ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

শিক্ষা সংস্কারের নতুন দিগন্ত : প্রতিশ্রুতি বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের রূপরেখা

জুবাইয়া বিন্তে কবির
শিক্ষা সংস্কারের নতুন দিগন্ত : প্রতিশ্রুতি বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের রূপরেখা

বাংলাদেশের শিক্ষা খাত আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিনের জটিলতা, নীতির অসামঞ্জস্য, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং কাঠামোগত সংকট পেরিয়ে এখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। নতুন সরকারের ঘোষিত ১২ দফা শিক্ষা সংস্কার এজেন্ডা শুধু একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয় এটি এক ধরনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার, একটি জাতীয় প্রতিশ্রুতি, যা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভাগ্য নির্ধারণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপি বরাবরই মানবসম্পদ উন্নয়নকে জাতীয় অগ্রগতির মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারের শিক্ষা সংস্কারের উদ্যোগকে শুধু একটি নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখলে ভুল হবে; বরং এটি একটি বৃহত্তর রাষ্ট্রচিন্তার অংশ, যেখানে শিক্ষা খাতকে ‘ব্যয়’ নয়, বরং ‘বিনিয়োগ’ হিসেবে পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে।

সংকটের উত্তরাধিকার : একটি ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে শিক্ষা খাত : নতুন কোনো সংস্কার উদ্যোগকে বুঝতে হলে প্রথমেই আমাদের স্বীকার করতে হবে বাংলাদেশের শিক্ষা খাত একটি দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

বিগত সময়গুলোতে বারবার নীতির পরিবর্তন, অপরিকল্পিত কারিকুলাম, পরীক্ষা পদ্ধতির অস্থিরতা এবং সর্বোপরি দুর্নীতি ও অনিয়ম এই খাতকে প্রায় ভেঙে পড়ার অবস্থায় নিয়ে গিয়েছিল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ বাণিজ্য, প্রশ্নপত্র ফাঁস, কোচিং নির্ভরতা এবং শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছিল, যেখানে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য- মানুষ গড়া-পিছিয়ে পড়েছিল সনদ অর্জনের প্রতিযোগিতায়। এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের দায়িত্ব ছিল দ্বিমুখী একদিকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধার করা, অন্যদিকে একটি আধুনিক, টেকসই এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘোষিত ১২ দফা এজেন্ডা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি একটি বহুমাত্রিক পরিকল্পনা, যেখানে একযোগে অবকাঠামো, প্রযুক্তি, কারিকুলাম, মূল্যায়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাজেট বৃদ্ধি, মিড-ডে মিল, আধুনিক ল্যাব স্থাপন, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত স্যানিটেশন এসব উদ্যোগ শিক্ষা ব্যবস্থার মানবিক ও সামাজিক দিককে শক্তিশালী করবে।

অন্যদিকে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’, ডিজিটাল লার্নিং ট্র্যাকিং, রোবোটিক্স কর্নার, বহুভাষিক শিক্ষা এসব উদ্যোগ ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে বাংলাদেশকে প্রস্তুত করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট শিক্ষা আর শুধুই পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি হবে দক্ষতা, উদ্ভাবন এবং বাস্তবজ্ঞানভিত্তিক একটি প্রক্রিয়া। তবে বাস্তবতা হলো বাংলাদেশে নীতির চেয়ে বাস্তবায়নই সবসময় বড় চ্যালেঞ্জ।

আমরা অতীতে দেখেছি, অনেক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এর পেছনে রয়েছে প্রশাসনিক জটিলতা, সমন্বয়ের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জবাবদিহির ঘাটতি। এই জায়গাটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে- এই এজেন্ডাগুলো কত দ্রুত এবং কত কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব বারবার জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার ওপর জোর দিচ্ছে। পাবলিক ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি প্রকাশের উদ্যোগ সেই স্বচ্ছতার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে।

ভবিষ্যতের ভিত নির্মাণ : শিক্ষা সংস্কারের মূল কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত প্রাথমিক শিক্ষা। কারণ, এই স্তরেই একজন শিক্ষার্থীর বোধ, চিন্তা এবং শেখার ভিত্তি গড়ে ওঠে। বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বৈষম্য। শহরের একটি আধুনিক স্কুল এবং গ্রামের একটি অবহেলিত বিদ্যালয়ের মধ্যে পার্থক্য এতটাই বড় যে তা একই ব্যবস্থার অংশ বলে মনে হয় না। এই বৈষম্য দূর না করলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না। প্রাথমিক শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো, শিক্ষক প্রশিক্ষণ উন্নত করা, অবকাঠামোগত ঘাটতি পূরণ এবং বাস্তবমুখী কারিকুলাম প্রণয়ন এসব পদক্ষেপ জরুরি। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার বিশ্বাস, সরকারের এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানরাও সমান সুযোগ পাবে যা একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত।

দক্ষতা বনাম নম্বরের দ্বন্দ্ব : বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে একটি মৌলিক সমস্যা বিরাজ করছে এখানে দক্ষতার চেয়ে নম্বরকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও বাস্তব জীবনে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে না।

নতুন সরকারের পরিকল্পনায় মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কারের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন চালু করা হলে শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এটি একটি কঠিন প্রক্রিয়া। কারণ, এটি শুধু পরীক্ষা পদ্ধতি নয় শিক্ষাদান পদ্ধতি, পাঠ্যক্রম এবং মানসিকতারও পরিবর্তন দাবি করে। অর্থনীতির চালিকাশক্তি : বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দক্ষ মানবসম্পদের ওপর।

এই বাস্তবতায় কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমান সরকার এই খাতে জোর দেওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছে, তা সময়োপযোগী এবং প্রয়োজনীয়। যদি পরিকল্পনামাফিক প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং, আইটি এবং বিভিন্ন টেকনিক্যাল ট্রেডে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান এই তিনটি ক্ষেত্রেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ভাষা একটি আবেগঘন বিষয়। বাংলা আমাদের পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু। তবে একই সঙ্গে ইংরেজি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষার গুরুত্বও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বর্তমান সরকারের বহুভাষিক শিক্ষা উদ্যোগ এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেওয়ার একটি সাহসী পদক্ষেপ। বাংলা ভাষার ভিত্তি শক্তিশালী রেখে ইংরেজি এবং প্রয়োজনে তৃতীয় ভাষায় দক্ষতা অর্জন শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখবে।

ডিজিটাল শিক্ষা বর্তমান সময়ের অপরিহার্য বাস্তবতা। ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ বা ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেমের মতো উদ্যোগ শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণের পথে এগিয়ে নিতে পারে। তবে এখানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে ডিজিটাল বৈষম্য। গ্রাম ও শহরের মধ্যে প্রযুক্তিগত ব্যবধান কমানো না গেলে এই উদ্যোগগুলো কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে সমতা নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষা খাতের উন্নয়নে জবাবদিহি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কে কোন কাজের জন্য দায়ী এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না থাকলে কোনো সংস্কারই সফল হবে না। একটি স্বাধীন টাস্কফোর্স বা শিক্ষা কমিশন গঠন এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারের প্রতি আস্থা রাখতে হলে জনগণকে দেখতে হবে ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে। একটি ভালো উদ্যোগও শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বাতিল হয়ে গেছে এমন উদাহরণ অসংখ্য। বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় সুযোগ হলো শিক্ষাকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাইরে এনে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়া। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একজন হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, এই সরকার যদি ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে এবং ইতিবাচক উদ্যোগগুলোকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে রাখতে পারে, তাহলে শিক্ষা খাতে একটি স্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব।

বাংলাদেশের শিক্ষা খাত আজ যে অবস্থায় রয়েছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সাহসী সিদ্ধান্ত, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং অবিচল বাস্তবায়ন। নতুন সরকারের ১২ দফা এজেন্ডা সেই পথচলার একটি শক্তিশালী সূচনা। কিন্তু এই পথ সহজ নয়। এটি এমন একটি যাত্রা, যেখানে ব্যর্থতার সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে অভূতপূর্ব সাফল্যের সম্ভাবনাও।

রাষ্ট্রের নীতি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ এই চারটি উপাদান একত্রে কাজ করলে বাংলাদেশ একটি আধুনিক, দক্ষ এবং মানবিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে।

একজন নাগরিক, একজন সচেতন পর্যবেক্ষক এবং একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার প্রত্যাশা এই সরকার শিক্ষা খাতকে শুধু প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে না; বরং এটিকে একটি বাস্তব রূপ দেবে, যা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি আলোকিত ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে। কারণ, শিক্ষা শুধু একটি খাত নয় এটি একটি জাতির আত্মার প্রতিফলন।

জুবাইয়া বিন্তে কবির

অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত