প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬
বাংলাদেশ নিজেকে সম্ভাবনার দেশ বলে দাবি করে। তরুণ জনগোষ্ঠী, শিক্ষার বিস্তার, প্রযুক্তির প্রসার সবকিছু মিলিয়ে একটি ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ এর কথা বলা হয়। কিন্তু এই অগ্রগতির আড়ালে একটি গভীর সংকট ক্রমেই প্রকট হয়ে ওঠে- মেধার অবমূল্যায়ন এবং প্রভাবনির্ভর সংস্কৃতির। তবে বাস্তব প্রশ্নটি আরও অস্বস্তিকর- আমরা কি সত্যিই মেধাবী জনশক্তি হিসেবে তৈরি হচ্ছি, নাকি ধীরে ধীরে অদক্ষ, অযোগ্য মানবশক্তির কব্জায় চলে যাচ্ছি? এই প্রবণতা যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে উন্নয়নের এই যাত্রা দীর্ঘমেয়াদে হোঁচট খেতে পারে।
প্রতিবছর লক্ষাধিক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করছে। তারা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে, দক্ষতা বৃদ্ধির চেষ্টা করছে, নিজেদের যোগ্য প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন, স্বজনপ্রীতি, দলীয় বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের প্রভাব- এসব অভিযোগ বাংলাদেশে দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। ফলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক তরুণ চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক প্রকাশিত সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে (সিপিএস) এর তথ্য অনুযায়ী গত একবছরে ৩২ শতাংশ ব্যক্তি ঘুষ দিয়ে সরকারি চাকরি নিয়েছে। যা খুবই হতাশাজনক। যখন যোগ্যতার চেয়ে প্রভাব-প্রতিপত্তি বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে, তখন মেধাবীরা পিছিয়ে পড়ে না; তারা মানসিকভাবে ভেঙেও পড়ে। একজন শিক্ষার্থী যখন দেখে যে তার অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না, তখন তার মধ্যে অনীহা তৈরি হয়। ফলে অনেকেই বিদেশমুখী হয়ে পড়ে, যা মেধাপাচারে পরিণত হয়। এটি শুধুই ব্যক্তিগত পছন্দ নয় ; এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত। সর্বশেষ ২০২৪ সালে ইউনেস্কোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫২ হাজার ৭৯৯ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনার জন্য ৫৫টি দেশে পাড়ি দিয়েছেন। এটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
প্রভাবনির্ভর সংস্কৃতি মূলত একটি অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়। এই সংস্কৃতি শুধু ব্যক্তিগত হতাশাই তৈরি করে না; এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে। কারণ দক্ষ ও যোগ্য মানুষকে উপেক্ষা করলে প্রতিষ্ঠানগুলো যোগ্য কর্মীর অভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। বর্তমান বাংলাদেশে প্রতিযোগিতা হয় না কে বেশি যোগ্য বরং কে বেশি ক্ষমতাবান। এই পরিস্থিতি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অব্যবস্থাপনাকে উৎসাহিত করছে। যদিও বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ক্রমেই মেধার মূল্যায়নের দাবি তুলছে, কিন্তু তা ‘গুঁড়ে বালি’র মতো অবস্থা।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রার্থীদের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার প্রাপ্ত নম্বর ফলাফলে প্রদর্শন করতে হবে। এতে একদিকে যেমন চাকরি প্রত্যাশীরা নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে অবগত হতে পারবে। অন্যদিকে এর ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যেকোনো প্রভাবকে বুড়ো আঙুল দেখানো সহজ হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপমুক্ত আইনি প্রক্রিয়া চালু করতে হবে। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপ নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলোর স্বাভাবিক স্বচ্ছতার বিকাশকে বিঘ্নিত করে। সর্বশেষে একটি দেশের মূল শক্তি তার মেধাবী জনগোষ্ঠী।
তাপস রায় শুভ
শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়