ঢাকা সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মতের বৈচিত্র্যই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য

তৌসিফ রেজা আশরাফী
মতের বৈচিত্র্যই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য

গণতন্ত্র শুধু একটি শাসনব্যবস্থার নাম নয়; এটি মানুষের মতপ্রকাশ, অংশগ্রহণ এবং পারস্পরিক সহনশীলতার উপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি সামাজিক চুক্তি। একটি রাষ্ট্রে নির্বাচন থাকলেই সেটি প্রকৃত গণতন্ত্র হয়ে ওঠে না। প্রকৃত গণতন্ত্র তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন সেখানে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ থাকে, বিরোধী কণ্ঠকে সম্মান করা হয় এবং রাষ্ট্র বা সমাজ সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে না দেখে উন্নয়নের উপায় হিসেবে গ্রহণ করে। তাই গণতন্ত্রে ভিন্নমতের গুরুত্ব অপরিসীম।

ভিন্নমত মানে রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়, বরং রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার একটি প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া। যে সমাজে মানুষ ভয়হীনভাবে প্রশ্ন করতে পারে, মত দিতে পারে এবং ভুল ধরিয়ে দিতে পারে, সেই সমাজই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও উন্নত হয়। অন্যদিকে যেখানে ভিন্নমত দমন করা হয়, সেখানে একসময় মতের বৈচিত্র্য হারিয়ে যায়, ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় এবং গণতন্ত্র ধীরে ধীরে শুধু আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়।

বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপেও এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায়। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টার ২০১৯ সালে ৩৪টি দেশে পরিচালিত এক জরিপে দেখায়, অধিকাংশ মানুষ গণতন্ত্রকে সমর্থন করলেও তারা মনে করেন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সাধারণ মানুষের মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেন না। জরিপে দেখা যায়, গড়ে ৬৪ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন যে রাজনীতিবিদেরা সাধারণ নাগরিকের কথা শোনেন না।

এই ফলাফল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ গণতন্ত্রের প্রাণ হলো জনগণের অংশগ্রহণ। যখন জনগণ মনে করে তাদের মতামতের মূল্য নেই, তখন গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা কমে যায়। আর এই আস্থাহীনতা তৈরি হয় মূলত তখনই, যখন রাষ্ট্রে ভিন্নমতের জায়গা সংকুচিত হতে থাকে।

গণতন্ত্রে বিরোধীমতের উপস্থিতি রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে। সরকার কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিলে বিরোধীদল, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী কিংবা সাধারণ মানুষ সেই ভুলের সমালোচনা করতে পারেন। এতে সরকার নিজের ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ পায়। ইতিহাস বলে, যে রাষ্ট্রে বিরোধী কণ্ঠ একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেছে, সেখানে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে পৃথিবীর বহু দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস তুলে ধরা যায়। একদলীয় শাসনব্যবস্থায় সাধারণত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রশ্নাতীত হয়ে ওঠে। তখন দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বাড়তে থাকে। কারণ সমালোচনা করার মতো কার্যকর কোনো শক্তি তখন আর অবশিষ্ট থাকে না। ভিন্নমত গণতন্ত্রকে শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, সামাজিকভাবেও শক্তিশালী করে। একটি সমাজে নানা ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও চিন্তার মানুষ বাস করে। সবার মত এক হবে না, এটিই স্বাভাবিক। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই যে এটি মতের বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেয়। কেউ সরকারপন্থি হবে, কেউ বিরোধী মত পোষণ করবে, কেউ নিরপেক্ষ থাকবে। এই বহুমাত্রিকতাই গণতন্ত্রকে জীবন্ত রাখে।

আজকের বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভিন্নমত প্রকাশের অন্যতম বড় প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে। তবে এর ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি উদ্বেগও রয়েছে। অনেক সময় অনলাইনে মতপ্রকাশের কারণে মানুষ হয়রানি, হুমকি কিংবা সামাজিক আক্রমণের শিকার হন। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে আত্মসংযমী হয়ে পড়ে। এটি গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সামাজিক বাস্তবতায়ও দেখা যায়, ভিন্নমতকে অনেক সময় ‘রাষ্ট্রবিরোধী’, ‘দেশবিরোধী’ বা ‘অশুভ শক্তির এজেন্ডা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। অথচ সমালোচনা আর ষড়যন্ত্র এক বিষয় নয়। একজন নাগরিক রাষ্ট্রের ভুল নীতির সমালোচনা করতেই পারেন। সেটিই গণতান্ত্রিক অধিকার। বিশ্বের বিভিন্ন গণতন্ত্র নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউস এবং ভি-ডেম ইনস্টিটিউট নিয়মিতভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকারের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন দেশের গণতান্ত্রিক অবস্থান মূল্যায়ন করে। তাদের গবেষণায় দেখা যায়, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত, সেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানও দুর্বল হয়ে পড়ে। গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্রের আয়না হিসেবে কাজ করে। সাংবাদিকরা অনিয়ম তুলে ধরেন, জনদুর্ভোগ প্রকাশ করেন এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির মুখোমুখি করেন। কিন্তু যদি সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, তাহলে জনগণও প্রকৃত তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, বহু দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি জনগণের সমর্থন বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষ এখন বুঝতে পারছে যে স্বাধীন গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের অধিকার ছাড়া গণতন্ত্র কার্যকর হতে পারে না।

ভিন্নমত গণতন্ত্রে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। একতরফা সিদ্ধান্ত অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। কিন্তু যখন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাদের মতামত তুলে ধরতে পারে, তখন নীতি আরও গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর হয়। উদাহরণস্বরূপ শিক্ষা, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য কিংবা পরিবেশ নিয়ে জনমত গ্রহণ করলে সিদ্ধান্তে ভারসাম্য আসে। বর্তমান বিশ্বে গণতন্ত্রের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো মেরুকরণ। রাজনৈতিক বিভাজন এত তীব্র হয়ে উঠছে যে মানুষ ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। এতে সংলাপের সংস্কৃতি দুর্বল হচ্ছে। অথচ গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিই হলো আলোচনা ও সহনশীলতা। গণতন্ত্রে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা না থাকলে সমাজে ভয় ও নীরবতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। তখন মানুষ সত্য কথা বলার সাহস হারায়। অনেকেই নিজের মত লুকিয়ে রাখতে শুরু করেন। গবেষকরা একে ‘স্পাইরাল অব সাইলেন্স’ বা নীরবতার ঘূর্ণি বলে থাকেন। এর ফলে সমাজে প্রকৃত জনমত প্রকাশ পায় না।

সামাজিক বিজ্ঞানীদের মতে, কোনো রাষ্ট্রে উন্নয়ন টেকসই করতে হলে সেখানে জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা প্রয়োজন। কারণ এককেন্দ্রিক ক্ষমতা হয়তো সাময়িকভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা জনগণের আস্থা হারায়। অন্যদিকে মতের বৈচিত্র্য ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র ধীরগতির হলেও অধিক স্থিতিশীল হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভিন্নমতের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস আন্দোলন, সংগ্রাম ও মতপ্রকাশের অধিকারের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি বড় অর্জনের পেছনে ছিল মানুষের স্বাধীন মতপ্রকাশের আকাঙ্ক্ষা। তাই স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গেও ভিন্নমতের সম্পর্ক গভীর।

তরুণ সমাজের মধ্যেও এখন গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ইস্যুতে তরুণদের সরব অংশগ্রহণ তার প্রমাণ। তবে একইসঙ্গে তাদের মধ্যে হতাশাও বাড়ছে, যখন তারা দেখে মতভিন্নতার কারণে মানুষ আক্রমণের শিকার হচ্ছে।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বহু দেশের মানুষ মনে করেন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।

তৌসিফ রেজা আশরাফী

লেখক ও কলামিস্ট, সৈয়দপুর, নীলফামারী

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত