প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬
একুশ শতকের বিশ্ব এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াল থাবা। এই দ্বিমুখী সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আধুনিক বিশ্ব এখন জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প খুঁজছে। দীর্ঘকয়েক দশক ধরে বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল অপরিশোধিত তেল বা ‘ব্ল্যাক গোল্ড’। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাকৃতিক গ্যাস এবং এর বিভিন্ন রূপ (এলএনজি, সিএনজি) যে গতিতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করছে, তাতে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে- প্রাকৃতিক গ্যাস কি শেষ পর্যন্ত তেলের জায়গা দখল করে নেবে?
তেল থেকে গ্যাসের দিকে এই ঝুঁকে পড়ার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করছে: পরিবেশগত প্রভাব, সহজলভ্যতা এবং অর্থনৈতিক সাশ্রয়। কয়লা বা তেলের তুলনায় প্রাকৃতিক গ্যাস অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি। পুড়লে এটি তেলের তুলনায় প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ কম কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত করে। ফলে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দেশগুলো এখন তেলনির্ভরতা কমিয়ে গ্যাসের দিকে ঝুঁকছে। একে দেখা হচ্ছে একটি ‘সেতুবন্ধন জ্বালানি’ (Bridge Fuel) হিসেবে, যা আমাদের পুরোপুরি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পৌঁছাতে সাহায্য করবে।
এক সময় মনে করা হতো পরিবহন খাত পুরোপুরি তেলের দখলে থাকবে। কিন্তু এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) এবং সিএনজি (সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস) সেই ধারণাকে আমূল বদলে দিচ্ছে। ভারী শিল্প এবং সমুদ্রগামী জাহাজে এখন তেলের পরিবর্তে এলএনজি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (IMO) সালফার নির্গমনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করায় জাহাজ মালিকরা এখন তেলের পরিবর্তে এলএনজি ইঞ্জিন বেছে নিচ্ছেন। একইভাবে, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের অনেক দেশেই ভারী ট্রাকগুলোতে ডিজেলের বিকল্প হিসেবে গ্যাস জনপ্রিয় হচ্ছে। বাংলাদেশেও আমরা সিএনজির মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও গণপরিবহণে তেলের একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে যেতে দেখেছি।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে গ্যাসের শ্রেষ্ঠত্ব এখন অবিসংবাদিত। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হওয়ায় বিশ্বব্যাপী সেগুলো বন্ধ করে গ্যাসভিত্তিক ‘কম্বাইন্ড সাইকেল’ পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন করা হচ্ছে। গ্যাসের উচ্চ কার্যক্ষমতা এবং দ্রুত চালু ও বন্ধ করার সক্ষমতা এটিকে তেলের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর করে তুলেছে। বিশেষ করে যখন বাতাস বা সৌরশক্তি পর্যাপ্ত থাকে না, তখন গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো দ্রুত ব্যাকআপ হিসেবে কাজ করতে পারে, যা তেলভিত্তিক কেন্দ্রের ক্ষেত্রে সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।
তেলের বাজার মূলত মধ্যপ্রাচ্য এবং ওপেকের (OPEC) ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। এই অতিনির্ভরশীলতা প্রায়শই বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তোলে। বিপরীতে, প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। রাশিয়া, কাতার, অস্ট্রেলিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো এখন গ্যাসের প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে ‘শেল গ্যাস’ (Shale Gas) বিপ্লব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে জ্বালানি আমদানিকারক থেকে রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছে। এই বহুমুখী সরবরাহের কারণে গ্যাসের বাজারে তেলের মতো অতটা রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রভাব ফেলতে পারে না। তবে গ্যাস কি সত্যিই তেলকে পুরোপুরি হটিয়ে দিতে পারবে? উত্তরটা এত সহজ নয়। তেলের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য আছে যা গ্যাস সহজে পূরণ করতে পারবে না। প্লাস্টিক, সার, ওষুধ এবং প্রসাধনী তৈরির জন্য তেলের কোনো বিকল্প এখনও নেই বললেই চলে। গ্যাস পরিবহনের জন্য পাইপলাইন বা এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। তেলের মতো এটিকে সাধারণ ট্যাংকারে করে যত্রতত্র নিয়ে যাওয়া সহজ নয়। যদিও গ্যাস কার্বন নিঃসরণ কমায়, তবে উত্তোলনের সময় যদি মিথেন লিক হয়, তবে তা পরিবেশের জন্য কার্বন-ডাই-অক্সাইডের চেয়েও অনেক বেশি ক্ষতিকর হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, গ্যাস হয়তো রাতারাতি তেলের জায়গা দখল করবে না, তবে এটি নিশ্চিতভাবেই তেলের ‘একচেটিয়া সম্রাজ্য’ ধসিয়ে দিয়েছে। আমরা এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করছি যেখানে জ্বালানি হবে বহুমুখী। আগামী দুই থেকে তিন দশকে পরিবহন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেল তার শ্রেষ্ঠত্ব হারাবে এবং সেই জায়গাটি গ্যাস দখল করে নেবে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, গ্যাসও কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি জীবাশ্ম জ্বালানি। তাই একে তেলের বিকল্প হিসেবে চিরস্থায়ী সমাধান ভাবলে ভুল হবে। বরং গ্যাসকে তেলের পরিপূরক এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে একটি মজবুত ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে গ্যাসের পরিমিত ও দক্ষ ব্যবহারই হতে পারে আমাদের শ্রেষ্ঠ কৌশল। তেলের যুগ হয়তো শেষ হতে দেরি আছে; কিন্তু গ্যাসের আধিপত্য যে শুরু হয়ে গেছে- তা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।