প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৯ মে, ২০২৬
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদার বখ্শ হলের প্রবেশপথের পাশের রাস্তায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের লাল বাসের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি দাঁড়িয়ে আছে। তখন বিকাল। আমি হলের সামনের হোটেলে খাবার খাচ্ছি। দুপুরের খাবার। সকাল থেকে ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রাইটার্স সোসাইটি’ সংগঠনের নবীন সদস্য সংগ্রহের বুথে ছিলাম। ব্যস্ততার কারণে দুপুরে আর খাবার খাওয়ার সুযোগ হয়নি। তো বুথ থেকে হলে এসে হাত-মুখ ধুয়ে খাবার খেতে গেলাম। খাবার হোটেলে আমার মতো আরও দুই একজন ছিল, যারা দুপুরের খাবার বিকালে খাচ্ছেন। আমি হোটেলের ক্যাশ-কাউন্টারের সঙ্গে লাগানো সামনের টেবিলটাতে খাবার খেতে বসেছি। হোটেলের ক্যাশ-কাউন্টারে বসে আছেন ভদ্র মহিলা। বয়স ৩০-৩৫ এর মাধ্যে হবে। আমরা ওনাকে ভাবি বলেই সম্বোধন করি। ঠান্ডা মেজাজের ভালো মনের মানুষ উনি। মাঝেমধ্যে হোটেলে প্রচণ্ড ভিড় পড়ে তবু ক্যাশ-কাউন্টার সামলাতে গিয়ে কখনও মেজাজ হারাতে দেখিনি।
আমার খাবার টেবিল থেকে এবং ওনার ক্যাশ-কাউন্টার থেকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তো হঠাৎ করে উনি আমার দিকে তাকিয়ে বলছেন যে, ‘এখন গাড়ি দুয়ারে দুয়ারে বই নিয়ে আসে; কিন্তু মানুষ তেমন আর বই পড়ে না। আর আমরা ছোটবেলা স্কুলে পড়াকালীন সময়ে টাকা জমিয়ে গল্পের বই কিনে নিয়ে এসে পড়তাম। বান্ধবীদের কেউ নতুন বই কিনলে ধার করে এনে পড়েছি।’ উনি একটানা বেশ কয়েকটি বইয়ের নামও বললেন। আমি ওনার দিকে হা করে তাকিয়ে কথা শুনছি। ওনার আলাপের সঙ্গে আমি আলাপজুড়ে দেওয়ার সৎ সাহস পাইনি। বই নিয়ে আলাপ করার সাহস পাবই বা কি করে! এখনকার বিশ্ববিদ্যালয়েরই অধিকাংশ শিক্ষার্থী এমনকি শিক্ষকরাও বই পড়ার অভ্যাস থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও বই পড়েন না শোনে আপনাদের দ্বিধাবোধ হতে পারে। বলতে পারেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও বই পড়েন না, তা কি করে সম্ভব! প্রথমত, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়। যোগ্যতা, গবেষণা, শিক্ষানুরাগীর বিবেচনায় নিয়োগ হয় না। ফলে, রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকের বই পড়া, গবেষণা করার সময়-সুযোগ হয়ে ওঠে না। দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশের মানুষ আরামপ্রিয়- পরিশ্রম করে কোনোভাবে লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারলে আর পরিশ্রম করার মানসিকতা ধরে রাখতে পারেন না। তেমনিভাবে আমাদের দেশের অধিকাংশ শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে নির্জীব হয়ে যান। গবেষণা থেকে দূরে থাকেন, বই পড়া ছেড়ে দেন। ক্লাসে পাঠদানে বছরের পর বছর একই ফটোকপি করা শিটপাতি ব্যবহার করেন। পাঠদানে কোনো সৃজনশীলতা নেই, নতুনত্ব নেই, একই প্রশ্নের উত্তর শিট দেখে দেখে পড়ে যান। তৃতীয়ত, শিক্ষকদের একটা বিরাট অংশ শিক্ষকতার পাশাপাশি নানা ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। আমি নিজেই এমন শিক্ষকদের দিনের পর দিন ক্লাস করেছি, যারা ক্লাসে শিক্ষার্থীদের সামনে বসেই ফোনে নিজের ব্যবসা সামলাতেন। তাহলে যে শিক্ষকরা রাজনীতি এবং ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন, তারা কীভাবে গবেষণা, বই পড়ায় মনোযোগ দিবেন। তবে হ্যাঁ, অল্পসংখ্যক শিক্ষক শিক্ষা-গবেষণায় দেশ ও জাতির স্বার্থে লেগে আছেন বলেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও পুরোপুরি না মরে কোনোভাবে বেঁচে আছে। তানাহলে এই জাতির ধ্বংস অনিবার্য ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বই পড়া, শিক্ষা ও গবেষণার চিত্রটা আরও ভয়াবহ। আপনি যদি দেশের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে যান, তাহলে হলের কক্ষে কক্ষে দেখতে পাবেন যে, মোটামুটি বড়সড় পড়ার টেবিল আছে। হয় টেবিলগুলো বইশূন্য, টেবিলে বাতাস খাওয়ার জন্য ফ্যান রাখা, আয়না-চিরুনি, তেল, নেইল কাটার, বডি স্প্রে, আতরসহ কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখা, পরীক্ষায় পাসের জন্য কিছু ফটোকপি করা শিটপাতি টেবিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আর না হয় চাকরি প্রস্তুতির বইয়ে টেবিল সাজানো। একাডেমিক, গবেষণামূলক কিংবা সাহিত্যের বই টেবিলে দেখা আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপের মতো দুষ্কর। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের শতকরা ৯৯ ভাগ শিক্ষার্থী দেশ ও আন্তর্জাতিক খবরাখবর জানার জন্য সংবাদপত্র ছুঁয়েও দেখেন না। বই পড়েন না, গবেষণা চর্চা করেন না, সংবাদপত্র ছুঁয়েও দেখেন না, তাহলে তারা করেনটা কী? তারা ক্লাসে শুধু হাজিরা দেওয়ার জন্য যান-আসেন। পরীক্ষায় পাস করার জন্য পরীক্ষার রাতে ফটোকপি করা শিটপাতি মুখস্থ করেন। বাকি সময় ক্যাম্পাসে আড্ডা, ঘুরাফেরা, রাজনীতিতে ব্যস্ত থাকেন এবং শয়নকক্ষে শুয়ে শুয়ে ফোন চাপেন। আর তাদের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো বিসিএস ক্যাডার হওয়া। তাও আবার ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন টেবিলে না বসে, পড়াশোনা না করেই বিছানায় শুয়ে শুয়ে দেখেন।
এর ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষার্থীও আছে তবে এ সংখ্যাটা একেবারেই নগণ্য। এই নগণ্য সংখ্যার শিক্ষার্থীরা নিজ প্রচেষ্টায় বই পড়ার কাজে লেগে থাকেন, গবেষণা শেখার চেষ্টা করেন, উদ্ভাবনী চিন্তা করেন। এই চিন্তাশীল পরিশ্রমী শিক্ষার্থীরা একটা সময়ের পর আর দেশে থাকেন না। উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য বিদেশে চলে যান। উচ্চশিক্ষা অর্জন শেষে দেশে ফিরে আসলে তাদের মূল্যায়নের বদলে অবমূল্যায়ন করা হবে বলে তারা আর দেশে ফিরে আসার সাহস করেন না। তারা যে দেশে থেকে যান, সে দেশের জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-গবেষণা, উদ্ভাবন, আবিষ্কার, প্রযুক্তি, অর্থনীতির উন্নয়নে অবদান রাখেন। অথচ এমন হওয়ার কথা ছিল যে, দেশে ফিরে আসার জন্য তাদের সাদর সম্ভাষণে আমন্ত্রণ জানানো। তারা ফিরে এসে দেশের শিক্ষা-গবেষণা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, উদ্ভাবন, আবিষ্কারে অবদান রাখবেন। কিন্তু আমাদের দেশে তো সে পরিবেশ নেই, তারা ফিরবেনই বা কোন ভরসায়। তবে একটা ভরসায় ফিরতে পারেন, রাজনীতি করার ভরসায়! শিক্ষা-গবেষণা, উদ্ভাবন, আবিষ্কারের পরিবেশ না থাকলেও আমাদের দেশে রাজনীতি করার যথেষ্ট পরিবেশ আছে- চাঁদাবাজি, লুটপাট, মারামারি, খুনাখুনি, দুর্নীতি, নেতার গাড়ির পেছনে এবং রাজনৈতিক দলের চিন্তা-চেতনার পেছনে দৌড়ানোর রাজনীতি দেশের সর্বত্রে বিরাজমান।
বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে আসা শিক্ষার্থীরা বই পড়ার অভ্যাস গড়ে না উঠার দায় শিক্ষার্থীদের নয়। এর দায়ভার খোদ আমাদের মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার। স্কুল-কলেজ-মাদরাসার শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করার জন্য শুধু পাঠ্যবই বুঝে না বুঝেই মুখস্থ করতে সারাবছর ব্যস্ত থাকেন। ফলে পাঠ্যবইয়ের বাইরেও যে বই পড়ার, উদ্ভাবনী চিন্তা করার উন্মুক্ত জগৎ আছে, সে জগতের সঙ্গে শিক্ষার্থীরা পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায় না। তাছাড়া স্কুল-কলেজ-মাদরাসায় সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার না থাকায় শিক্ষার্থীদের বই পড়ার অভ্যাসও গড়ে উঠছে না। সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনের ২০২৪ সালের পাঠাভ্যাস সংক্রান্ত জরিপ অনুযায়ী, ১০২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে ৯৭তম স্থানে। বই পড়ার অভ্যাসে প্রায় তলানিতে বাংলাদেশ। একজন বাংলাদেশি বছরে গড়ে মাত্র ৬২ ঘণ্টা বই পড়েন, সংখ্যার দিক থেকে এর পরিমাণ তিনটি বইরও কম। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বই পড়ুয়া দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির নাগরিকরা বছরে গড়ে ৩৫৭ ঘণ্টা বই পড়েন, অর্থাৎ সপ্তাহে প্রায় সাত ঘণ্টা। খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত (৩৫২ ঘণ্টা) ও যুক্তরাজ্য (৩৪৩ ঘণ্টা)।
মুহাম্মদ আব্দুন নূর
শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়