প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬
পৃথিবী দিবস! দিনটি এলেই আমরা হঠাৎ করে খুব পরিবেশসচেতন হয়ে উঠি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবুজ গাছপালার ছবি দিই। পরিবেশ বাঁচানোর বড় বড় কথা বলে দীর্ঘ স্ট্যাটাস লিখি। কর্পোরেট অফিসগুলোতে সেমিনারের আয়োজন করা হয়। কিন্তু দিন শেষে যখন আমরা আয়নার সামনে দাঁড়াই, তখন কি নিজেদের কাছে এই প্রশ্নটি করি? সত্যিই কি আমরা পৃথিবীর জন্য কিছু করছি? নাকি আমাদের এই উদযাপন শুধুই এক ধরনের আত্মতুষ্টির মহড়া? বাস্তব চিত্রটি অত্যন্ত ভয়াবহ। আমরা প্রতিদিন এমন কিছু কাজ করছি যা আমাদের এই সুন্দর গ্রহটিকে একটু একটু করে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই ধ্বংসযজ্ঞ কোনো একদিনে হঠাৎ করে ঘটেনি। এটি আমাদের প্রতিদিনের যাপিত জীবনের ছোট ছোট ভুলের এক বিশাল যোগফল বা গুণফল।
আমাদের রোজকার সকালের কথাই ধরা যাক। ঘুম থেকে উঠেই আমরা প্লাস্টিকের টুথব্রাশ এবং প্লাস্টিকের টিউবে রাখা টুথপেস্ট ব্যবহার করি। এরপর বাজারে গিয়ে পলিথিন ব্যাগে করে শাকসবজি কিনে আনি। এক কাপ চা বা কফি খেতে গিয়ে আমরা হয়তো একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের কাপ ব্যবহার করছি। দাঁত ব্রাশের সময় অবলীলায় কল ছেড়ে রাখছি। এই কাজগুলো আমাদের কাছে খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু পৃথিবীর আটশো কোটি মানুষ যখন প্রতিদিন এই একই কাজ করে, তখন তার প্রভাব হয় মারাত্মক। আমাদের ফেলে দেওয়া এই প্লাস্টিকগুলো বছরের পর বছর ধরে মাটিতে পড়ে থাকে। এগুলো পচে না বা গলে যায় না। বরং এগুলো ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। সেই মাইক্রোপ্লাস্টিক মিশে যায় আমাদের মাটিতে, পানিতে এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের রক্তেও।
আমাদের খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাপনও পরিবেশের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে খাবার নষ্ট করি। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ্বে উৎপাদিত খাবারের প্রায় এক তৃতীয়াংশই ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়। এই খাবার উৎপাদন করতে গিয়ে যে বিপুল পরিমাণ পানি, জমি এবং জ্বালানি ব্যবহৃত হয়েছে তার সবটাই বৃথা যায়। শুধু তাই নয়, পচে যাওয়া খাবার থেকে মিথেন গ্যাস নির্গত হয়। মিথেন গ্যাস কার্বন ডাই অক্সাইডের চেয়েও অনেক গুণ বেশি ক্ষতিকর একটি গ্রিনহাউস গ্যাস। অন্যদিকে আমাদের পোশাকের চাহিদাও পরিবেশের বারোটা বাজাচ্ছে। ফাস্ট ফ্যাশনের যুগে আমরা খুব সস্তায় পোশাক কিনছি এবং কয়েকবার পরার পরই তা ফেলে দিচ্ছি। একটি সুতির টিশার্ট তৈরি করতে প্রায় আড়াই হাজার লিটার পানি লাগে। আমাদের এই লাগামহীন ভোগের মাশুল গুনতে হচ্ছে প্রকৃতিকে।
প্রযুক্তির প্রতি আমাদের আসক্তি আরেকটি নীরব ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমরা প্রতি বছর নতুন মডেলের স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ কিনছি। পুরোনো গ্যাজেটগুলো ফেলে দিচ্ছি ডাস্টবিনে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে পাহাড়সম ইলেকট্রনিক বর্জ্য। এই ডিভাইসগুলো তৈরিতে ব্যবহৃত লিথিয়াম, কোবাল্ট এবং অন্যান্য খনিজ পদার্থ উত্তোলনের কারণে মাইলের পর মাইল বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে। ফেলে দেওয়া ই-বর্জ্য থেকে নির্গত সিসা এবং পারদ মাটির গভীরের পানিকে বিষাক্ত করে তুলছে। আমরা ডিজিটাল দুনিয়ায় যত বেশি যুক্ত হচ্ছি, প্রাকৃতিক দুনিয়া থেকে ততটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি।
শহরের জীবনযাত্রার দিকে তাকালে হতাশা আরও বাড়ে। আমরা সবুজ গাছপালা কেটে কংক্রিটের জঙ্গল তৈরি করছি। যাতায়াতের জন্য আমরা ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। যানজটে আটকে থাকা হাজার হাজার গাড়ি থেকে প্রতিনিয়ত কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে। এই ধোঁয়া আমাদের বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলছে। একটু স্বস্তির জন্য আমরা ঘরে ঘরে এয়ার কন্ডিশনার বা এসি লাগাচ্ছি। বাইরের তাপমাত্রা যখন বাড়ছে, তখন আমরা নিজেদের ঘর ঠান্ডা রাখতে এসির ব্যবহার বাড়াচ্ছি। কিন্তু আমরা ভুলে যাচ্ছি যে আমাদের এই এসি থেকে নির্গত ক্ষতিকর গ্যাস বাইরের তাপমাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটি এক ধরনের মারাত্মক দুষ্টচক্র। আমরা সাময়িক আরামের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপদ ডেকে আনছি।
পৃথিবীর এক প্রান্তে যখন আমরা পরিবেশ বাঁচানোর জন্য জলবায়ু সম্মেলন করছি, ঠিক তখনই অন্য প্রান্তে চলছে ভয়াবহ ধ্বংসলীলা। চলমান যুদ্ধ এবং সশস্ত্র সংঘাতগুলো শুধু মানবসভ্যতার জন্যই নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রের জন্য এক চরম অভিশাপ। আধুনিক যুদ্ধে ব্যবহৃত গোলাবারুদ, মিসাইল এবং ড্রোন হামলা বাতাসের স্তরকে বিষাক্ত করে তুলছে। প্রতিটি বোমার আঘাতে ধ্বংস হচ্ছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা বনভূমি এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। যুদ্ধট্যাংক, যুদ্ধজাহাজ এবং সামরিক বিমানের কার্বন নিঃসরণ সাধারণ যেকোনো হিসাবকে হার মানায়। বোমার আঘাতে মৃত্তিকায় মিশে যাচ্ছে সীসা, ইউরেনিয়াম এবং মারাত্মক সব রাসায়নিক বর্জ্য, যা মাটির উর্বরতা চিরতরে নষ্ট করে দিচ্ছে। যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া বিশাল ধ্বংসস্তূপ এবং বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ মানুষের চাপ পার্শ্ববর্তী এলাকার পরিবেশের ওপর অকল্পনীয় বোঝা তৈরি করছে। শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলে শুরু হওয়া এই যুদ্ধগুলো মূলত আমাদের একমাত্র বাসযোগ্য গ্রহটির মৃত্যুঘণ্টা বাজাচ্ছে।
আমাদের নদীগুলোর দিকে তাকালে বুক কেঁপে ওঠে। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা বা কর্ণফুলীর মতো নদীগুলো আজ মৃতপ্রায়। কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য এবং শহরের সব ময়লা আবর্জনা সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে। নদীর পানি কালো হয়ে গেছে। পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা এতটাই কমে গেছে যে সেখানে কোনো জলজ প্রাণী বাঁচতে পারে না। আমরা উন্নয়ন করছি ঠিকই, কিন্তু সেই উন্নয়নের বলি হচ্ছে আমাদের নদী, খাল এবং বিল। আমরা ভুলে গেছি যে নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে। জলের অপর নাম জীবন, কিন্তু আমরা সেই জলকেই বিষে পরিণত করেছি। কৃষিকাজে ব্যবহৃত অতিরিক্ত রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক বৃষ্টির পানির সঙ্গে ধুয়ে গিয়ে খালবিলে পড়ছে। এতে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ধ্বংস হচ্ছে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এখন আর কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়। এটি এখন আমাদের প্রাত্যহিক রূঢ় বাস্তবতা। মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাচ্ছে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশের মতো উপকূলীয় দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং বন্যার মাত্রা ও ভয়াবহতা বাড়ছে। ঋতুচক্রের স্বাভাবিক আচরণ বদলে গেছে। যখন বৃষ্টি হওয়ার কথা তখন তীব্র খরা দেখা দিচ্ছে। আবার অসময়ে অতিবৃষ্টির কারণে কৃষকের ফসল তলিয়ে যাচ্ছে। এসব কিছুর পেছনে মূল কারণ হলো আমাদের পরিবেশবিরোধী কার্যকলাপ। আমরা নির্বিচারে বন উজাড় করে দিচ্ছি। অ্যামাজন থেকে শুরু করে আমাদের সুন্দরবন পর্যন্ত সবখানেই মানুষের আগ্রাসী থাবা পড়েছে।
সমস্যাগুলো আমাদের সবারই জানা। কিন্তু সমাধানের ক্ষেত্রে আমাদের চরম অনীহা লক্ষ করা যায়। আমরা মনে করি পরিবেশ বাঁচানোর দায়িত্ব শুধুই সরকারের বা বড় বড় পরিবেশবাদী সংস্থার। এই দায় এড়ানোর মানসিকতাই আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। পৃথিবী দিবসে আমাদের গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে যে, পরিবর্তন শুরু করতে হবে নিজের ঘর থেকে। সরকার আইন করতে পারে, কিন্তু সেই আইন মানার দায়িত্ব আমাদের। পলিথিন নিষিদ্ধ করা হলেও আমরা তা ব্যবহার করা বন্ধ করিনি। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা আমাদের জাতীয় অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই আত্মঘাতী অভ্যাসগুলো বদলাতে হবে। আমাদের রোজকার ছোট ছোট ইতিবাচক পরিবর্তনগুলোই সামগ্রিকভাবে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
আসুন, আজ এই পৃথিবী দিবসে আমরা নিজেদের কাছে কিছু সুস্পষ্ট প্রতিজ্ঞা করি। আমরা প্লাস্টিকের ব্যবহার ধীরে ধীরে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনব। যতটুকু সম্ভব পুনরায় ব্যবহারযোগ্য জিনিসপত্র কিনব। অকারণে বিদ্যুৎ এবং পানির অপচয় করব না। ঘরের বাইরে যাওয়ার সময় লাইট এবং ফ্যান বন্ধ রাখব। খাদ্যের অপচয় রোধ করতে সচেষ্ট হব। সুযোগ পেলেই গাছ লাগাব এবং তার সঠিক যত্ন নেব। ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন ব্যবহারের চেষ্টা করব। এই কাজগুলো করতে খুব বেশি কষ্ট হয় না। এর জন্য শুধু প্রয়োজন একটু সদিচ্ছা এবং নাগরিক সচেতনতার।
পরিশেষে একটি ধ্রুব সত্য কথা মনে রাখা প্রয়োজন। পৃথিবী নামক এই গ্রহটি কোটি কোটি বছর ধরে টিকে আছে। এর ওপর দিয়ে অনেক বড় বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয় গেছে। ডাইনোসরদের মতো বিশাল এবং শক্তিশালী প্রাণীরাও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পৃথিবী ঠিকই নিজেকে সারিয়ে তুলেছে। আমরা যদি পরিবেশ ধ্বংস করে ফেলি, তবে হয়তো মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কিন্তু পৃথিবী ঠিকই তার নিজস্ব নিয়মে আবার নতুন করে সেজে উঠবে। তাই পরিবেশ বাঁচানোর এই আন্দোলন আসলে পৃথিবীকে বাঁচানোর আন্দোলন নয়। এটি হলো মূলত আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার আন্দোলন। পৃথিবী দিবসে শুধু একদিনের জন্য পরিবেশপ্রেমী না হয়ে, আসুন আমরা প্রতিদিন একটু একটু করে আমাদের বদভ্যাসগুলো পরিবর্তন করি। তবেই হয়তো আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য সুন্দর পৃথিবী রেখে যাওয়া সম্ভব হবে।
আল শাহারিয়া
শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, পরিবেশবাদী লেখক, সংগঠক ও কলামিস্ট