ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৫ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বাবা-মেয়ের পবিত্র সম্পর্ক : কুরুচিপূর্ণ মনস্তত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ

ড. মো. আনোয়ার হোসেন
বাবা-মেয়ের পবিত্র সম্পর্ক : কুরুচিপূর্ণ মনস্তত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ

সৃষ্টির অনাদিকাল হইতে পিতা ও কন্যার সম্পর্ক এক স্বর্গীয় অম্লান মহিমায় ভাস্বর। এই সম্পর্ক শুধু রক্তজ বন্ধন নহে, বরং স্নেহ, মমতা ও অতলস্পর্শী বিশ্বাসের এক অনন্য আধার। জনৈক পিতার কাছে তাহার কন্যা যেমন পরম আশ্রয়ের স্থল, তেমনই কন্যার কাছে পিতা হইলেন বটবৃক্ষের ন্যায় ছায়াদানকারী আদর্শ। বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাহার কন্যা জাইমা রহমানের মধ্যকার অকৃত্রিম স্নেহময় মুহূর্তগুলো- শৈশবে পিতার স্কন্ধে কন্যার আরোহণ, কৌতুকপূর্ণ খুনসুটি কিংবা সংসদীয় কার্যক্রমে পিতার পার্শ্বে কন্যার উপস্থিতি- জাতীয় জীবনে এক ইতিবাচক ও অনুকরণীয় পারিবারিক আদর্শের বাতাবরণ সৃষ্টি করেছে।

পিতৃত্বের এই নির্মল ছায়া ও অপত্য স্নেহের বহিঃপ্রকাশ যখন জনসমক্ষে উন্মোচিত হয়, তখন তাহা একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজের প্রতিচ্ছবি বহন করে। জাইমা রহমানের শৈশব হইতে বর্তমান অবধি পিতার সহিত তার যে সহজ ও সাবলীল সাহচর্য, তা শুধু একটি পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয় নহে, বরং পারিবারিক মূল্যবোধের এক শক্তিশালী বার্তা। সিনেমা হলে একত্রে চলচ্চিত্র দর্শন কিংবা কর্মব্যস্ততার মাঝেও একে অপরের সহিত কৌতুকময় সময় অতিবাহিত করা- এই সকল দৃশ্যপটে আমরা একজন রাষ্ট্রনায়কের অন্তরালে থাকা এক কোমলপ্রাণ পিতাকে আবিষ্কার করি, যাহা জনমানসে মুগ্ধতা সঞ্চার করে।

পরিতাপের বিষয় এই যে, এই পবিত্র ও শাশ্বত মানবিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করিয়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হইয়া একদল কুচক্রী মহল গুজব ও কুরুচিপূর্ণ প্রচারণায় লিপ্ত হইয়াছে। যাহারা রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির নিমিত্তে বাবা-মেয়ের এই পবিত্র বন্ধনকে লক্ষ্য করিয়া বিকৃত ফটোকার্ড কিংবা কুৎসিত অপপ্রচার চালায়, তাহারা মূলত সমাজদেহের এক একটি বিষফোঁড়া। তাহাদের এই হীন প্রয়াস কেবল ব্যক্তিবিশেষকে কলঙ্কিত করে না, বরং সমগ্র জাতির বিবেক ও রুচিবোধের মূলে কুঠারাঘাত করে।

এই সকল অপপ্রচারকারীর প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হইল তাহাদের বিবেকহীন মন। একজন বিবেকবান মানুষ কখনও পিতা ও কন্যার সম্পর্ক লইয়া কোনো প্রকার অশালীন চিন্তা করিতে পারে না। যাহাদের বিচারবুদ্ধি লোপ পাইয়াছে এবং যাহারা ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য ভুলিয়া গিয়াছে, তাহারাই শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করিতে এমন হীন পথ অবলম্বন করে। তাহাদের কাছে সত্যের চেয়ে মিথ্যার আবরণ অধিক প্রিয়, কারণ তাহাদের অন্তরাত্মা কলুষতায় আচ্ছন্ন।

গুজব সৃষ্টিকারীদের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হইল তাহাদের বিকৃত রুচি। রুচিবোধ মানুষের আভিজাত্য ও শিক্ষার পরিচয় বহন করে। কিন্তু যাহারা পবিত্র সম্পর্ককে নোংরাভাবে উপস্থাপন করে, তাহারা সুরুচির ধার ধারে না। মানসিক বিকারগ্রস্ত না হইলে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ পরিবারের সদস্যদের মধ্যকার খুনসুটিকে বিকৃতভাবে ব্যাখ্যা করিতে পারে না। এই বিকৃতি তাহাদের চারিত্রিক স্খলনেরই এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

এই অপপ্রচারের মূলে রহিয়াছে এক গভীর হিংসুটে মনোভাব। প্রধানমন্ত্রী ও তাহার কন্যার মধ্যকার অকৃত্রিম ভালোবাসা ও জনসাধারণের নিকট তাহাদের গ্রহণযোগ্যতা দেখিয়া ঈর্ষান্বিত হইয়াই কুচক্রী মহল এই পথ বাছিয়া লইয়াছে। অন্যের সুখ ও সুসম্পর্ক সহ্য করিতে না পারা এক প্রকার মানসিক ব্যাধি। এই হিংসা হইতেই কুৎসা রটনার জন্ম হয়, যাহা শেষ পর্যন্ত সমাজে নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে।

যাহারা এই প্রকার জঘন্য কার্যকলাপে লিপ্ত, তাহারা আধ্যাত্মিক ও মানসিকভাবে অপবিত্র। পবিত্রতা কেবল বাহিরের আবরণে থাকে না, বরং অন্তরের পবিত্রতাই মুখ্য। যাহাদের অন্তর ঘৃণা ও নোংরামিতে পূর্ণ, তাহাদের মুখ নিঃসৃত শব্দ কিংবা লেখনীও কুরুচিপূর্ণ হইতে বাধ্য। তাহারা পবিত্রতাকে অপবিত্র করার এক ব্যর্থ চেষ্টায় লিপ্ত থাকে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাহারা নিজেদেরই অধিকতর পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত করে।

এই শ্রেণির লোকেরা প্রকৃত অর্থে সুশিক্ষিত নয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হয়তো অনেকের থাকিতে পারে, কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে শিষ্টাচার ও পরমতসহিষ্ণুতা শেখায়। সুশিক্ষা মানুষকে অন্যের সম্মান রক্ষা করিতে উদ্বুদ্ধ করে। অথচ এই অপ-প্রচারকারীরা শিক্ষার সেই পরম আদর্শ হইতে বিচ্যুত। তাহাদের আচরণের মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে, তাহাদের চেতনা ও মননে শিক্ষার আলো প্রবেশ করিতে ব্যর্থ হইয়াছে।

তাহাদের কর্মকাণ্ডে এক নীতিহীন সত্তা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিটি মানুষের কিছু সুনির্দিষ্ট নৈতিক মানদণ্ড থাকা আবশ্যক। রাজনীতিতে মতাদর্শের ভিন্নতা থাকিতে পারে; কিন্তু তাহা কখনও পারিবারিক সম্পর্কের মর্যাদাহানির কারণ হইতে পারে না। যাহাদের জীবনে কোনো সুনির্দিষ্ট নৈতিক ভিত্তি নাই, তাহারাই শুধু হীন স্বার্থে চারিত্রিক হননের ন্যায় অপরাধে লিপ্ত হইতে পারে। এই সকল গুজব রটনাকারীদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয় এক চরম হীন মানসিকতা। ছোট মন লইয়া বড় কোনো কাজ করা সম্ভব নহে। যাহারা নিচু স্তরের চিন্তা করে, তাহাদের কর্মকাণ্ডও হয় নিম্নমানের। পিতা-কন্যার খুনসুটিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা তাহাদের মানসিক সংকীর্ণতারই চূড়ান্ত প্রমাণ। এই হীনতা তাহাদের ব্যক্তিত্বকে জনসমক্ষে হাস্যাস্পদ ও ঘৃণ্য করিয়া তোলে।

সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে মূল্যবোধহীন চরিত্র লইয়া ইহারা বিচরণ করে। মূল্যবোধই মানুষকে পশুর নিকট হইতে পৃথক করে। পারিবারিক বন্ধন, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ছোটদের প্রতি স্নেহ- এগুলি আমাদের চিরায়ত মূল্যবোধ। যাহারা এই মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়া কেবল অপপ্রচারে মত্ত থাকে, তাহারা মূলত মূল্যবোধের আড়ালে লুকাইয়া থাকা একদল অমানুষ। এই প্রচারণার পেছনে কাজ করে সস্তা প্রচারক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার করিয়া অতি দ্রুত দৃষ্টি আকর্ষণের নেশায় তাহারা এই প্রকার কুরুচিপূর্ণ কন্টেন্ট তৈরি করে। তাহারা জানে যে, নেতিবাচক ও বিতর্কিত বিষয় দ্রুত ছড়ায়। এই সাময়িক পরিচিতির লোভে তাহারা চিরস্থায়ীভাবে নিজেদের চরিত্রকে কলঙ্কিত করে এবং সমাজের কাছে ঘৃণার পাত্র হয়।

ইহারা আধুনিক সমাজের এক সামাজিক ব্যাধি স্বরূপ। একটি ভাইরাস যেমন সুস্থ দেহকে আক্রমণ করে, এই সকল অপপ্রচারকারীরাও তেমনই সুস্থ সমাজ ব্যবস্থাকে কলুষিত করে। তাহাদের এই কর্মকাণ্ড সংক্রামক ব্যাধির ন্যায় ছড়াইয়া পড়িয়া তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে। এই ব্যাধি প্রতিরোধ করা না গেলে সামাজিক কাঠামোর ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হইয়া পড়িবে।

এই সকল ব্যক্তির আচরণে শিষ্টাচারবর্জিত স্বভাব প্রকটভাবে বিদ্যমান। শিষ্টাচার মানুষের ভূষণ। একজন মার্জিত মানুষ কখনও অন্যের ব্যক্তিগত জীবন কিংবা পারিবারিক সম্পর্ক লইয়া আপত্তিকর মন্তব্য করিতে পারে না। শিষ্টাচারহীনতা শুধু পারিবারিক শিক্ষার অভাবই নির্দেশ করে না, বরং ইহা একটি জাতির সামগ্রিক অবক্ষয়ের দিকেও অঙ্গুলি নির্দেশ করে।

তাহাদের কুৎসিত চিন্তাধারা সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলিয়া দেয়। যে চিন্তা মানুষের কল্যাণে আসে না, যাহা শুধু ধ্বংস ও ঘৃণা ছড়ায়, তাহা কুৎসিত ছাড়া আর কিছুই নহে। পিতা ও কন্যার নির্মল ভালোবাসা দেখিলে যাহাদের মনে কুণ্ডচিন্তার উদ্রেক হয়, তাহাদের মানসিক চিকিৎসা প্রয়োজন। এই কুৎসিত চিন্তা তাহাদের সমগ্র অস্তিত্বকে গ্রাস করিয়া ফেলিয়াছে।

ইহাদের মধ্যে এক প্রকার হিংস্র মনোভাব বিদ্যমান। তাহারা শুধু শব্দ বা ছবির মাধ্যমে নয়, বরং মানসিকভাবে প্রতিপক্ষকে ছিঁড়িয়া ফড়িয়া খাইতে চায়। এই হিংস্রতা তাহাদিগকে অমানবিক করিয়া তোলে। রাজনৈতিক ময়দানকে রণক্ষেত্রে পরিণত করিয়া তাহারা পারিবারিক অন্দরমহলে পর্যন্ত আক্রমণের নখবিস্তার করে, যাহা সভ্য সমাজের কাম্য নহে।

ইহারা মূলত সত্যবিমুখ প্রচারক। সত্য অনেক সময় কঠিন হয়; কিন্তু গুজব রটনাকারীরা মিথ্যার মোড়কে আকর্ষণীয় গল্প সাজাইতে পছন্দ করে। জাইমা রহমান ও তারেক রহমানের সম্পর্কের প্রকৃত মাধুর্যকে ঢাকিয়া দিয়া তাহারা মিথ্যার জাল বুনে। সত্যের মুখোমুখি হইবার সাহস নাই বলিয়াই তাহারা বানোয়াট ফটোকার্ডের আশ্রয় গ্রহণ করে।

সামগ্রিক বিচারে ইহারা চারিত্রিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত সীমায় উপনীত হইয়াছে। একটি জাতির যখন চারিত্রিক পতন ঘটে, তখন তাহার প্রথম লক্ষণ হয় পরনিন্দা ও কুৎসা রটনা। এই অপ-প্রচারকারীরা সেই অবক্ষয়েরই জীবন্ত প্রতিনিধি। তাহাদের কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে, সমাজে নৈতিকতার দেওয়াল ধসিয়া পড়িতেছে, যাহা মেরামতে দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক সংস্কার প্রয়োজন। তাহাদের প্রতিটি পদক্ষেপের পশ্চাতে রহিয়াছে এক ষড়যন্ত্রকারী মন। গুজব কখনও আপন আপনি সৃষ্টি হয় না; ইহা সুপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের লক্ষ্যে পবিত্র সম্পর্ককে বিতর্কিত করার এই ষড়যন্ত্র অত্যন্ত গভীর। এই ষড়যন্ত্রকারীরা সর্বদা অন্ধকার পথে হাটিতে পছন্দ করে এবং আলোর উপস্থিতিকে ভয় পায়।

পরিশেষে বলা যায়, এই সব পরশ্রীকাতর ব্যক্তি, বিষাক্ত মস্তিষ্ক ও অসংলগ্ন আচরণকারী লোকরা সমাজের মূল ধারার শত্রু। তাহাদের বিবেকবর্জিত প্রচার ও মনুষ্যত্বহীন সত্তা শুধু ঘৃণা কুড়াইতে জানে। এই সব গুজব ও কুরুচিপূর্ণ মনস্তত্ত্বকে সমাজ হইতে উপড়াইয়া ফেলিতে হইলে জনসচেতনতা ও কঠোর আইনি প্রয়োগের বিকল্প নেই। তারেক রহমান ও জাইমা রহমানের মধ্যকার বাবা-মেয়ের এই পবিত্র সম্পর্ক শুধু গুজব দিয়া ম্লান করা সম্ভব নহে, কারণ সত্যের আলো মেঘের আড়ালে সাময়িক ঢাকা পড়িলেও শেষ পর্যন্ত তা দীপ্তিমান হইবেই। একটি সুস্থ সমাজ গঠনে আমাদের সবাইকে এই কুরুচিপূর্ণ মানসিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হইতে হইবে এবং পারিবারিক সম্পর্কের পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রাখিতে অঙ্গীকারবদ্ধ হইতে হইবে।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

লেখক, প্রাবন্ধিক ও কথা সাহিত্যিক

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত