প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৮ মে, ২০২৬
প্রাকৃতিক নিয়মে প্রতিবছরই বর্ষার আগমন ঘটে। এ সময় প্রায় প্রতিদিন বৃষ্টিপাত হয়। কখনও একটানা কয়েকদিন আবার কখনও বিরতি দিয়ে। বৃষ্টি যেমন স্বস্তি দেয় আবার তেমনই শহরের মানুষের জন্য দুর্দশার কারণ হয়। বর্ষার আগমনের সঙ্গেই নগরজীবনের কাল হয়ে দাঁড়ায় জলাবদ্ধতা। সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যায় রাস্তাঘাট, চলেফেরায় অসুবিধা হয় সাধারণ জনগণের। দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা চলমান থাকলেও নেই কোনো টেকসই সমাধান। কিন্তু কেন এই জলাবদ্বতা? এই জনদুর্ভোগের দায় কার?
জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হচ্ছে অপরিকল্পিত ও অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা। অনেক ড্রেনই সরু, ভাঙাচোরা এবং নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। কিছু ড্রেনের উপরের ঢাকনা খোলা থাকায় বর্ষায় ময়লা পানি উপচে পড়ে। আবার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের খালগুলো দখল করে তৈরি করা হচ্ছে বাড়ি, মার্কেট, রাস্তাঘাট। ফলে ময়লা-আবর্জনায় ড্রেন ভরে গিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্লাস্টিক ও পলিথিনের অবাধ ব্যবহার, যা ড্রেন আটকে দেওয়ার অন্যতম কারণ। অন্যদিকে অপরিকল্পিত নগরায়ণও জলাবদ্ধতার জন্য দায়ী। নতুন নতুন ভবন নির্মাণের সময় জলাধার বা পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থাই রাখা হয় না। শহরের খাল, ডোবা ও জলাশয়গুলো দখল হয়ে গেছে গড়ে উঠেছে স্থাপনা। ড্রেনেজ ডিজাইন কোড অনুযায়ী, ঢাকায় প্রতি ঘণ্টায় ৩০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হলেও সেই পানি ড্রেন ও খালের মাধ্যমে নিষ্কাশনের সক্ষমতা থাকতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ডিজাইন রেইনের প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ বৃষ্টি হলেও ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ও রাস্তায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। ঢাকায় জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দীর্ঘ বর্ষা মৌসুমে অতি বৃষ্টিপাতের কারণে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ঢাকায় ৬ ঘণ্টার মধ্যে ১৩০ মিমি বৃষ্টিপাত হয়। ফলস্বরুপ নগর বন্যা দেখা দেয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলো হলো- কল্যাণপুর, মিরপুর ও মোহাম্মদপুর, রামপুরা, বাড্ডা, পুরান ঢাকা ও ধোলাইখাল, গুলশান, বনানী ও নিকুঞ্জ, ডিএনডি (ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা) এলাকা, উত্তরা ও বিমানবন্দর রোড, যাত্রাবাড়ী ও শনির আখড়া, নিউমার্কেট, গ্রিন রোড এলাকা, মতিঝিল, নটর ডেম কলেজ এলাকা ইত্যাদি। জলাবদ্ধতার কারণে যানবাহন চলাচলে বিঘ্নতা, সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি ও জলবাহিত রোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। জলাবদ্ধতার এ বহুমাত্রিক প্রভাব ঢাকার অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা, জনস্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক জীবনমানকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। যতদ্রুত সম্ভব বর্ষা আসার আগেই জলাবদ্ধতা রোধ করা উচিত। ঢাকার জন্য বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো শহরের নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করা। জলাবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময় নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকেন। নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, খাল পুনর্খনন, পাম্প স্থাপন এবং জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা ইত্যাদি। এছাড়া সিটি কর্পোরেশন নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার কার্যক্রম পরিচালনা এবং বর্ষার আগে প্রস্তুতিমূলক কর্মসূচি গ্রহণের কথাও জানিয়ে থাকে। কিছু এলাকায় আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উদ্যোগও দেখা গেছে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে খুব একটা দৃশ্যমান নয়। ঢাকাকে বাসযোগ্য রাখতে এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন ছাড়া বিকল্প নেই। তাছাড়া ড্রেনেজ লাইনগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষন এবং দখলকৃত খাল, জলাশয় ও ডোবা উদ্ধার করে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করা ও কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে নাগরিক সচেতনতাও জরুরি। এসব বাস্তবায়িত হলে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ কমে গিয়ে সাধারণ মানুষের চলাচল হবে আরও সহজ স্বাভাবিক ও নিরাপদ।
খাদিজাতুল খোরশেদ খুশি
শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি