প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৯ মে, ২০২৬
দেশে জননিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। বেপরোয়া অপরাধীদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের জীবন আজ সরাসরি হুমকির মুখে পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও সহিংসতার ধারাবাহিকতা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে যে অপরাধ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি একটি গভীর ও বিস্তৃত সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। পত্রিকার পাতা খুললেই দেশের নানা প্রান্তে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি চোখে পড়ে, যা জনমনে ভয়, অনিশ্চয়তা ও হতাশা সৃষ্টি করছে।
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত এক মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে অন্তত ২৮৮টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, এর মধ্যে শুধু ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকাতেই ১৭টি হত্যাকাণ্ড রেকর্ড করা হয়েছে, যা বড় শহরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনে ৪টি, গাজীপুরে ৫টি, সিলেটে ৩টি, খুলনা ও বরিশালে ২টি করে এবং রংপুর মেট্রোপলিটনে ১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে ঢাকা রেঞ্জের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ৬৪টি হত্যাকাণ্ড নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে দেশজুড়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ১১টি। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকাতেই ১৬৮টি অভিযোগ থানায় দায়ের হয়েছে। সাম্প্রতিক এসব পরিসংখ্যান রাজধানীসহ সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন (৪২) হত্যাকাণ্ড। গত ২৮ এপ্রিল, রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা নিউমার্কেটে কৌশলে ডেকে নিয়ে খুব কাছ থেকে গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়। জনাকীর্ণ এলাকায় দিনের আলোয় সংঘটিত এমন প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েই প্রশ্ন তোলেনি, বরং সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতা ও গভীর আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল, এই চার মাসেই সারা দেশে ১১৪২টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যার মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ১০৭টি। মার্চ মাসেই খুনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১৭; ঢাকায় ২৪ জন এবং চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ৬১ জন নিহত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দেয়।
একই সঙ্গে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে গণপিটুনি বা তথাকথিত মব জাস্টিস। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে ৪৯টি ঘটনায় ২১ জন নিহত হয়েছেন, মার্চে ছিল ১৯ জন; আহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯, যা মার্চে ছিল ৩১। এই প্রবণতা দেখায়, মানুষ ধীরে ধীরে আইনের ওপর আস্থা হারাচ্ছে। বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে গেলে কিংবা অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে গেলে সমাজে স্বেচ্ছাবিচারের প্রবণতা বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলাকে আরও ভেঙে দেয়। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বাস্তবতার পরিবর্তনও অপরাধ বৃদ্ধির একটি বড় কারণ। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর জেল থেকে বের হয়ে আসা অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করতে গিয়ে নতুন করে অপরাধচক্র গড়ে তুলছে। গত ২১ মাসে রাজধানীতে অন্তত ২৩টি আলোচিত অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, যার মধ্যে ৭টি খুন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পেশাদার সন্ত্রাসীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। বাকি ঘটনাগুলোতে দেখা গেছে গুলি, বিস্ফোরণ, কুপিয়ে জখম এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো কর্মকাণ্ড।
রাজধানীর অপরাধ মানচিত্রও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, রায়েরবাজার, মোহাম্মদপুর, আদাবর, মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল, গুলশান, বাড্ডা, মগবাজার, হাতিরঝিল ও মতিঝিল এলাকায় অপরাধচক্রের সক্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কোথাও পুরোনো সন্ত্রাসীদের পুনরুত্থান, কোথাও নতুন গোষ্ঠীর উত্থান, আবার কোথাও রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে অপরাধী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান জরুরি। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো নারী ও শিশু নির্যাতনের ক্রমবর্ধমান হার। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদণ্ডএর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাসে ৮৭ জন কন্যা ও ১৩৩ জন নারীসহ মোট ২২০ জন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৮ জন ধর্ষণের শিকার এবং ৫৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে- যা পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। এ ধরনের সহিংসতা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি সমাজের নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন।
অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে বহুমাত্রিক কারণ কাজ করছে। অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, ব্যক্তিগত ও আর্থিক দ্বন্দ্ব, ভূমি দখল এবং আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে। মাদক অর্থনীতি এই পুরো ব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে, কারণ এটি অপরাধচক্রকে আর্থিক শক্তি জোগায়। একই সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান একটি নতুন সামাজিক সংকট তৈরি করেছে। পারিবারিক অবক্ষয়, সামাজিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা এবং নেতিবাচক প্রভাবের কারণে অনেক তরুণ অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও অপরাধ বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক। দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়াচ্ছে। জীবিকার তাগিদে অনেক সময় ছোটখাটো অপরাধ বড় অপরাধে রূপ নিচ্ছে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক দুর্বলতা, সমন্বয়ের অভাব এবং বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে, যা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বর্তমানে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনার সময় পুলিশ সদস্যরা হামলার শিকার হচ্ছেন। ফলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। যৌথ বাহিনীর পরিকল্পিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা বাড়ানো অপরিহার্য। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ এরইমধ্যে ১১০ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা করেছে এবং বিশেষ অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছে; এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে দৃঢ়তা জরুরি। প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিকল্প নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সিসিটিভি নেটওয়ার্ক, ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তি, জাতীয় ডাটাবেজ সমন্বয় এবং ডিজিটাল নজরদারির মাধ্যমে অপরাধ দমন আরও কার্যকর করা সম্ভব। একই সঙ্গে সাইবার মনিটরিং জোরদার করে অপরাধচক্রের যোগাযোগ ও পরিকল্পনা আগেই শনাক্ত করা গেলে অনেক অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এই প্রেক্ষাপটে অপরাধ দমন কৌশলকে আরও তথ্যনির্ভর ও কাঠামোগত করতে হবে। শুধু ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া নয়, বরং অপরাধ সংঘটনের আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা জরুরি। একটি সমন্বিত জাতীয় অপরাধ ডাটাবেজ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে বিভিন্ন সংস্থার তথ্য একত্রিত থাকবে। অপরাধের ধরণ, সময়, স্থান ও ধরণ বিশ্লেষণ করে পূর্বাভাসভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করা গেলে কার্যকর প্রতিরোধ সম্ভব। বিচারব্যবস্থার সংস্কারও অপরিহার্য। মামলা নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতা কমাতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং সময়সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সাক্ষী সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে বিচারপ্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক নিরাপত্তা কমিটি গঠন করে নিয়মিত নজরদারি ও সচেতনতা কার্যক্রম চালানো যেতে পারে। জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা ও তরুণদের সম্পৃক্ত করে একটি অংশগ্রহণমূলক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। মিডিয়ার দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরাধ প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা অপরাধের নেপথ্যের চিত্র তুলে ধরে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও উসকানি নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। অপরাধ প্রতিরোধে সামাজিক সম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমিউনিটি পুলিশিং এবং বিট পুলিশিং জোরদার করে জনগণকে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশীদার করতে হবে। পাড়া-মহল্লায় নজরদারি বৃদ্ধি, সন্দেহজনক কার্যকলাপ দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো অপরাধ কমাতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। গৃহকর্মী বা নতুন কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই, স্থায়ী ঠিকানা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় থানায় তথ্য সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। অপরিচিত ব্যক্তিকে বাসায় প্রবেশে সতর্ক থাকা, মূল্যবান সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য সীমিত রাখা উচিত। রাতে অপ্রয়োজনে বাইরে চলাফেরা পরিহার করা এবং নিরাপদ পরিবহন ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ কমাতে হলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তরুণদের গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা, মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করা এবং কিশোর গ্যাং দমনে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এই ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, রাজনৈতিক প্রশ্রয় পেলে পেশাদার অপরাধী গোষ্ঠী দ্রুতই শক্তিশালী হয়ে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় অপরাধ ও অসৎ রাজনৈতিক স্বার্থের এক ধরনের পারস্পরিক নির্ভরতা অনেক সময় দেখা যায়, যা অপরাধ দমনকে আরও কঠিন করে তোলে।
সানোয়ার হোসেন
সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক