প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৮ মে, ২০২৬
সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র সঞ্চয় ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগের খাতগুলোর বর্তমান চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও নৈরাজ্যপূর্ণ। গত শনিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে- ব্যাংক, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই), শেয়ারবাজার, বিমা ও সমবায়-আর্থিক খাতের প্রতিটি স্তরেই আস্থার সংকট বিরাজ করছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মোট বিতরণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ, যা টাকার অঙ্কে প্রায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। আরও ভীতিপ্রদ তথ্য হলো, দুই-তৃতীয়াংশ ব্যাংকই এখন দুর্বল এবং ১২টি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। একইভাবে এনবিএফআই খাতের ২০টি প্রতিষ্ঠান রেড জোনে এবং ৬টি প্রতিষ্ঠান অবসায়নের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি গঠনের প্রধান মাধ্যম শেয়ারবাজারের অবস্থাও ভালো নয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কারসাজির সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে বাজার ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।
বিমা খাতের চিত্র একই। বিমা দাবি পরিশোধ না করার প্রবণতা এ খাতটিকে সম্পূর্ণ দেউলিয়া করে তুলেছে। এছাড়া সমবায় খাতও দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আজ তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত। বলা বাহুল্য, এ সংকট রাতারাতি তৈরি হয়নি, বছরের পর বছর ধরে চলা সুশাসনের অভাব, অনিয়ম, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর উদাসীনতার এক পুঞ্জীভূত ফল এটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সরকার যদি একে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সমস্যা বলে দায় এড়াতে চায়, তাহলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। বরং আর্থিক খাতে সুশাসন ও সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ও জরুরি চ্যালেঞ্জ।
এই বিপর্যয় থেকে উত্তরণের জন্য এখনই কিছু কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে যারা হাজার হাজার কোটি টাকা বেনামি ঋণ ও জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি ও আইডিআরএকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে হবে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না, যা জনমনে ভুল বার্তা দেয় বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের গতিকে বাধাগ্রস্ত করে। দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একীভূতকরণ (মার্জার) বা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াটিও অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হবে, যেন সাধারণ আমানতকারীর এক টাকাও মার না যায়।
একইসঙ্গে শেয়ারবাজারের কারসাজি রোধে শুধু জরিমানা নয়, অপরাধীদের প্রাতিষ্ঠানিক ও ফৌজদারি শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ভালো মৌল ভিত্তিসম্পন্ন সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিকে বাজারে আনতে বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে। যেসব কোম্পানি গ্রাহকের টাকা দিতে পারছে না, তাদের লাইসেন্স বাতিল বা সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে গ্রাহকের অর্থ ফেরত দেওয়ার আইনি ব্যবস্থার দিকেও নজর দিতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, সাধারণ মানুষের সঞ্চয় হলো দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। এই চালিকাশক্তি যদি ভয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে বিনিয়োগ স্থবির হবে এবং মূল্যস্ফীতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সুশাসন নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে- এটাই প্রত্যাশা।