প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২২ এপ্রিল, ২০২৬
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তকে কেন্দ্র করে নৌপথে মানব পাচারের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত, অর্থনৈতিক সংকট এবং বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা- এই তিনটি প্রধান কারণকে পুঁজি করে পাচারকারী চক্রগুলো ক্রমেই সক্রিয় হয়ে উঠছে।
চলতি মাসে আন্দামান সাগরে একটি ট্রলারডুবির ঘটনায় নারী, পুরুষ ও শিশুসহ অন্তত ২৫০ জন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। ধারণা করা হয়, টেকনাফ উপকূল থেকে সংঘবদ্ধ দালাল চক্রের প্ররোচনায় ট্রলারটি মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং উত্তাল সাগরের কারণে ট্রলারটি ভারসাম্য হারিয়ে ডুবে যায়। নিখোঁজদের মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশাপাশি বাংলাদেশি নাগরিকও ছিল, যা জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের পর প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি শরণার্থী শিবিরে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। তবে ক্যাম্পগুলোর সীমিত সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অভাব এবং প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা তাদের একটি অংশকে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে পাড়ি দিতে উদ্বুদ্ধ করছে। এ প্রেক্ষাপটে ‘পুশ’ ও ‘পুল’-উভয় ধরনের প্রভাবই লক্ষণীয়। একদিকে জীবিকার সংকট ও মানবিক সহায়তার ঘাটতি তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করছে, অন্যদিকে বিদেশে পৌঁছে সফল হওয়া কিছু মানুষের গল্প অন্যদের আকৃষ্ট করছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পাচারকারী চক্রগুলো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের বিপজ্জনক যাত্রায় প্রলুব্ধ করছে।
কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি সুসংগঠিত মানব পাচার চক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা রোহিঙ্গা শিবিরের তরুণ-তরুণীদের উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় পাচার করছে। এই পরিস্থিতি শুধু মানবিক সংকট নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্যও একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, এপিবিএন, বিজিবি ও কোস্টগার্ডের নজরদারি জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে পাচারকারী চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা দূর করে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য, যাতে অপরাধীরা পুনরায় এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়াতে না পারে।
রোহিঙ্গা সংকট একটি বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক সমস্যা। তাই এর টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থা বিশেষত UNHCR I IOM -এর আরও সক্রিয় ও সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। তাদের উদ্যোগের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, মানব পাচারের এই করুণ বাস্তবতা দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি, সীমিত সুযোগ-সুবিধা, নিজ দেশে ফেরত না যাওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পগুলোতে কর্মহীন অলস জীবনযাপন এবং টেকসই সমাধানের অভাবেরই প্রতিফলন। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। পাশাপাশি ‘মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২’-এর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং ‘ন্যাশনাল রেফারেল মেকানিজম (NRM)’-এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তৃণমূল থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়মিত সভা, আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বৈঠকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন উপস্থাপন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমেই এই সংকট কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব।
আবু মোরশেদ চৌধুরী (খোকা)
সভাপতি, কক্সবাজার সিভিল সোসাইটি