ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

শিক্ষকতা ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

মো. রুহুল আমীন খান
শিক্ষকতা ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর। জাতির দিশারী। মেধা, শ্রম ও ধৈর্যের মাধ্যমে তারা জাতিকে শিক্ষা দান করেন। তাদের প্রচেষ্টায় অজ্ঞতা দূরীভূত হয়। জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয় সমাজ। দেশ লাভ করে দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক। তাই দেশ ও জাতি তাদের নিকট চির ঋণী। মহাবীর আলেকজান্ডার তার শিক্ষক অ্যারিস্টটলের সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমি আমার বাবার কাছে ঋণী, কারণ তিনি আমাকে জীবন দিয়েছেন; কিন্তু আমার শিক্ষকের কাছে ঋণী, কারণ তিনি আমাকে সুন্দরভাবে বাঁচতে শিখিয়েছেন।’ বর্তমানে মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকরা বিড়ম্বনার শিকার হন পদে পদে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থান থেকে আসে তাদের লাঞ্ছনার দুঃসংবাদ।

একসময় শিক্ষকতা ছিল সম্মানজনক পেশা। সমাজের সর্বত্র শিক্ষকরা পেতো অগাধ শ্রদ্ধা ও অসীম সম্মান।

সে সময় মেধাবী ছাত্রদের জীবনের লক্ষ্য থাকতো শিক্ষক হওয়া। বর্তমানে শিক্ষকরা সমাজে তেমন সম্মান পান না। বিভিন্ন সময় তাদের অপমানকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। ফলশ্রুতিতে বর্তমানে মেধাবী ছাত্ররা শিক্ষক হতে চায় না। যারা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছেনিয়েছেন এসব ঘটনা তাদের ভাবায়।

দুশ্চিন্তা বিরাজ করে তাদের মনে।

তারা অনুশোচনায় দগ্ধ হন। সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে শিক্ষকদের শির ছিল সম্মান ও মর্যাদায় সমুন্নত। লজ্জা ও বেদনায় সমুন্নত সেই শির প্রায়ই নত হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক প্রভাব তাদের মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে দেয় না। বাধ্য করে নতজানু হয়ে সবকিছু মেনে নিতে। আর যারা ভিন্ন-অঞ্চলের শিক্ষক, তাদের অবস্থা তো আরও করুণ। নানা কৌশলে তাদের কোণঠাসা করে রাখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন-অঞ্চলের শিক্ষকদের টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়ে।

মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো তো পরের কথা। শিক্ষকরা নিরলসভাবে মমতা দিয়ে কঠিন বিষয় শিক্ষার্থীদের সহজে বুঝানোর চেষ্টা করেন। তাদের বারবার একই প্রশ্নে তারা বিরক্ত হন না। গ্রীষ্মের দুপুরে বিদ্যুৎবিহীন রুমে ঘামার্ত শরীরে প্রতিদিন চার থেকে পাচঁটা ক্লাস তাদের নিতে হয়। তারপরেও তাদের কর্মতৎপরতা অনেকের চোখে ভাসে না। তারা তিরস্কারের ছলে বলে থাকেন, ‘কী করেন শিক্ষকরা, বসে বসে শুধু বেতন নেন।’ তাদের বিবেকবোধ কাজ করে না। তারা শিক্ষকদের সগৌরবে তাচ্ছিল্য করে আনন্দ পান। শিক্ষকের সঙ্গে এমন আচরণ করে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে অনুসরণ করে।

শিক্ষকের চাল-চলন, আচার-আচরণ তাদের মনে গভীর রেখাপাত করে। তাদের জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিক্ষার্থীদের সামনে শিক্ষককে লাঞ্ছিত করা, নির্যাতন করা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

শিক্ষকের জন্য এর চেয়ে কষ্টকর আর কিছু হতে পারে না। এতে শুধু একজন শিক্ষকই অপমানিত হন না, বরং শিক্ষার্থীদের মনোজগতেও বিরূপ প্রভাব পড়ে। এই কষ্ট তারা কীভাবে আড়াল করবেন, কীভাবে লাঞ্ছিতমুখে শিক্ষার্থীদের সামনে হাজির হবেন- এ বিষয়গুলো কি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভাবায় না! শিক্ষককে নির্যাতন ও লাঞ্ছিত করা বিবেকবোধসম্পন্ন মানুষের কাজ হতে পারে না।

যে জাতি শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদা দিতে জানে না, তারা আর যা-ই হোক কখনও উন্নত ও সভ্য জাতি হতে পারে না। যাদের পরিশ্রম ও ত্যাগের বিনিময়ে জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধাররা জ্ঞানের পরশ পায়, তাদের সম্মান ও মর্যাদা যেন বিনষ্ট না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার। দরকার নির্যাতনকারীদের আইনের আওতায় আনা। অন্যথায় এমন জঘন্য ঘটনা অহরহ ঘটতে পারে।

মো. রুহুল আমীন খান

প্রাক্তন শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত