প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬
বর্তমানে প্রকৃতির রুদ্ররোষে জনজীবন চরমভাবে বিপর্যস্ত। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া বিশ্বজুড়ে দৃশ্যমান, তার অন্যতম একটি হলো এই তীব্র তাপদাহ বা হিটওয়েভ। কাঠফাটা রোদে ঘরের বাইরে পা ফেলাই যেন এখন এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। এই ভয়ংকর ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিমাণ মতো বিশুদ্ধ পানি পান করা। তীব্র গরমে আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ ক্রিয়াকলাপ স্বাভাবিক রাখতে এবং মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে বিশুদ্ধ পানির কোনো বিকল্প নেই।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, মানবদেহের প্রায় ৬০ শতাংশই পানি। তীব্র গরমে শরীরকে প্রাকৃতিকভাবে শীতল রাখার জন্য আমাদের ঘাম হয়। এই প্রক্রিয়ায় শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে পানি এবং সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় খনিজ বা ইলেকট্রোলাইট বের হয়ে যায়। এই হারানো পানি ও খনিজ দ্রুত পূরণ করা না হলে শরীরে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা দেখা দেয়। পানিশূন্যতার কারণে রক্ত ঘন হয়ে যায়, ফলে হৃদযন্ত্রকে রক্ত সঞ্চালনের জন্য অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয় এবং রক্তচাপ মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। এছাড়া, পানির অভাবে কিডনির স্বাভাবিক ছাঁকনি প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, যা থেকে কিডনি বিকল হওয়ার মতো ঝুঁকি তৈরি হয়। শরীরের নিজস্ব তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা থার্মোরেগুলেশন ব্যর্থ হলে মানুষের ‘হিট এক্সজশন’ এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ‘হিট স্ট্রোক’ হতে পারে, যা দ্রুত মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এই বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াগুলোই প্রমাণ করে যে তাপদাহের সময় শরীরের পানির ভারসাম্য বজায় রাখা কতটা জরুরি।
আমাদের দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে এই তাপদাহের প্রভাব অত্যন্ত বৈষম্যমূলক। সমাজের খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষ যেমন- কৃষক, দিনমজুর, রিকশাচালক ও হকারদের জীবিকার তাগিদে এই প্রখর রোদের মাঝেই কাজ করতে হয়। অতিরিক্ত কায়িক শ্রম ও রোদের কারণে তাদের পানির চাহিদা সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু রাস্তায় নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতা অত্যন্ত সীমিত। একজন সাধারণ শ্রমিকের পক্ষে প্রতিদিন বোতলজাত বিশুদ্ধ পানি কিনে পান করা এক বিশাল অর্থনৈতিক বোঝা। বাধ্য হয়ে তারা রাস্তার পাশের অস্বাস্থ্যকর ও দূষিত শরবত, আখের রস বা খোলা পানি পান করেন। এর ফলে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিসের মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ, তাপদাহ শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক ও জনস্বাস্থ্য সংকটেও রূপ নেয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক আড়াই থেকে ৩ লিটার পানি পান করা প্রয়োজন হলেও, তীব্র তাপদাহে এবং অতিরিক্ত ঘামলে এই চাহিদা চার থেকে পাঁচ লিটার পর্যন্ত হতে পারে। অনেকেই এই সময়ে পিপাসা মেটাতে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত কোমল পানীয় বা এনার্জি ড্রিংকস পান করেন, যা বিজ্ঞানসম্মতভাবে সম্পূর্ণ ভুল। এসব পানীয়তে থাকা ক্যাফেইন ও অতিরিক্ত চিনি ডাইইউরেটিক (মূত্রবর্ধক) হিসেবে কাজ করে, অর্থাৎ এগুলো প্রস্রাবের মাত্রা বাড়িয়ে শরীরকে আরও বেশি পানিশূন্য করে তোলে। তাই এই সময়ে সাধারণ তাপমাত্রার বিশুদ্ধ পানি, খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি বা লেবুর শরবতই হলো সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সমাধান।
ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপদাহের প্রকোপ আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিশুদ্ধ পানীয় জলের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এখন একটি জাতীয় পর্যায়ের জরুরি বিষয়। ব্যক্তিগত সচেতনতার জায়গা থেকে বাইরে বের হওয়ার সময় অবশ্যই নিজের সাথে বিশুদ্ধ পানির বোতল রাখা উচিত। পাশাপাশি, সামাজিকভাবে বিত্তবান ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে জনসমাগমস্থলে বিনামূল্যে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের উদ্যোগ নিতে হবে। রাষ্ট্রযন্ত্রকেও নিশ্চিত করতে হবে যেন প্রতিটি নাগরিকের নিরাপদ খাবার পানির অধিকার লঙ্ঘিত না হয়। প্রকৃতির এই বিরূপ আচরণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এক গ্লাস বিশুদ্ধ পানিই হতে পারে জীবন রক্ষার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
আমানুর রহমান
শিক্ষার্থী, স্নাতক, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, শান্তিনগর, ঢাকা।