প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬
শিক্ষা সংস্কারের জোরালো সাফল্যের গল্পে যখন পরিসংখ্যানের ঝলকানি চোখ ধাঁধায়, তখন নীরবে প্রশ্ন জাগে এই অর্জন কতটা বাস্তব, আর কতটাই বা কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ? আমাদের দেশে শিক্ষা সংস্কার নিয়ে সরকারি বক্তব্য সাধারণত আশাবাদী। শতভাগ ভর্তি, উন্নত কারিকুলাম, ডিজিটাল ক্লাসরুম, উচ্চ পাসের হার ইত্যাদি। কিন্তু যখন আমরা এই সাফল্যকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, পরিসংখ্যান এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করি, তখন স্পষ্ট হয় এই সাফল্যের একটি বড় অংশ কাগুজে আর বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে শিক্ষা সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। নীতিনির্ধারকরা প্রায়ই দাবি করেন যে নতুন কারিকুলাম, প্রযুক্তি সংযোজন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ বা অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। সরকারি প্রতিবেদন, আন্তর্জাতিক সূচক কিংবা প্রকল্পভিত্তিক মূল্যায়নে এসব সংস্কারকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- এই সাফল্য কতটা কাগুজে, আর কতটা বাস্তব? মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, শিক্ষার্থী-শিক্ষকের প্রতিক্রিয়া এবং শিক্ষার প্রকৃত ফলাফল বিশ্লেষণ করলে একটি ভিন্ন চিত্র সামনে আসে। শিক্ষা সংস্কারের সাফল্য প্রমাণে সাধারণত কিছু সূচক ব্যবহার করা হয়। যেমন ভর্তির হার, পাসের হার, জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা, ডিজিটাল ক্লাসরুমের সংখ্যা, শিক্ষকের সংখ্যা কিংবা নতুন কারিকুলামের বাস্তবায়ন হার। এসব সূচক সহজে পরিমাপযোগ্য হওয়ায় নীতিনির্ধারকদের জন্য সুবিধাজনক। উদাহরণস্বরূপ, গত এক দশকে প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার প্রায় সর্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে দাবি করা হয়। একইভাবে, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে পাসের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু এই পরিসংখ্যানের পেছনে অনেক সময় বাস্তবতার জটিলতা লুকিয়ে থাকে। ভর্তির হার বাড়লেও ঝরে পড়ার হার কমেছে কি? পাসের হার বাড়লেও শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দক্ষতা, পঠন, গণনা, বিশ্লেষণ কতটা উন্নত হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর অনেক সময় অস্পষ্ট থেকে যায়। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সাক্ষরতার হার ১৯৮১ সালে মাত্র ২৯% থেকে বেড়ে ২০২১ সালে প্রায় ৭৬% হয়েছে। ২০২৫ সালের কাছাকাছি সময়েও এটি প্রায় ৭৭–৭৮% বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। যুব সাক্ষরতার হার (১৫-২৪ বছর) প্রায় ৯৫%, যা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত। প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি হার ১০০% ছাড়িয়েছে। এই সূচকগুলো দেখিয়ে বলা হয় বাংলাদেশ শিক্ষা ক্ষেত্রে সাফল্যের মডেল। কিন্তু আন্তর্জাতিক তুলনায় চিত্র ভিন্ন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সঙ্গে তুলনা করলে কোথায় পিছিয়ে বাংলাদেশ? বিশ্বের গড় সাক্ষরতার হার প্রায় ৮৬%, সেখানে বাংলাদেশ এখনও নিচে অবস্থান করছে। আরও বড় সমস্যা হলো মানগত সূচক। শিক্ষা মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশ বৈশ্বিক র?্যাংকিংয়ে প্রায় ১৪৪তম অবস্থানে। উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ মাত্র ২৩.৭%, যা উন্নত দেশের তুলনায় অনেক কম। মাধ্যমিক স্তরে ভর্তি মাত্র ৭১%, অর্থাৎ উল্লেখযোগ্য ঝরে পড়া রয়েছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো- যেমন ফিনল্যান্ড, জাপান, সিঙ্গাপুর বা দক্ষিণ কোরিয়া শুধু সাক্ষরতার হার নয়, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা দিয়েও এগিয়ে। এই দক্ষতা পরিমাপের অন্যতম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হলো PISA (Programme for International Student Assessment)। বাংলাদেশ এই পরীক্ষায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করে না বা উল্লেখযোগ্য স্কোর নেই। আমরা আন্তর্জাতিক মানে নিজেদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও পিছিয়ে। শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো জ্ঞান, দক্ষতা ও মূল্যবোধ গঠন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, পরীক্ষাভিত্তিক সাফল্য অর্জনের জন্য মুখস্থনির্ভর শিক্ষা এখনও প্রাধান্য পাচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী উচ্চ নম্বর পেলেও মৌলিক ধারণাগত জ্ঞান দুর্বল থাকে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক স্তরের অনেক শিক্ষার্থীই নির্ধারিত শ্রেণির উপযোগী পাঠ্যবই সাবলীলভাবে পড়তে বা সহজ গণিত সমাধান করতে পারে না। এই মানগত সংকটের একটি বড় কারণ হলো মূল্যায়ন পদ্ধতির দুর্বলতা। প্রশ্নপত্র ফাঁস, কোচিং নির্ভরতা, গাইডবইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। এসব সমস্যা শিক্ষাব্যবস্থাকে কাগুজে সাফল্যের দিকে ঠেলে দেয় আর প্রকৃত শিক্ষাকে বাধাগ্রস্ত করে। বাংলাদেশে একটি বড় সমস্যা হলো- literacy আর learning এক জিনিস নয়। সাক্ষরতার সংজ্ঞা হলো: সহজ একটি বাক্য পড়তে ও লিখতে পারা। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি নাম লিখতে পারলেই তাকে সাক্ষর ধরা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো: সে কি বিশ্লেষণ করতে পারে? সে কি যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে? সে কি প্রযুক্তি বা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ব্যবহার করতে পারে? এখানেই বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বড় ফাঁক। পাসের হার ও জিপিএ-৫ কৃত্রিম সাফল্য নয়? বাংলাদেশে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে পাসের হার ক্রমাগত বাড়ছে। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে কিছু বাস্তবতা রয়েছে। প্রশ্নফাঁস ও কোচিং নির্ভরতা, গাইডবই ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষা, নম্বর বাড়ানোর প্রবণতা। ফলে উচ্চ নম্বর ? উচ্চ দক্ষতা। এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যেখানে শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণ ক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধান দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। নতুন কারিকুলাম প্রবর্তনের মাধ্যমে সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, শিক্ষকরা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন না বা প্রশিক্ষণ কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারছেন না। নতুন পদ্ধতিতে পাঠদান করতে গেলে শিক্ষকদের মানসিকতা, দক্ষতা ও সময় সবকিছুর পরিবর্তন দরকার। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরা পুরনো পদ্ধতিতেই ফিরে যান। কারণ সেটিই তাদের কাছে সহজ ও পরিচিত। দ্বিতীয়ত, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষাদান কঠিন হয়ে পড়ে। দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন করতে গেলে প্রতিটি শিক্ষার্থীর অগ্রগতি আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। যা বাস্তবে অনেক স্কুলে সম্ভব হয় না। নতুন কারিকুলামে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, প্রজেক্ট কাজ, বাস্তবমুখী মূল্যায়ন যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষক প্রশিক্ষণের ঘাটতি, বড় ক্লাসরুম (প্রতি শিক্ষক ৩০ শিক্ষার্থী), পর্যাপ্ত সময় ও রিসোর্সের অভাব। ফলে নতুন কারিকুলাম অনেক ক্ষেত্রে ফাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আমাদের শিক্ষা ব্যয় আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় খুবই কম। বাংলাদেশে শিক্ষায় ব্যয় এউচণ্ডএর মাত্র ১.৭৮%। অন্যদিকে UNESCO সুপারিশ ৪-৬% GDP। উন্নত দেশগুলো প্রায় ৫% বা তার বেশি। অর্থাৎ বিনিয়োগ কম, ফলে মান উন্নয়নও সীমিত। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, অনলাইন শিক্ষা, ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম উদ্যোগ কাগজে-কলমে বেশ আকর্ষণীয়। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অনেক স্কুলে প্রজেক্টর বা কম্পিউটার থাকলেও সেগুলো নিয়মিত ব্যবহার হয় না। বিদ্যুৎ সমস্যা, ইন্টারনেটের দুর্বলতা, শিক্ষক দক্ষতার অভাবের কারণে প্রযুক্তির সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ইসলাম
শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়