প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬
সড়ক নিরাপত্তা বিষয়টি বর্তমানে বাংলাদেশের জনজীবনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক, সংবেদনশীল এবং আলোচিত একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন খবরের কাগজের পাতা খুললেই সড়ক দুর্ঘটনার মর্মান্তিক খবর আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে, যা আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার ভিত্তিকেই কাঁপিয়ে দিচ্ছে। প্রিয়জনের মৃত্যু, পঙ্গুত্ব এবং অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতির দীর্ঘ মিছিল যেন থামার কোনো নামই নিচ্ছে না। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামীণ সড়ক- সবখানেই যেন এক একটি মরণফাঁদ পেতে রাখা হয়েছে। সড়ক নিরাপত্তার এই ভয়াবহ পরিস্থিতি শুধু কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি দশকের পর দশক ধরে চলে আসা অব্যবস্থাপনা, আইনের শাসনের চরম অভাব, কাঠামোগত দুর্বলতা, এবং শৃঙ্খলাবোধের সামগ্রিক অবক্ষয়ের এক সম্মিলিত ও করুণ ফসল। নিরাপদ সড়কের দাবিতে বছরের পর বছর ধরে ছাত্রসমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ রাজপথে আন্দোলন করেছে, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নানা সময় নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, অথচ বাস্তব চিত্রের খুব একটা উন্নতি হয়নি; বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবস্থার অবনতি হয়েছে। এই পরিস্থিতির পেছনে যে গভীর, বহুমাত্রিক ও কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দায়ী, তা নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করা এবং সেই অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছাড়া সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বরাবরই চিহ্নিত করা হয় ট্রাফিক আইন প্রয়োগে শৈথিল্য এবং রাস্তায় শৃঙ্খলার চরম অভাব। আমাদের সড়কে যে বিশৃঙ্খলা আমরা প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করি, তা মূলত আইনের শাসনের প্রতি একধরনের বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের বহিঃপ্রকাশ। ট্রাফিক আইন না মেনে উল্টোপথে গাড়ি চালানো, ওভারটেকিংয়ের অসুস্থ ও বিপজ্জনক প্রতিযোগিতা, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানো, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা এবং রাস্তার মাঝখানে পার্কিং করা এখন অধিকাংশ চালকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যারা গাড়ি চালান, তাদের বড় একটি অংশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা পেশাদারিত্বের অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, লাইসেন্সবিহীন বা ভুয়া লাইসেন্সধারী চালক ভারী যানবাহন নিয়ে মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দায়বদ্ধতার একটি বিশাল ও প্রশ্নবিদ্ধ ঘাটতি স্পষ্ট। নিয়ম ভঙ্গের জন্য কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা জরিমানার বিধান কাগজে-কলমে থাকলেও, তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রায়ই রাজনৈতিক প্রভাব বা বিভিন্ন শক্তিশালী সিন্ডিকেটের দাপটে বাধাগ্রস্ত হয়। এই যে আইনের শাসনের অভাব, তা সড়কে নৈরাজ্যকেই শুধু প্রশ্রয় দিচ্ছে না, বরং চালকদের বেপরোয়া মনোভাবকে আরও উসকে দিচ্ছে।
কাঠামোগত দুর্বলতার দিকে তাকালে দেখা যায়, আমাদের দেশের অধিকাংশ সড়ক ও মহাসড়ক পরিকল্পিতভাবে এবং বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড মেনে তৈরি করা হয়নি। নগরায়ণ এবং মহাসড়ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে ধরনের দূরদর্শী প্রকৌশলগত পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল, তার অভাব প্রকট। সড়কের বাঁকগুলো অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং অনেক ক্ষেত্রেই আধুনিক সড়ক নির্মাণের মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি। মহাসড়কের পাশে কোনো ধরনের নিরাপত্তা বেষ্টনী বা ডিভাইডার না থাকায় বিপরীতমুখী যানবাহনের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে, যা বহু প্রাণহানী ঘটাচ্ছে। এছাড়া মহাসড়কের অধিকাংশ স্থানেই স্থানীয় হাটবাজার, বাসস্টপ এবং অবৈধ বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে, যা যাতায়াতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
পথচারীদের চলাচলের জন্য যথাযথ ফুটপাত বা নিরাপদ পারাপারের জন্য পর্যাপ্ত ওভারপাস নেই বললেই চলে। ফলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সড়ক পার হতে বাধ্য হচ্ছেন। এই অবকাঠামোগত ত্রুটিগুলোই দুর্ঘটনার অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। অনেক সময় সড়কের নির্মাণকাজ নিম্নমানের হওয়ায় রাস্তা তৈরির অল্প কিছুদিনের মধ্যেই গর্ত ও খানাখন্দ তৈরি হয়, যা যানবাহন চালকদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হিমশিম খাওয়াচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
পরিবহন খাতের সিন্ডিকেট এবং অনিয়ম সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে আরেকটি বড় বাধা। সরকারি ও বেসরকারি খাতের যানবাহনগুলোর অধিকাংশেরই ফিটনেস সনদ নেই, অথচ দিব্যি সেগুলো মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। পুরোনো, জরাজীর্ণ গাড়িগুলো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায়ই মহাসড়কের মাঝখানে অচল হয়ে পড়ছে এবং দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে গাড়ি পরীক্ষার প্রক্রিয়াটিতে স্বচ্ছতা আনা এবং কঠোর তদারকি জরুরি। কিন্তু পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে অনেক সময় কর্তৃপক্ষ কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে না। তাদের চাপের মুখে অনেক নিয়ম শিথিল হয়ে পড়ে এবং ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো লাইসেন্স পেয়ে যায়। চালক ও হেলপারদের কাজের দীর্ঘ সময়ও একটি বড় সমস্যা। একজন চালক টানা অনেক ঘণ্টা বা অনেক দিন গাড়ি চালালে তার শরীরে ক্লান্তি ও মনোযোগের অভাব দেখা দেয়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অথচ তাদের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং তা নজরদারির কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। যাত্রী এবং চালকদের মধ্যে সচেতনতার চেয়ে মুনাফা অর্জনের নেশা যে প্রবল, তা আমাদের পুরো সড়ক ব্যবস্থাপনাকে বিপর্যস্ত করে তুলছে।
সড়ক নিরাপত্তায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের দিক থেকে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি। উন্নত বিশ্বে সিসিটিভি ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং যানবাহনের গতির ওপর কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা হয়েছে। আমাদের দেশেও ডিজিটাল ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা স্থাপনের কথা বহুবার বলা হলেও তা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। হাইওয়ে পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও জনবল এবং আধুনিক সরঞ্জামের অভাব রয়েই গেছে। দুর্ঘটনার পর তাৎক্ষণিক উদ্ধার কার্যক্রম এবং আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর জন্য যে ধরনের ট্রমা সেন্টার বা জরুরি সেবার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, তার তীব্র ঘাটতি রয়েছে। এই অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাগুলো দুর্ঘটনার পরবর্তী প্রভাবকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। অনেক সময় সঠিক সময়ে উন্নত চিকিৎসা না পাওয়ায় আহত ব্যক্তিরা মৃত্যুবরণ করেন বা স্থায়ী পঙ্গুত্বের শিকার হন, যা তাদের পরিবারের জন্য এক চরম বিপর্যয় ডেকে আনে।
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু আইন করলেই হবে না, বরং সেই আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ও কঠোরতা বজায় রাখতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং লাইসেন্সিং প্রক্রিয়াকে আধুনিকায়ন করা জরুরি। চালকদের জন্য নিয়মিত পেশাদার প্রশিক্ষণ এবং নৈতিকতা বিষয়ক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিশেষ করে যারা ভারী যানবাহন চালান, তাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা মালিকপক্ষের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব হওয়া উচিত। সড়ক নির্মাণের সময় প্রকৌশলগত ত্রুটিগুলো দূর করতে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের পরামর্শ নিতে হবে এবং প্রতিটি প্রকল্পের মান নিশ্চিত করতে স্বাধীন পর্যবেক্ষক দল থাকা প্রয়োজন। মহাসড়কের পাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং পথচারীদের জন্য নিরাপদ অবকাঠামো তৈরির কাজকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সর্বশেষে বলা যায়, সড়ক নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং তার কঠোর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এটি শুধু সরকারের একক দায়িত্ব নয়, বরং নাগরিক সমাজ ও প্রতিটি সাধারণ মানুষকে ট্রাফিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আমরা যদি সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে না পারি, তবে আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তুলেও দুর্ঘটনা কমাতে পারব না। নিরাপদ সড়ক মানে শুধু রাস্তা তৈরি নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল এবং দায়িত্বশীল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। যখন একজন চালক ট্রাফিক আইন মেনে চলবেন, যখন একজন যাত্রী নিয়ম মেনে চলবেন এবং যখন কর্তৃপক্ষ আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করবে—ঠিক তখনই আমরা নিরাপদ সড়কের স্বপ্ন দেখতে পারব।
সড়ক দুর্ঘটনার এই লাশের মিছিল আর কত লম্বা হবে, তা নির্ভর করছে আমাদের সম্মিলিত সদিচ্ছা এবং সংস্কারের ওপর। সড়ক নিরাপত্তা এখন আর কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটি একটি জাতীয় দাবি। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য, তরুণ প্রজন্মের জন্য এবং একটি সভ্য ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সড়ক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও কাঠামোগত পরিবর্তনের এখনই উপযুক্ত সময়। এই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন অদম্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নাগরিক সচেতনতা এবং কঠোর দায়বদ্ধতা। শুধু তখনই আমাদের রাস্তাগুলো মৃত্যু উপত্যকা না হয়ে যোগাযোগের নিরাপদ মাধ্যম হয়ে উঠবে। আমাদের প্রতিটি সচেতন পদক্ষেপই হয়তো একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে, তাই সময়ের প্রয়োজনে সড়ক ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনই হোক আমাদের আগামীর অঙ্গীকার।