার জন্যে। বাংলায় ‘নায়’ মানে বাঁশরি, বাঁশি বা মুরলি। বাঁশরি এখানে রুহ বা মানবাত্মার রূপক। এই বাঁশরির সুর করুণ, বেদনা-বিধুর, বিচ্ছেদণ্ডবিরহের কান্নারোল। এই ক্রন্দন-বিলাপ, সৃষ্টির আদি কানন হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে মর্ত্য জগতে আসার কারণে এবং তার কাছে ফিরে যাবার, তার মাঝে বিলীন হবার অস্থির যন্ত্রণায়। সে যন্ত্রণা কিসের?- প্রেমের, বিরহের। মওলানা বলছেন : বাঁশরির কাছ থেকেই শোনো এর ব্যাখ্যা-
বেশ্নো আয্ নায়, চোন হেকায়াত মি কুনাদ
আয্’ জুদা’য়ি হা’ শেকা’য়াত মি কুনাদ
বাঁশরির কাছে শোনো, সে কিসের বর্ণনা দেয়;
বিরহ-ব্যথার করুণ কাহিনির সে অনুযোগ করে।
এই নশ্বর পৃথিবী মানবাত্মার আসল বাসস্থান নয়। তার আসল নিবাস ঊর্ধ্বলোকের আলমে আরওয়াহ বা রুহের জগত। সেখানে সে ছিল মহান স্রষ্টা আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্যে। সেখান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথিবীতে এসেছে, মানব দেহে বাড়ি করেছে। এ যেন বাঁশরিকে বিচ্ছিন্ন করে আনা হয়েছে বাঁশঝাড় হতে। এই অস্থায়ী নিবাসে সে যেন বন্দি। মানবাত্মা এই বন্দিত্ব হতে মুক্ত হয়ে পরমাত্মার সাথে মিলিত হবার আকুতি ও অস্থিরতায় ছটফট করছে অণুক্ষণ। মানব জীবনের যাবতীয় দূঃখ ও অভিযোগ-অনুযোগের মূলেও রয়েছে মানবাত্মার এই অস্থিরতা ও অতৃপ্তি। নিজের উৎসমূলে ফিরে যাওয়ার এই কান্নার অপর নাম প্রেম। সমগ্র সৃষ্টিতে বিরাজিত এই প্রেম-এর রহস্য মওলানা রূমী বর্ণনা করছেন বাঁশী, বাঁশঝাড় ও বাঁশরির সুর-এর রূপকের মাধ্যমে।
কায্ নায়স্তা’ন তা’ মোরা’ বুব্রিদে আন্দ
আয্ নাফিরাম মার্দ ও যান না’লিদে আন্দ
যেদিন থেকে আমাকে বাঁশবন হতে কেটে এনেছে,
আমার আর্ত-কান্নায় নারী-পুরুষ বিলাপ করেছে।
সিনে খাহাম শরহা শরহা আয ফেরা’ক
তা বগুয়াম শারহে দারদে এশতেয়া’ক
বক্ষ চাই এমন, যা বিচ্ছেদে ফেটে হয়েছে ফালি ফালি
যাতে প্রেমের কী বেদনা তার বিবরণ শোনাতে পারি।
হার কাসি কু দুর মা’ন্দ আয্ আস্লে খিশ্
বা’য জুয়াদ রুযেগা’রে ওয়াস্লে খিশ
যে কেউ নিজের উৎস হতে দূরে পড়ে থাকে,
সে চায় তার মিলনের দিনগুলো পুনঃ ফিরে পেতে।
মন বে হার জমঈয়্যাতি না’লা’ন শুদাম
জোফ্তে বদ হা’লা’ন ও খোশ হা’লা’ন শুদাম
আমি প্রত্যেক জনসমষ্টিতে গিয়ে বিলাপ করেছি
যারা অসুখী ও যারা সুখী উভয়ের সঙ্গেই মিশেছি।
বংশিবাদক বাঁশরিতে যে সুর লহরি তোলে মাওলানা রুমি (রহ.) তাকে রূপক হিসেবে নিয়ে তার আধ্যাত্মিক তত্ত্বদর্শন ব্যাখ্যা করেছেন। বাঁশির সুর মওলানার কল্পনায় বাঁশবন হতে কেটে আনার বিরহ কান্না। ‘নায়স্তান’ বা বাঁশবন বলতে রূহের জগত (আলমে আরওয়াহ) বা পরমাত্মাকে বুঝানো হয়েছে। বাঁশরি বিলাপ করে বলছে-
হার কাসি আয যান্নে খোদ শুদ য়া’রে মান
আয দরুনে মান নাজোস্ত আসরা’রে মান
প্রত্যেকেই আপন অনুমান অনুসারে আমার সঙ্গী হয়েছে
আমার ভেতরে সন্ধান করেনি কী রহস্য আছে।
বাঁশির বিরহ-সুর-এর রূপকতার মাধ্যমে মওলানা রুমি বলতে চান, বাঁশিতে যেমন তাঁর আসল আবাস বাঁশঝাড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিরহ সুর সৃষ্টি হয়; যে সুরের মাধ্যমে মূলত সে তার আপন আবাসে ফিরে যাওয়ার আকুতি ব্যক্ত করে আর সেই সুরে যত নারী-পুরুষ উন্মাতাল হয়; তেমনি যে মানবাত্মা ‘আলমে আরওয়াহ’য় আল্লাহর নৈকট্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই পৃথিবীতে মানব দেহের ভেতর ক্ষণস্থায়ী আবাস পেয়েছে, তার ভেতরও পরমাত্মা হতে বিচ্ছিন্ন হবার যাতনা এবং পরমাত্মার সাথে পুনর্মিলনের বাসনাই গুমরে গুমরে উঠছে; বাঁশির সুরের মতো।
সিররে মন আয্ না’লায়ে মান দূর নিস্ত
লেকে চশ্ম্ ও গুশরা’ আ’ন নুর নিস্ত
আমার রহস্য আমার বিলাপ হতে দূরে নেই,
কিন্তু চোখ ও কানের তাকে দেখার আলো নেই।
তান যে জা’ন ও জা’ন যে তান মাসতুর নিস্ত
লে-কে কাসরা’ দিদে জা’ন দাসতুর নিস্ত
প্রাণ হতে দেহ আর দেহ হতে প্রাণ লুকানো নয়
কিন্তু কেউ প্রাণকে দেখবে-নিয়মণ্ডবিধান নেই।
দেহ ও প্রাণ একসঙ্গে থাকে। একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হলে মৃত্যু এসে যায়। কিন্তু এরপরও কেউ প্রাণকে চোখে দেখে না। অনুরূপ বাঁশরির ক্রন্দনের রহস্যও কেউ দেখে না। এই রহস্যের অপর নাম এশ্ক্-প্রেম। প্রেমের ওপরই প্রতিষ্ঠিত জীবন ও জগত।
বাঁশরি এবং তার সুর লহরির কথা আলোচনা হচ্ছে। বাঁশরি বলতে কারও মতে মানব দেহস্থিত রূহ, কারও মতে ইনসানে কামেল (পূর্ণ বিকশিত মানবসত্তা), আর কারও মতে পবিত্র আত্মার অলি-আল্লাহ্। সেই বাঁশরি হতে উত্থিত সুরের মধ্যে লুকিয়ে আছে প্রেমের মহিমা। এই প্রেম সৃষ্টি জগতের সর্বত্র বিরাজমান। এই প্রেমের ছোঁয়া যে পায়নি সে হতভাগা, আর যে প্রেমের তারের সংযোগ পেয়েছে, সে ধন্য। তার জীবন আলোয় উদ্ভাসিত।
আ’তাশ আস্ত ঈন বা’ঙ্গে না’য় ও নিস্ত বা’দ
হারকে ঈন আ’তাশ নাদা’রাদ নিস্ত বা’দ
বাঁশরির এ আওয়াজ আগুন, বাতাস নয়।
যার মধ্যে এ আগুন নাই, সে যেন ধ্বংস হয়।
আ’তাশে এশ্ক্ আস্ত কান্দার নায় ফাতা’দ
জুশেশে এশ্ক্ আস্ত কান্দার মায় ফাতা’দ
প্রেমের আগুনই পতিত হয়েছে বাঁশরির মাঝে
প্রেমের উদ্যম পতিত হয়েছে শরাবের মাঝে।
বাঁশরির যে আওয়ায তা মূলত আগুন, প্রেমের আগুন। যার অন্তরে এই আগুন নাই সে মানুষ নয়, সে ধ্বংস হোক। প্রেমের আগুনই বাঁশরিতে সুরের মুর্ছনা তোলে। শরাবের মত্ততায়ও মিশে আছে প্রেমের স্ফুরণ। অর্থাৎ এই প্রেম সৃষ্টি জগতের সর্বত্র বিরাজিত। এই প্রেমের বন্ধনই স্রষ্টা ও সৃষ্টি তথা মানবাত্মা ও পরমাত্মার মধ্যকার সম্পর্ক-সূত্র। সেই প্রেম-শক্তিতে উজ্জীবিত হয়েই বান্দা স্রষ্টার নৈকট্য সন্ধানে ব্রতি হয়, হিদায়াতের আলোর দিশা পায়।
নায় হারিফে হারকে আয ইয়া’রি বুরিদ
পার্দেহা’য়াশ পর্দেহা’য়ে মা’ দারিদ
বাঁশরি সে লোকের সাথি, যে বন্ধুকে হারিয়েছে
তার তাল-লয় আমার সম্মুখের যত পর্দা দীর্ণ করেছে।
বন্ধুহারা বিরহীর ব্যথার সাথি বাঁশরি। আমিও বন্ধুহারা, পরমাত্মা হতে বিচ্ছিন্ন। বাঁশবন হতে বিচ্ছিন্ন বাঁশরির সুরের মূর্ছনা আমাকে পাগল করেছে বন্ধুর জন্য। সেই প্রেমের প্রতাপে আমার সম্মুখের সব বাধা-পর্দা সরে গেছে। বাঁশরির সুরের মধ্যে আমি খুঁজে পেয়েছি পরম বন্ধুর পরিচয়। কারণ, বাঁশরি অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী।
‘হামচো নায় যাহরি ও তারয়া’কি কে দিদ
হামচো নায় দামসা’য ও মুশতা’কি কে দিদ
বাঁশরির মতো বিষ ও বিষ হরণকারী কে দেখেছে?
বাঁশরির মতো অন্তরঙ্গ বন্ধু ও প্রেমাসক্ত কে পেয়েছে?
বাঁশির সুর যেমন মনকে উতলা করে, তেমনি আবার মনকে শান্তও করে। মানবাত্মাও যেভাবে খোদাকে পাবার আকাঙ্ক্ষায় কান্নাকাটি করে, তেমনি খোদার সান্নিধ্য পেয়ে, তার অপার করুণা অনুভব করে বিস্ময়ে আনন্দে অশ্রুপাত করে। সেই কান্না তৃপ্তির আর অস্থিরতাণ্ডনাশক। কাজেই একই বস্তু বিষ ও বিষনাশক হওয়ার উপমা যথার্থ।
নায় হাদিসে রা’হে পুর খূন মি কুনাদ
কেস্সেহা’য়ে এশ্কে মাজনুন মি কুনাদ
বাঁশরি রক্ত-ঝরা পথের কথাই বলে যায়
মজনুর প্রেমের কাহিনীই সে বলে বেড়ায়।
তবে প্রেম, প্রেমিক, প্রেমাস্পদ ও রক্তঝরা প্রেমপথের রহস্য সবাই বুঝতে সক্ষম নয়। তার জন্য আলাদা যোগ্যতা চাই।
মাহরামে ঈন হুশ জুয বি হুশ নিস্ত
মার যাবা’ন রা’ মুশতারি জুয গুশ নিস্ত
এই হুঁশের তত্ত্বজ্ঞানী বেহুঁশ ছাড়া আর কেউ নয়
মুখের কথার খরিদ্দার কান ছাড়া আর কেউ নয়।
মুখের কথা শোনার ক্ষমতা যেমন একমাত্র কানেরই আছে, তেমনি হুঁশ তথা আধ্যাত্মিক বোধ ও স্বজ্ঞার একমাত্র আমানতদার ও যোগ্য সমঝদার সেই লোকই হতে পারে, যে বস্তুগত ও জাগতিক জ্ঞান-বুদ্ধি হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে সম্বিতহারা বেহুঁশ পড়ে আছে। নজরুলের ভাষায় ‘খোদারই প্রেমের শরাব পিয়ে বেহুঁশ হয়ে রই পড়ে’। নিজের বেহুঁশ, বেহাল প্রেমমত্ত অবস্থার বর্ণনা দিয়ে মাওলানা রুমি বলছেন-
দার গামে মা’ রুযহা’ বিগা’হ্ শুদ
রূযহা’ বা’ সুযহা’ হামরা’হ শুদ
আমার প্রেমের বেদনায় দিনগুলো ফুরিয়ে গেল,
প্রতিটি দিন দুঃখ-বেদনায় একাকার হল।
রুযহা’ গার রাফ্ত্ গো রো বা’ক নিস্ত
তো বেমা’ন এই আঁ’ক চুন তো পা’ক নিস্ত
দিনের পর দিন যদি চলে যায়, বল: যাও, ভয় নাই
তুমিই থাক ওহে! যার মতো পবিত্র আর কেউ নাই।
দুঃখ-দুশ্চিন্তায়, প্রেম-মত্ততায় আমার দিনগুলো ফুরিয়ে গেলেও ভয় নেই। ওহে পাক-পবিত্র প্রেমময় সত্তা! তুমিই আমার সঙ্গে থাক। তোমাকে পেলেই আমার সব চাওয়া, সব পাওয়া পূর্ণ হবে। আমি তোমাকে নিয়েই সন্তুষ্ট। আর কিছু চাই না। যেমন মাছ পানি ছাড়া আর কিছুই চায় না।
দুঃখ-বেদনা আর মনস্তাপে আমার অনেক দিন কেটে গেছে। যদিও আপাত দৃষ্টিতে এই দিনগুলোকে নিস্ফল বলে মনে হয়; কিন্তু এই বেদন-রোদনের ফলেই আমার মূল সম্পদ ‘খোদাপ্রেম’ সজীব রয়েছে। হে প্রেম! তুমি আমার হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে থাক। তোমার মতো পবিত্র প্রেমই আমাকে
হারকে জুয মা’হি যে আ’বশ সির শুদ
হারকে বি রুজিস্ত রুযাশ দির শুদ
মাছ ছাড়া অন্যরাই পানি পানে পরিতৃপ্ত হয়।
যেজন জীবিকাহীন তার সময়ই তো বৃথা নষ্ট হয়।
খোদার সান্নিধ্য পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে; যেটি আমার মঞ্জিলে মকসুদ। আমি তাঁর সান্নিধ্য ছাড়া আর কিছু চাই না।
মাছ ছাড়া অন্য প্রাণী পানি পানে পরিতৃপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু মাছ পানির মধ্যেই থাকতে চায়। তার আরও আরও পানি চাই। যত পানিই সে পাক, কিছুতেই পরিতৃপ্ত হয় না। প্রেমাস্পদের প্রেম সাগরে আমার অবস্থাও মাছের মতই। কাজেই প্রেমমত্ততায় দুঃখ-পেরেশানীতে জীবন অতিবাহিত হলে পরওয়া কিসের? আমি তো আমার কাম্য, আরাধ্য প্রেমাস্পদকে পেয়ে গেছি। তার প্রেমের দরিয়ায় সাঁতার কাটছি। যে এই প্রেমরূপী জীবিকা ও মহাসম্পদ হতে বঞ্চিত। তার দিনকাল, জীবন সময় ও চেষ্টাই তো নষ্ট হয়ে গেছে। তার জীবনই তো বৃথা। তবে এই গুরুত্বের কথা অপরিপক্ক লোকেরা বুঝবে না।
দার নয়া’বাদ হা’লে পোখতে হিচ খা’ম
পাস সুখান কুতা’হ বা’য়াদ ওয়াসসালাম
পরিপক্কদের অবস্থা কোনো কাঁচা লোক বুঝবে না
কাজেই কথা সংক্ষেপ করা চাই-ওয়াসসালাম।
মসনবি শরিফের শুরুর এ ১৮টি বয়েত মওলানা রুমি (রহ.) নিজ হাতে লিখেছেন। বাকি পুরো মসনবি শরিফ তিনি বলে যেতেন আর তার শিষ্য হুসসামউদ্দীন চালাবি অনুলিখন করতেন। মসনবির প্রথম দপ্তর শেষ করার পর স্ত্রী বিয়োগজনিত অশান্তির কারণে হুসসামউদ্দীন চালাবী দীর্ঘ দুই বছর মওলানার খিদমতে উপস্থিত থাকতে পারেন নি। ফলে ওই দুই বছর মসনবি রচনা বন্ধ ছিল। মসনবি দ্বিতীয় খণ্ডের শুরুতে মাওলানা রুমি (রহ.) নিজেই সে কথা ব্যক্ত করেছেন। মসনবি রচনার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বর্ণনা পাওয়া যায় মওলানা আবদুর রহমান জামীর রচনায়। তিনি তার ‘নাফাহাতুল উন্স’ (পৃ. ৪৫৮) কিতাবে এভাবে তার বর্ণনা দিয়েছেন- ‘শেখ সালাহউদ্দীন যখন আল্লাহ্্র রহমতের ছায়ায় আশ্রয় নিলেন (ইন্তিকাল করলেন) তখন মওলানার দয়াদৃষ্টি ও খিলাফত চালাবি হুসসামউদ্দীনের দিকে স্থানান্তরিত হল। মসনবি রচনার কারণ ছিল, চালাবি হুসসামউদ্দীন যখন হাকিম সানায়ির ‘এলাহিনামা’ এবং শেখ ফরিদুদ্দীন আত্তারের ‘মানতেকুত ত্বায়র’ ও ‘মুসিবতনামা’র প্রতি সাথি ও মুরিদানের আগ্রহ ও ঝোঁক লক্ষ্য করলেন তখন মাওলানার খিদমতে দরখাস্ত পেশ করলেন যে, যদি সানায়ির ‘এলাহিনামা’ বা শেখ আত্তারের ‘মানতেকুত ত্বায়র’-এর আদলে একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করা হয়-যাতে বন্ধুদের মধ্যে স্মারকগ্রন্থ হয়ে থাকে, তাহলে বড় অনুগ্রহ ও ইনায়ত হবে। মওলানা তৎক্ষণাৎ নিজের মাথা ও পাগড়ির মধ্য হতে একটি কাগজ বের করে চালাবী হুসসামউদ্দীনের হাতে দিলেন। তাতে মসনবীর প্রথম আঠারটি বয়েত লেখা ছিল।’ (নাফাহাতুল উন্স্, পৃ. ৪৫৮)
মসনবি শরিফের সব ভাষ্যকার এ ব্যাপারে একমত যে, ‘নায়নামা’ (বাঁশরি-গাঁথা) বা মসনবির এই প্রথম আঠারটি বয়েত হলো পুরো ছয়খণ্ড মসনবির বিষয় ও ভাবার্থের নির্যাস। অন্য কথায়, মসনবি শরিফের পুরো ছয়খণ্ড এই আঠার বয়েতেরই ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ। আমরা এখন সেই বিশ্লেষণে প্রবেশ করতে চাই।