ঢাকা শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বিদ্যালয়ে শিক্ষাসংকট কারণ ও উত্তরণের পথ

মোজাহিদ হোসেন
বিদ্যালয়ে শিক্ষাসংকট কারণ ও উত্তরণের পথ

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কয়েকটি পর্যায়ে বিভক্ত। প্রথমত, প্রাইমারি পর্যায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এই পর্যায়ের পড়াশোনা হয়। এরপর মাধ্যমিক পর্যায়। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত এই পর্যায়ের পড়াশোনা হয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। এরপর উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়। একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত। এরপর সম্মান শ্রেণীর তথা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পড়াশোনা শুরু হয়।

বিদ্যালয় শিক্ষা বলতে সাধারণভাবে মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনাকে বোঝানো হয় এবং শিক্ষার পর্যায়গুলোর মধ্যে মাধ্যমিক পর্যায় তুলনামূলক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এই সময়েই একজন শিক্ষার্থীর ভিত্তি শক্তিশালী হয়। এই সময় যে শিক্ষার্থী যত শিখতে ও জানতে পারবে, পরবর্তীতে তার পথ ততই সহজ হবে। কিন্তু বর্তমান যদি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দিকে তাকানো হয় তাহলে এক ভয়াবহ দৃশ্য চোখে পড়ে। প্রথমে বলতে গেলে, প্রায় সব শিক্ষার্থীর কাছে এন্ড্রয়েড ফোন। সারাক্ষণ সোসাল মিডিয়ায় পড়ে থাকে। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ , টুইটার, ইউটিউব ইত্যাদি। যার ফলে পড়াশোনায় মনোযোগী হতে পারে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরদের মধ্যে প্রায় ২৬ শতাংশ নিয়মিতভাবে ডিভাইস আসক্তিতে ভোগে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রতিদিন গড়ে পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় স্মার্টফোন ব্যবহার করে। তাদের মধ্যে ৬৪ শতাংশ স্বীকার করেছে যে, তারা প্রয়োজন না থাকলেও ফোন হাতে নেয়। আর ৪৭ শতাংশ জানিয়েছে, তারা পড়াশোনার সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না।

দ্বিতীয়ত, পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। কোভিড-১৯ মহামারি পরবর্তী বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ইন্টারনেট আসক্তি, বিষণ্ণতা এবং পর্নোগ্রাফি আসক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে গবেষণায় এসেছে। দেশের স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই সমস্যার বর্তমান প্রভাব বিশ্লেষণের উদ্দেশে একটি জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের স্কুলগামী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ৬২ দশমিক ৯ শতাংশ পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। অর্থাৎ, প্রতি ১০ জন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে ছয়জনেরও বেশি পর্নোগ্রাফিতে সময় পার করে।

তৃতীয়ত, মাদকাসক্ত। ষষ্ঠ থেকে শুরু করে অষ্টমণ্ডনবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা মাদকে আসক্ত। দিনের পর দিন এরা এমনভাবে মাদকে আসক্ত হয়ে গেছে যে, এদের এই পথ থেকে ফেরানো কষ্টকর। এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মাদক ব্যবহারকারীদের ৬০ শতাংশের বেশি ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রথমবার মাদক গ্রহণ করে। আর মাদক শুরু করার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে বন্ধুদের প্রভাব।

চতুর্থত, প্রেম বিষয়ক সমস্যা। মাধ্যমিক পর্যায়ের এই বয়সে বয়ঃসন্ধিকাল শুরু হয়। বয়ঃসন্ধিকালের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বিপরীত লিঙ্গের প্রতি টান। এইটা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সবার কাছে ফোন থাকায়, সহজ হয়ে গেছে। এরপর শহর থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত দেখা যায়, নিজেরা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে, অথবা পরিবারে প্রেসারক্রিয়েট করে। অনেক সময় বিয়ের আগেই শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়। ফলে পড়াশোনায় ফেরানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। পঞ্চমত, গেমে আসক্ত। সবার কাছে এন্ড্রয়েড ফোন থাকায় বিভিন্ন ধরনের গেমে আসক্ত। ফ্রি ফায়ার, পাবজিসহ বিভিন্ন ধরনের গেম। ষষ্ঠত, নকল করে পাশ করার প্রবণতা। বিদ্যালয়ের এক শ্রেণীর শিক্ষার্থী ধরেই নেয় নকল করেও ভালো ফলাফল অর্জন করা সম্ভব। বিদ্যালয় থেকে নকল দূর করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে অধিকাংশই বড়দের সম্মান করে না, শিক্ষকদের সম্মান করে না। পরিবারের বাবা-মায়ের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। রাস্তায় মেয়েদের উত্যক্ত। অশালীন মন্তব্য করে।

আঁচল ফাউন্ডেশন ও অন্যান্য গবেষণার তথ্যানুযায়ী, প্রায় ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থী ইন্টারনেট ব্যবহারে আসক্ত। প্রায় ৬২.৯ শতাংশ কিশোর-কিশোরী পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত এবং ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রতিদিন ৫ ঘণ্টার বেশি স্মার্টফোন ব্যবহার করে, যা তাদের ডিভাইস আসক্তিতে ফেলছে। যে সময়ে শিক্ষার্থীদের থাকা জরুরি বই খাতা আর কলম নিয়ে সেই সময় হাতে ফোন বা মাদক। একটি জাতিকে ধ্বংস করার জন্য এটাই যথেষ্ট। যে দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাদকে আসক্ত, ফোনে আসক্ত, সেই দেশ কখনোই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। শিক্ষার্থীদের এই অবনতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, বাবা-মা বা পরিবারের অসচেতনতা। বাবা-মা সচেতন হলে অবশ্যই সন্তানদের নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন, ‘আমাকে একটা শিক্ষিত মা দাও, আমি একটা শিক্ষিত জাতি দিবো’। এরপর সঙ্গদোষ। বাংলায় বহুল ব্যবহৃত একটা প্রবাদবাক্য আছে, ‘সঙ্গদোষে লোহা ভাসে’। বাস্তবতাও তাই। অনেক সময় দেখা যায় অনেক ভালো ছাত্রও শেষ পর্যন্ত অসৎ সঙ্গের কারণে ঝড়ে পড়ে। তৃতীয়ত, শিক্ষকদের অবহেলা। বিদ্যালয় এবং শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করা শিক্ষকদের দায়িত্ব। সেই জায়গা থেকে যদি শিক্ষার্থীরা অকালে ঝরে পড়ে তাহলে এই বিচ্যুতির দায়ভার শিক্ষকদের উপরও বর্তায়। এসব বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবী।

শিক্ষার্থীদের এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য পরিবার ও বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দায়িত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এরইমধ্যে শিক্ষা সংস্কারের জন্য বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষা বিষয়ে ১২ দফার ঘোষণা করেছেন, বাজেটের ‘এনভেলাপ’ বাড়ানো: শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া এবং তিন বছরে ধাপে ধাপে ফিসক্যাল আপলিফট পরিকল্পনা। উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন: ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা বাধ্যতামূলকভাবে আগেভাগে চালু। উন্নয়ন ব্যয়কে অগ্রাধিকার: মিড-ডে মিল, আধুনিক ল্যাব এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত স্যানিটেশন নিশ্চিত করা। ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব: শিক্ষকদের জন্য ডিজিটাল পাঠ-পরিকল্পনা ও লার্নিং এভিডেন্স ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু। বহুভাষিক বাংলাদেশ: বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি চাহিদা অনুযায়ী তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা। ইনোভেশন স্পেস: প্রতিটি উপজেলায় স্কুলে ‘রোবোটিক্স ও মেকার কর্নার’ স্থাপন। খেলাধুলা বাধ্যতামূলক: মানসিক ও শারীরিক বিকাশে মাধ্যমিক স্তরের টাইমটেবিলে স্পোর্টস পিরিয়ড অন্তর্ভুক্ত করা। পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার: মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে আইটেম ব্যাংক ও লার্নিং ট্র্যাজেক্টরির মাধ্যমে দক্ষতা পরিমাপ। শিক্ষায় মানদণ্ড নির্ধারণ: সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার বৈচিত্র্য বজায় রেখে ‘ন্যূনতম শিখন মান’ এক করা।

মোজাহিদ হোসেন

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত